ডিভোর্সটা ওদের, শাস্তিটা সন্তানের – সুপ্রিয় রায়

বাবা–মায়ের বিচ্ছেদটা আসলে শুধু দু’জন মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয় , একটা শিশুর নিরাপত্তাবোধ, পরিবারের ধারণা, আর নিজেকে দোষী ভাবার প্রবণতা—সবকিছু একসাথে ভেঙে পড়ে। স্বামী – স্ত্রীর সংসারে যদি বাচ্চা আসে তাহলে স্বামী – স্ত্রীর ডিভোর্স নেওয়ার আগে ভাবা উচিৎ – ডিভোর্সটা ওদের, শাস্তিটা সন্তানের।

বৃষ্টি নামলে নির্ভীক আজও ছাতাটা খোঁজে।
একটা নয়—দুটো।

একটা ছিল বাবার। কালো, একটু ভাঙা হাতল।
আর একটা ছিল মায়ের—লাল, ফুল আঁকা।
নির্ভীক জানে, এখন আর দুটো একসাথে পাওয়া যায় না। তবু খোঁজে।

ডিভোর্স শব্দটার মানে ও ঠিক বুঝতে পারেনি সেদিন।
শুধু দেখেছিল, বাবা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে।
মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বসে আছে।
আর ও—দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে হিসেব কষছিল,
ঝগড়াটা কি ওর পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্টের জন্য?

তারপর দিনগুলো ভাগ হয়ে গেল।
সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার—মা।
শুক্রবার থেকে রবিবার—বাবা।

স্কুলের ফর্মে “Father’s Name” আর “Mother’s Name” লেখা থাকলেও,
নির্ভীক জানে—সব জায়গায় দু’জনকে একসাথে লেখা যায় না।

সবচেয়ে কঠিন ছিল রাতগুলো।
ঘুম ভাঙলে নির্ভীক বুঝতে পারত না—
এই কান্নাটা কাকে শুনিয়ে থামাবে।

একদিন স্কুলে রচনা লিখতে দিয়েছিল—
“আমার পরিবার”।
নির্ভীক  অনেকক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে ছিল।
একটা পরিবার লিখবে, না দুটো?

শেষে লিখেছিল—
“আমার পরিবার দুই জায়গায় থাকে।
কিন্তু আমি এক জায়গায় থাকতে চাই।”

শিক্ষিকা খাতাটা পড়েই আর কিছু বলেননি।
শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।

একদিন স্কুলে শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার বাবা কী করেন?”
নির্ভীক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।
সেদিন বাড়ি ফিরে নির্ভীক ডায়েরিতে লিখেছিল—
“আমি ভালো ছেলে হলে কি ওরা আবার একসাথে থাকত?”

ডায়েরির পাতাটা কেউ পড়েনি।
কিন্তু প্রশ্নটা ওর ভেতরে থেকে গিয়েছিল।

বছর কেটে গেল।
নির্ভীক বড় হলো।
ঝগড়া, আদালত, আত্মীয়দের ফিসফাস—সব ধীরে ধীরে শব্দ হারাল।
শুধু ভেতরের একটা ফাঁকা জায়গা থেকে গেল,
যেখানে আগে পরিবার ছিল।

একদিন হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি নামল।
বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে ও মনে মনে বলল—
“ভাঙাটা আমার দোষ ছিল না।
ভেজাটাও আমার শাস্তি নয়।”

ডিভোর্স বাবা–মায়ের সিদ্ধান্ত হতে পারে।
কিন্তু তার বিচার, কটাক্ষ আর শাস্তি—
সব কেন সন্তানের ঘাড়ে?

31 thoughts on “ডিভোর্সটা ওদের, শাস্তিটা সন্তানের – সুপ্রিয় রায়

  1. Aparajita Sengupta

    বর্তমান সমাজের একটা কঠিন বাস্তব কে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছো। মন খারাপ হলো নির্ভীক এর জন্য। ছবি টা খুব সুন্দর হয়েছে । 👌❤

    Like

  2. Mitali Samadder

    কত গভীর ভাবে চিন্তা করলে এত সুন্দর লেখা যায়। বাবা মায়ের ইগোর লড়াই এর জন্য সন্তানরা কষ্ট পায়।

    Like

  3. Sumita Chatterjee

    আজকাল ডিভোর্স তো আকছার হচ্ছে, একটু রাগারাগি, মনোমালিন্য হলেই ডিভোর্স। বাচ্চা র কথা তখন মাথায় থাকে না। বাচ্চারা খুব কস্ট পায়। সত্যি ভালো একটা উপস্থাপনা তুলে ধরেছেন।

    Like

  4. Ananda Ghosh

    পরিবেশ অসাধারণ লাগছে দাদা। খুব মিষ্টি লাগছে আপনাকে। আর ডিভোর্সের কথা বললেই মন খারাপ হয়ে যায় সত্যি নিজেরা ডিভোর্স নিয়ে আলাদা আলাদা জীবন কাটায় কিন্তু বাচ্চাদের কথা কেউই চিন্তা করেনা বাচ্চাগুলি সত্যিই অনাথ হয়ে পড়ে খুব সুন্দর আপনার লেখা খুব ভালো থাকবেন সুপ্রভাত

    Like

  5. Naru Mahato

    খুব সুন্দর পরিবেশন ।

    মাঝ মাঝে এই রকম সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরলে অনেক কিছু জানা যাবে।

    Like

  6. Lipika Roy

    কোনো সন্তানের যেন এইরকম শাস্তিভোগ করতে না হয়।

    ডিভোর্স নেবার আগে বাবা মায়েদের সবচেয়ে আগে সন্তানদের কথা চিন্তা করা উচিত।

    Like

  7. Papia Kargupta

    যারা তাদের সন্তানদের কথা না ভেবে এই কাজ করেন তাদের কে শত বুঝাতেও বুঝতে পারবেন না ঐ ইগো টাই আগে তাতে সন্তানের যা হয় হোক 😞😞

    Like

  8. Santwana Bhattacharyya

    হায় ভগবান? কেন এরকম হয়? কারো জীবনে যেন এসব না হয়। খুব ই মর্মান্তিক ঘটনা। খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছো।

    Like

  9. Ratnabali Chatterjee

    এত সুন্দর করে লিখেছেন একটা জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে যে পড়ে চোখে জল এল,গলার কাছে একটা ব্যথা দলা পাকাল নির্ভীকের কষ্টের কথা ভেবে।

    Like

Leave a comment