দীপাবলির পরের দ্বিতীয়া তিথিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত হয় ভাই-বোনের সম্পর্ককেন্দ্রিক এক বিশেষ উৎসব। ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গলকামনার পাশাপাশি এই উৎসব ভাই-বোনের পারস্পরিক স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
অঞ্চলভেদে এই উৎসবের নাম আলাদা—
- পশ্চিমবঙ্গ , আসাম ও ত্রিপুরা: ভাইফোঁটা
- উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়: ভাই দুজ বা ভাইয়া দুজ
- মহারাষ্ট্র, গোয়া ও গুজরাট: ভাই বীজ বা ভাই বিজ
- সিকিম ও দার্জিলিং: ভাই টিকা
- ওড়িশা: ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, ভাইফোঁটা বা অনুরূপ আচার
- কর্ণাটক: যমদ্বিতীয়া ও ভ্রাতৃদ্বিতীয়া
- অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা: ভ্রাতৃদ্বিতীয়া; কিছু অঞ্চলে Bhagini Hasta Bhojanam , ভ্রাতৃদ্বিতীয়া
- তামিলনাড়ু: কিছু সম্প্রদায়ে যমদ্বিতীয়া বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া -সংক্রান্ত আচার
- উত্তরাখণ্ড: ভাই দুজ
- কেরল : যম দ্বিতীয়া’ (Yama Dwitiya) , ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা মালয়ালম ভাষায় ‘ভায় দোজ’ (Bhai Dooj)
- মেঘালয় : ‘নিংগোল চাকৌবা’ (Ningol Chakouba) । এই দিনে বিবাহিত বোনেরা (নিংগোল) তাঁদের বাপের বাড়িতে ভাই ও পরিবারের সাথে মিলিত হন এবং ভাইয়েরা বোনেদের জন্য বিশেষ ভোজের (চাকৌবা) আয়োজন করে উপহার দেন।
নাম ও আচার আলাদা হলেও উৎসবটির মূল সুর একই—ভাই-বোনের ভালোবাসা ও মঙ্গলকামনা।
প্রাচীন সমাজে বিয়ের পর অনেক নারী বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। ভাইফোঁটার মতো উৎসব তাঁদের সঙ্গে জন্মপরিবারের যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং ভাই-বোনের সম্পর্ক দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তাই বলা যায় এই অনুষ্ঠান আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখারও একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, যমুনা তাঁর ভাই যমরাজকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিলক পরিয়ে তাঁর মঙ্গল কামনা করেন। বোনের স্নেহে সন্তুষ্ট হয়ে যমরাজ তাঁকে আশীর্বাদ করেন। এই কাহিনির সঙ্গে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনার বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে।
আমাদের মতে ভাইফোঁটার তাৎপর্যের তিনটি দিক –
১. ধর্মীয়: ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও অমঙ্গল থেকে মুক্তির প্রার্থনা।
২. সামাজিক: ভাই-বোনের যোগাযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা।
৩. মানবিক: ভাই শুধু বোনকে রক্ষা করবে—সম্পর্কটি এমন একমুখী নয়। ভাই ও বোন উভয়েই যেন পরস্পরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং একে অপরের মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে সম্মান করে—এই পারস্পরিকতাই উৎসবটির আধুনিক তাৎপর্য।
আমাদের সমাজে অনেক সময় প্রচলিত কুসংস্কার ও কঠোর অনুশাসনের কারণে স্বামীহারা নারীদের অনেক উৎসব-অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, যা সম্পূর্ণ অমূলক এবং অমানবিক।
স্বামীর মৃত্যুর পর একজন নারীর বৈবাহিক জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু তার জন্মগত পরিচয়—অর্থাৎ কারও বোন হওয়া—কখনোই পরিবর্তিত হয় না। তাই ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার বৈবাহিক বা সামাজিক অবস্থাকে টেনে আনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে আমাদের মনে হয় ।
পরিশেষে বলা যায় – ভাইফোঁটা শুধু কপালে ফোঁটা দেওয়ার আচার নয়; এটি পরস্পরের পাশে থাকার, ভালোবাসা ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার অঙ্গীকার।
সমাজ বদলায়, মানুষের চিন্তাভাবনাও আধুনিক হয়। কিন্তু কিছু পুরোনো গোঁড়ামি এখনও আমাদের মনকে বেঁধে রাখে। একজন স্বামীহারা বোনকে ভাইফোঁটায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া কেবল তার প্রতি দয়া দেখানো নয়, এটি হলো তার মানবাধিকার এবং সামাজিক মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
স্বামীহারা বোনকে কোন অবস্থাতেও ফোঁটা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা মানে তাকে আরও বেশি একাকীত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেওয়া। বরং এই উৎসবটি হতে পারে সেই নারীর জীবনের একটি বড় মানসিক সান্ত্বনা ও শক্তির উৎস। স্বামীহারা বোনদেরও উচিৎ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা ।
তাই ফোঁটা থাকুক কপালে, ভালোবাসা থাকুক হৃদয়ে—ভাই-বোনের সম্পর্ক অটুট থাকুক আজীবন।