সময়ের সম্বোধন – সুপ্রিয় রায়

বয়স বাড়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ কী?- চুল পাকা?

না।

চশমার পাওয়ার বাড়া?

না।

হাঁটুতে ব্যথা?

সেটাও না।

আসল লক্ষণ হলো—একদিন হঠাৎ করে কেউ যখন “কাকু” বা “কাকিমা” বলে ডেকে বসে ।

সেদিন আমি আর আমার স্ত্রী বাজারে যাচ্ছিলাম। পথে এক মহিলা আমাদের পাড়ায় নতুন এসেছে আমার স্ত্রীকে দেখে বলল— “কাকিমা, ভাল আছেন?!”

আমার স্ত্রী মুখে হাসি রাখলেও আমি বুঝলাম, ভেতরে ভেতরে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে।

মহিলা চলে যেতেই স্ত্রী বলল— “আমাকে কাকিমা বলল কেন? “

আমি বললাম — “কারণ তুমি ওর থেকে বড়।”

— “কিন্তু ও তো আমার থেকে বেশি ছোট না । নিশ্চয়ই আমার মুখেই বয়সটা বেশি ফুটে উঠেছে!”

আমি সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেলাম। বিবাহিত জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

বিকেলে বাজারে গিয়ে দেখা হলো স্নিগ্ধার সঙ্গে। আমাদের পাড়ার থাকতো এখন বিয়ের পর অন্য জায়গায় চলে গেছে ।

আমার স্ত্রীকে দেখেই বলল — “আরে বৌদি! কতদিন পরে দেখা!”

বুঝতে পারলাম আমার স্ত্রী মনটা আনন্দে ভরে গেল। ওর  মুখে সঙ্গে সঙ্গে বসন্ত নেমে এল।

আমি মজা করে বললাম — “তুমি ওকে বৌদি বলো?”

স্নিগ্ধা অবাক হয়ে বলল— “কেন বলব না? ছোটবেলা থেকেই তো  বৌদি ডাকি।”

আমরা গল্প করছি, এমন সময় স্নিগ্ধার কলেজপড়ুয়া আমাদের অচেনা এক বান্ধবী এসে বলল— “কিরে স্নিগ্ধা , আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি আর তুই কাকিমার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছিস । “

আমার স্ত্রীর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

স্নিগ্ধা হেসে কুটোপাটি।ও  হেসে বলল — “আমার কাছে তুমি বৌদি, আর ও তো তোমায় নতুন দেখছে তাই কাকিমা বলে ডেকেছে । কিছু মনে করো না বৌদি । “

বাড়ি ফিরে আমার স্ত্রী প্রথমেই আয়নার সামনে দাঁড়াল।

তারপর নিজেকে ভালো করে পরীক্ষা করে বলল – চোখ দুটো তো আগের মতোই আছে।

মুখটাও তেমন বদলায়নি।হ্যাঁ, কিছু সাদা চুল এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোকে রঙ দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে!তাহলে কাকিমা কেন?

সেই রাতে আমরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম।

স্ত্রী বলল — “জানো, কৃষ্ণাদি এখনও পাশের বাড়ির ওর থেকে সামান্য কিছুটা বড় এক মহিলাকে কাকিমা বলে ডাকে।”

— “তাতে কী হয়েছে?”

— ” কি হয়েছে মানে! জানো , কৃষ্ণাদির ছেলের বয়স তিরিশ!”

আমি বললাম — “সম্বোধনের জগতে বয়স থেমে যায়।”

কয়েকদিন পরে আমরা শাড়ি কিনতে গেলাম।

দোকানে ঢুকতেই বিক্রেতা বলল — “আসুন কাকু, বসুন।”

তারপর সে আমার স্ত্রীর দিকে ঘুরে এমন মিষ্টি গলায় বলল — “দিদি, আপনি কী রঙের শাড়ি দেখবেন?”

আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

আমি বললাম — “এক মিনিট! আমাকে কাকু আর ওকে দিদি কেন?”

ছেলেটা হেসে বলল — “এটা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, কাকু।”

— “মানে?”

— “একবার এক মহিলাকে ‘মাসিমা’ বলেছিলাম। উনি এমন রেগে গেলেন যে শাড়ি না কিনেই দোকান ছেড়ে চলে গেলেন!”

আমি হাসি চেপে রাখলাম।

ছেলেটা বলেই চলল — “সেদিন থেকে নিয়ম করেছি—মহিলা মানেই দিদি। বয়স যাই হোক।”

আমি বললাম — “তাহলে সব মাঝ বয়সী পুরুষ মানেই কাকু?”

— “হ্যাঁ । এতে কেউ রাগ করে না!”

দোকানের ভেতর সবাই হেসে উঠল।

আমি বললাম — “কিন্তু এটা তো বৈষম্য!”

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল — “না কাকু, এটা ব্যবসার স্বার্থে গৃহীত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।”

আমার স্ত্রী তখন এমন হাসছে যেন সে কোনো নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে গেছে।

বাড়ি ফেরার পথে আমি বললাম — “দেখলে? আমাকে বুড়ো বানিয়ে দিল!”

স্ত্রী গর্বের সঙ্গে বলল — “আর আমাকে দিদি বলল !”

আমি বললাম — “তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে সে তোমাকে বয়স দেখে দিদি বলেছে?”

— “না।”

— “তাহলে?”

— “কিন্তু শুনতে ভালো লাগে।”

আমি মাথা নাড়লাম।

সত্যিই, এই পৃথিবীতে কিছু মধুর মিথ্যা আছে, যেগুলো সবাই জেনেশুনেই বিশ্বাস করে।

“দাদা”, “বৌদি”, “কাকু”, “কাকিমা”, “দিদি”, “মাসিমা”—এগুলো আসলে বয়সের মাপকাঠি নয়।এগুলো হলো স্মৃতি, অভ্যাস, সম্পর্ক আর সামাজিক বুদ্ধির মিশ্রণ বা বলা যায় কৌশল বেশি কাজ করে।

বয়স আসলে সবারই বাড়ে। শুধু নিজেরটা ছাড়া!

আমার স্ত্রী হাসতে হাসতে বলল – “যারা ছোটবেলা আমায় থেকে দেখে এসেছে, তাদের কাছে আমার সম্বোধন চিরকাল এক ।যারা নতুন করে দেখছে, তাদের কাছে আমার সম্বোধন পরিবর্তনশীল ।

আর যারা ব্যবসা করে, তাদের কাছে আমি দিদি!আমি পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও বৌদি, কখনও কাকিমা, কখনও দিদি।”

আমি বললাম – “ শুধু আমাদের মতো স্বামীদের ভাগ্যটাই একটু অন্যরকম!

আমরা যতই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যুবক ভাবি না কেন, পৃথিবী কিন্তু চুপিচুপি আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

একদিন হঠাৎ বাসে, বাজারে, বা পাড়ার কোনো মোড়ে কেউ মিষ্টি হেসে বলে ওঠে—

“কাকু, একটু শুনবেন?” সেদিন একটু খচখচ করে।

তারপর কিছুদিন পর—”জেঠু, এদিকটা কোন রাস্তা?” তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

আর একদিন কোনো ছোট্ট বাচ্চা তার মাকে দেখিয়ে বলে—”মা, দাদুকে বলো না!”

ব্যস! সেদিন বাড়ি ফিরে আয়নাটাকেও সন্দেহ হয়!”

সে কখনও বলে না,- “আপনার বয়স বেড়েছে।”

আর আমরা তখনও নতুন ড্রেস পরে, চুলে রং লাগিয়ে, মনে মনে ভাবি—

“না না, আমি এখনও একদম ফিট!”

কিন্তু সময় মুচকি হেসে বলে—”আপনি ফিট আছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই…তবে আপনার পদোন্নতি হয়ে গেছে!”

সে শুধু ধীরে ধীরে সম্বোধনগুলো আপডেট করে দেয়—

ভাই –  দাদা –  কাকু –  জেঠু –  দাদু , বোন – দিদি – কাকিমা – জেঠিমা – দিদিমা

আর তখন বুঝতে পারি, সময় খুব ভদ্রলোক।

সে কখনও সরাসরি বলে না যে আপনার বয়স বেড়েছে।

সে শুধু সম্বোধনটা বদলে দেয়।

Leave a comment