শ্রুতি নাটক –  শেষ স্টেশনের আগে – সুপ্রিয় রায়

চরিত্র – দুই প্রবীণ নাগরিক, ঘোষক ও বর্ণনাকারী

ট্রেনের কামরা, সকালবেলা

[সাউন্ড: ট্রেন চলার শব্দ, মাঝে মাঝে হুইসেল, স্টেশনের ঘোষণার হালকা আওয়াজ]

ঘোষক (স্টেশনের স্টাইল):
পরবর্তী স্টেশন হাইদ্রাবাদ । যাত্রীরা দয়া করে প্রস্তুত হোন।”     ( अगला स्टेशन हैदराबाद हैयात्रीगण कृपया तैयार रहें)

তিলক  (যেন সামনের সিটের সহযাত্রিকে বলছে )- বুঝলেন ভাই,  ছোটবেলা থেকে ট্রেনের জানালা দিয়ে যতবারই বাইরে তাকাই, মনে হয় যেন সময়টা উলটো দিকে ছুটছে। আর এক এক করে পুরোনো দিনের কথা মনে পরে যায়  ।

বাপি  (হাসি গলায়, দূর থেকে)-  শুধু সময় না রে বন্ধু, মুখও তো পুরোনো মনে হচ্ছে! তুই তিলক না ?

তিলক  (চমকে)- বাপি ! আরে তুই?! এটা কী করে সম্ভব?

বাপি – শুধু সম্ভব না, একেবারে বাস্তব! আরে ভাই, প্রায় ৪৫  বছর পর তোর সঙ্গে দেখা হলো… তাও আবার ট্রেনে!( হাসি )  

তিলক – আরে , তোর হাসিটাও তো দেখি সেই আগের মতো আছে রে । আয় আয় পাশে বোস  ।

বাপি – ভাগ্যিস ওদিকের টয়লেটটা বন্ধ ছিল বলে এদিকের টয়লেটে গেছিলাম । ঠিক তোর কথাই মনে মনে ভাবছিলাম, আর দেখি তুই এখানেই! ( বসতে বসতে ) বিশ্বাসই হচ্ছে না… তিলক !

তিলক– তোর মনে আছে , তোর সাথে আমার শেষ দেখা সেই ১৯৮১ সালে যখন আমি কানপুর ছেড়ে দিল্লি চলে গেলাম ।

বাপি –  আর আমি তো কানপুরেই চাকরীর জন্য র‍্য়ে গেলাম । তখন মোবাইল কোথায় ? তাই কে কোথায় হারিয়ে গেলাম বল!

তিলক – তারপর চাকরীর সুবাধে কত জায়গা ঘুরে এখন পরিপূর্ণ অবসর… কিন্তু স্মৃতি এখনো ছুটি নেয়নি।

বাপি –এমন করে আবার দেখা হবে ভাবিনি।সত্যি বলছি এই বয়সে জীবনটা আবার যেন একটু রঙ পেয়ে গেল রে!

 [হালকা সেতার বা বাঁশির সঙ্গীত, পুরনো দিনের গন্ধ আনার জন্য]

তিলক – তা তুই কোথায় যাচ্ছিস ?

বাপি – হাইদ্রাবাদ। আমার মেয়ে , জামাই ওখানে থাকে । ওদের কাছেই যাচ্ছি । তা তুই কোথায় যাচ্ছিস ?

তিলক – আমিও হাইদ্রাবাদ । আমার ছোট ছেলে ওখানে থাকে । তা তোর সাথে তোর সহধর্মিণী যাচ্ছে তো , ওকে ডাক , পরিচয় করা ।

বাপি – না রে , আমি একাই যাচ্ছি । ও মেয়ের কাছেই কিছুদিন ধরে আছে । তার তোর বেটার হাফ কোথায় ? দেখতে পারছি না তো ।

তিলক – আমারও একই ব্যাপার । ও আমার ছোট ছেলের কাছে কদিন ধরে আছে ।

বাপি – আচ্ছা তোর আমাদের দুর্গাপূজার মাঠে নাটকের কথা মনে আছে ?   

তিলক – মনে থাকবে না আবার ? কত মজার মজার ঘটনা । সারা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে ।

বাপি – তোর মনে আছে একটা নাটকে শ্যামল কিরকম নার্ভাস হয়ে গেছিল ?

তিলক – মনে আবার নেই ? নাটক শুরু হবে আর বলে কিনা পেচ্ছাব করবো ।

বাপি – আর তারপরেই তো ঘটলো মজার ব্যাপার । শালা বলে কিনা পেচ্ছাব বাইরে পড়লো না ।

তিলক – আর ঐ ভেজা ড্রেস পরেই তো ওর নাটকটা করতে হোল ।কারণ সময় ছিল না ওর ড্রেস চেঞ্জ করার ।  

বাপি – আজও সেই ঘটনা মনে পড়লে হাসি পায় ।

তিলক – তা সেই শ্যামল এখন কোথায় থাকে জানিস ?

বাপি – যতদূর খোজ পেয়েছি ওরা এখন কলকাতায় থাকে । 

তিলক – আর আমাদের রঞ্জন , দেবু , সুভাষ, সুরজিত , জয়ন্ত , চিকু , Pintu ওদের খবর কিছু জানিস ?

বাপি – রঞ্জন তো গত বছরই চলে গেল… হার্ট অ্যাটাকে। দেবু ,  সুভাষ, সুরজিত , জয়ন্ত , চিকু , Pintu ওরা সবাই কানপুরেই থাকে , মাঝে মাঝে দেখা হয় ।

তিলক – সময় সব পাল্টে দিচ্ছে রে বাপি । আচ্ছা , তুই একটা জিনিস খেয়াল করেছিস ?

বাপি – কি বল তো ?

তিলক – সামনের ছেলেটাকে দ্যাখ , ট্রেনের মধ্যে সবসময়  ফোনে ব্যস্ত, আর আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবি কত কল্পনার গল্প…

বাপি – সেই গল্পগুলোই তো আমাদের মানুষ করেছিল, তিলক । এখনকার অনেকেই স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্পর্শ করতে পারে না।

তিলক – ঠিক বলেছিস । জানিস, আমি তো আজকাল ছেলেমেয়েদের পুরানো দিনের মজার মজার গল্প শোনাই। তাতে যদি অন্তত ভাববে , জীবনটা  শুধু চাকরি নয়, ভালোবাসাও।

বাপি – খুব ভাল লাগছে , তুই আজও একিরকম আছিস ! আর জানিস আমি এখনও আমাদের  ফ্যাক্টরির  সাইরেন শুনে ঘড়ি মেলাই! (হাসে)

তিলক – তাই নাকি ? তবে , বয়স বাড়লেও, কিছু জিনিসের বয়স হয় না।

বাপি – তা তুই এখন সময় কাটাস কি করে ?

তিলক  – বই পড়ি, লেখালেখি করি , ভিডিও বানাই আর মাঝে মাঝে রাতে ছাদে বসে আকাশ দেখি।

বাপি – জানিস তিলক , আমার মনে হয় জীবনটা রেল লাইনের মতো… সমান্তরাল পথ—কখনও মেলে না, তবু একসঙ্গে চলে।

তিলক  – কী দারুণ বললি রে! তোর কিন্তু লেখার হাত আছে!

বাপি  – (হাসে) চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর একটু একটু করে লিখি। অথচ কাউকে শোনাই না ।

তিলক – আরে আমরা নিজেরাই তো এখন নিজেদের দর্শক হয়ে গেছি।

বাপি – ঠিক বলেছিস । ঘরভরা মানুষ, কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে মনটা কিরকম ফাঁকা ফাঁকা লাগে ।

তিলক – স্মৃতিগুলো যেন এক একটা কামরা… তুই আমার সেই পুরোনো কামরাটা খুলে দিলি আজ।

ঘোষক –
আর কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন হাইদ্রাবাদ ঢুকবে । দয়া করে নিজেদের মালপত্র নিজেদের দায়িত্বে রাখুন (और कुछ ही देर में ट्रेन हैदराबाद में प्रवेश कर जाएगीकृपया अपना सामान अपनी जिम्मेदारी पर रखें)

বাপি  – তুই নামবি তো এখানেই?

তিলক – হ্যাঁ, আমার ছেলে নিতে আসবে। তুই?

বাপি – আমার মেয়ে – জামাই আসবে আমাকে নিতে । চল নেমে আমরা একসাথে কফি খাই , আর ওদের পরিচয় করিয়ে দিই ।

তিলক – সেই ভাল । একটা কথা কি জানিস – মনটা আজ যেন অনেক হালকা হয়ে গেল। তা তোর ফোন নম্বর দে… আবার দেখা করতে হবে তো ।

বাপি  -(হালকা গলায়)আরে এই জীবনের ট্রেন যতক্ষণ চলবে, ততক্ষণ তো দেখা হতেই পারে… তবে একটা কথা বলি তিলক —

তিলক – বল।

বাপি – শেষ স্টেশন না আসা পর্যন্ত, জানালায় তাকিয়ে থাকিস ,  অনেক গল্প এখনও বাকি।

[ সেতারের আবেগময় টুকরো, ধীরে ধীরে ট্রেন থামে]

ঘোষক –
“ট্রেন
হাইদ্রাবাদ স্টেশনে ঢুকছে ।“( ट्रेन हैदराबाद स्टेशन में प्रवेश कर रही है।)

তিলক  – সত্যি তোর সাথে এমনিভাবে দেখা হবে একদম ভাবিনি।

বাপি  – আমার কি মনে হচ্ছে জানিস ?

তিলক  – কি ?

বাপি  -আমাদের শেষ স্টেশন এখানো দেরী আছে । তোর সঙ্গে দেখা হওয়াটা বোধহয় জীবনের পুরোনো পাতায় আবার রঙ ধরিয়ে দিল ।

তিলক(আবেগে)  – ঠিক বলেছিস আমাদের শেষ স্টেশনের আগে অনেক গল্প বাকি আছে । দেখিস , শেষ স্টেশনের আগে, গল্পগুলো যেন শেষ না হয়।

[সেতার বা বাঁশির বিষাদময় সুর]
ঘোষক:
হাইদ্রাবাদ স্টেশন এসে গেছে। যাত্রীরা দয়া করে নেমে যান।”(हैदराबाद स्टेशन गया हैयात्रीगण कृपया उतर जायें

শেষ বার্তা ( আবহ সঙ্গীতের সাথে সাথে )

বর্ণনাকারীর কণ্ঠ(উচ্চারণে ধীর, আবেগভরা)-
বন্ধুত্ব আর মধুর স্মৃতি পুরোনো হলেও  জীবনের শেষ যাত্রা অবধি মনের ভিতর জ্বলজ্বল করে । পুরোনো হলেও কখনও ফুরোয় না। সময় চলতে থাকে কিন্তু কক্ষনো থেমে যায় না,  কিছু মুখ আমাদের মনে থেকে যায় আজীবন। যদি কারও  সাথে অনেকদিন দেখা না হয়,  তাকে খুঁজতে থাকুন জীবনের শেষ স্টেশন পর্যন্ত ।  হয়তো দেখবেন তিনিও আপনাকে খুঁজছেন…”

Leave a comment