শহরের এক প্রান্তে পাহাড়ের পাদদেশে যে সমৃদ্ধ জনপদটা রয়েছে সেখানকার বাসিন্দা সাথী । সাথীর মিষ্টি ব্যবহারের জন্য সবাই সাথীকে খুব ভালবাসে । সাথী যখন কলেজে বেড়োয় ঠিক তখনই সার্থকও বাড়ির থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বেড়োয় । সার্থক নুতন চাকরী নিয়ে সাথীদের পাড়ায় ভাড়া এসেছে । রাস্তায় দুজন দুজনকে দেখেছে কিন্তু কোনদিন পরিচয় হয়নি । আর পরিচয় করতেও কেউ এগিয়ে যায়নি । সাথী বরাবরই একটু লাজুক প্রকৃতির ।সার্থকের চোখে চোখ পড়লেই মাথা নিচু করে নেয় । তবুও প্রতিদিন একবার চোখাচোখি হয় । সার্থকের খুব ইচ্ছা করে সাথীর সাথে পরিচয় করার । কিন্তু ভাবে মেয়েটি যা লাজুক হয়ত কথাই বলবে না । কিন্তু একটা জিনিস তারা দুজনেই উপলব্ধি করেছে যে ওরা প্রতিদিন ওদের চলার পথের সঙ্গী । একজন না আসলে বা দেরী করলে আরেকজনের চোখ অন্যজনকে গভীর আগ্রহে খুজে বেড়ায় । কারও সাথে কারও বন্ধুত্ব হয়নি কিন্তু একটা আজানা টান ওরা অনুভব করে ।তাই এর মধ্যেই সার্থক সাথীদের বাড়িটা চিনে নিয়েছে । সার্থক দেখেছে ওদের বাড়িতে সাথী রাস্তার পাশের একটা ঘরে থাকে । ছুটির দিনে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সার্থক দেখেছে সাথী ঐ ঘরটায় বসে পড়াশুনা করে । সাথীর সাথে দু একবার চোখাচোখিও হয়েছে ।চোখাচোখি হওয়ার সাথে সাথে সার্থকের মধ্যে একটা তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে । ও সাথীর চোখের মধ্যে একটা গভীরতা দেখেছে । মনে হয়েছে সাথীর হৃদয়ে আছে অসাধারণ ভালোবাসার সঞ্চয়। অনুভব করেছে যে সাথী যেন ক্রমশ নিজের দিকে সার্থককে টানছে । কোনদিন সাথীর সাথে না দেখা হোলে মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়ে যায় । সার্থকের খুব সাথীর মনটা জানতে ইচ্ছা হয় ।ওকি সার্থককে মিস করে, সেটা খুব জানতে ইচ্ছা করে সার্থকের । সার্থক ঠিক করে ও লুকিয়ে লুকিয়ে সাথীকে চিঠি দেবে । কিন্তু প্রথমে কোন নাম লিখবে না , যদি এই নিয়ে কোন অশান্তি তৈরি হয় ।
ছোট্ট কাগজে সার্থক লিখল – “তোমার হাসি , তোমার কথা বলার ভঙ্গিমা, তোমার চলাফেরা আমাকে খুব মুগ্ধ করে” । চিঠিটা লুকিয়ে সাথীর ঘরের জানলা দিয়ে ফেলে দিল । সাথী চিঠিটা পেয়ে অবাক হলো কিন্তু কেন জানিনা তার মনে হল চিঠির লেখাগুলো খুবই আন্তরিক। সে চিঠিটি সযত্নে রেখে দিল আর কাউকে কিছু না বলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে চাইলো ।
সার্থকও কয়েকদিন অপেক্ষা করলো কোন রকম অশান্তি হয় কিনা দেখতে । যখন দেখল সবই ঠিক আছে তখন আরেকটা কাগজে লিখল – “খুব ইচ্ছা করে তোমার সাথে আলাপ করতে , কথা বলতে কিন্তু ভয় হয় তুমি কিভাবে react করবে”। এবারও কোন নাম লিখল না । সাথী বুঝতে পারলো কেউ লুকিয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করছে । কিন্তু কে সে সেটা জানতে ওর খুব ইচ্ছা হচ্ছিল । একটু একটু ভাল লাগতে লাগলো । প্রতিদিন একটি করে নতুন চিঠি পাওয়া তার জন্য আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়াল। প্রতিটি চিঠি যে মনের গভীর থেকে লেখা সেটা সাথী উপলব্ধি করতে পারছিল । কিন্তু কে যে প্রতিদিন এইরকম নাম ছাড়া চিঠি দিচ্ছে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না । সাথীকে প্রতিদিন নতুন করে এই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করছিল ।ও লক্ষ্য করছিল যে ছেলেটার সাথে ওর প্রতিদিন রাস্তায় চলতে গেলে দেখা হয় ও খুব বেশী করে ওর বাড়ির চারপাশ দিয়ে যাতায়াত করছে । রাস্তায় ওর সাথে দেখা হোলে মনে হচ্ছিল ও যেন কিছু বলতে চায় । কিন্তু বোধহয় সাহস পাচ্ছিল না পাড়ায় নতুন এসেছে বলে । সাথীদের উলটোদিকে সাথীর ছোট বেলার বান্ধবী লিপি থাকে । ও ওকে সব বলে বলল একটু লুকিয়ে ওদের বাড়ির দিকে লক্ষ রাখতে কে প্রতিদিন চিঠি ফেলে যায় । অবশেষে সাথী জানতে পারলো যে ছেলেটার সাথে ওর প্রতিদিন দেখা হয় এটা তারই কীর্তি । মনে মনে সাথী এটাই চাইছিল । মনটা আনন্দে ভরে উঠল । গুন গুন করে গান গাইতে ইচ্ছা হোল । সাথী ঠিক করলো ও যে বুঝতে পেরেছে সেটা ছেলেটাকে জানিয়ে দেবে । সাথী ছোট্ট একটা চিঠি লিখল “তোমার চিঠিগুলো আমার জীবনে আলো এনে দিয়েছে। ধন্যবাদ। সাথী ।” লিপির মাধ্যমে চিঠিটা সার্থকের হাতে পৌঁছে দিল ।
এরপর, তাদের মধ্যে প্রতিদিন চিঠি আদান-প্রদান হতে লাগল। তারা কখনো সরাসরি কথা বলেনি, কিন্তু চিঠির মাধ্যমে একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনতে পারল। সার্থক জানলো সাথীর প্রিয় ফুল রজনীগন্ধা আর সাথী জানলো সার্থক অবসর সময়ে বই পড়তে ভালোবাসে । বেশ কদিন পর একদিন সার্থক চিঠিতে লিখল, “আমরা এতদিন চিঠির মাধ্যমে কথা বলেছি, এবার সরাসরি দেখা করি? আজ সন্ধ্যায় নদীর ধারের পার্কে যদি আমরা দেখা করতে পারি, তাহলে খুব ভাল লাগবে।” সাথী সায় দিল।সন্ধ্যায়, পার্কে এসে সাথী দেখল, সার্থক হাতে একটি রজনীগন্ধার ফুলের তোরা নিয়ে অপেক্ষা করছে। তাদের চোখে চোখ পড়ল, আর মনে হলো যেন শত বছরের অপেক্ষার পর তারা একে অপরকে পেয়েছে। সার্থক সাথীর হাতে রজনীগন্ধার ফুলের তোরাটা দিল, আর সাথী সার্থকের হাতে দিল তার প্রিয় লেখক Jules Verneএর অমনিবাস ।
এইভাবে, চিঠির মাধ্যমে শুরু হওয়া তাদের ভালোবাসা সরাসরি দেখা করার মাধ্যমে আরও গভীর হলো। তাদের জীবনে চিঠির সেই মিষ্টি স্মৃতিগুলো থেকে গেল, যা তাদের সম্পর্ককে আরও মধুর করে তুলল। সাথী আর সার্থক অনুভব করলো যে সত্যিকারের ভালোবাসা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং হৃদয়ের গভীর থেকে আসে।