সাথী জানলার ধারে বসে ছিল। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু তার মনটা যেন আরও বেশি ভারী।
আজ সকাল থেকেই ওর মন খারাপ। কারণটা খুব বড় কিছু নয়— সকালে সার্থক অফিসে যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল,— “আজ একটু দেরি হবে ফিরতে, খাবার জন্য অপেক্ষা কোরো না।”
কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু সাথীর কেমন যেন লেগেছিল। কয়েকদিন ধরেই সার্থক খুব ব্যস্ত। অফিস, বাড়ির EMI, বাবার চিকিৎসা— সব মিলিয়ে ও যেন আগের মতো হাসে না, গল্পও করে না।
সাথীর মনে হচ্ছিল, সংসারের এত দায়িত্বের মাঝে হয়তো সে নিজেই কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।
বিয়ের প্রথম দিকটা অন্যরকম ছিল।সার্থক মাঝেমধ্যেই হঠাৎ ফুচকা খেতে নিয়ে যেত, রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করত। আর এখন?
দিনগুলো যেন শুধু হিসেবের খাতা।
সাথী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সার্থকর নাম।
— “হ্যালো?”
— “সাথী, তুমি খেয়েছ?”
— “না, খিদে নেই।”
— “আবার মন খারাপ?”
সাথী একটু চুপ করে বলল,— “তুমি আগের মতো নেই।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সার্থক শান্ত গলায় বলল,
— “আগের মতো নেই মানে?”
— “আগে আমার জন্য সময় ছিল। এখন শুধু দায়িত্ব আর কাজ।”
সার্থক হালকা হেসে বলল,— “তোমাকে একটা কথা বলি? আগে আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতাম। এখন তোমাকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে তোমার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবি। তাই হয়তো দায়িত্বগুলো বেশি চোখে পড়ে।”
সাথী চুপ করে গেল। কথাটা সে এভাবে ভাবেনি কখনও।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। দরজা খুলে সার্থক ঢুকল। হাতে ছোট্ট একটা কাগজের প্যাকেট।
সাথী অবাক হয়ে বলল,— “এটা কী?”
সার্থক প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিল।ভিতরে সাথীর প্রিয় নলেন গুঁড়ের সন্দেশ।
— “ফিরতে দেরি হলো, কিন্তু দেখলাম দোকানে তোমার পছন্দের সন্দেশ আছে। ভাবলাম নিয়ে যাই।”
সাথীর চোখে জল চলে এল।এতদিন সে ভেবেছিল সার্থক বদলে গেছে। অথচ মানুষটা শুধু ভালোবাসার প্রকাশের ধরন বদলেছে।
সাথী হেসে বলল,— “আমি খুব বোকা, তাই না?”
সার্থক মাথা নেড়ে বলল,— “না। শুধু মাঝে মাঝে আমাদের দু’জনেরই মনে রাখা দরকার, সংসারে ভালোবাসা চিৎকার করে আসে না— অনেক সময় সেটা দায়িত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।”
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।সাথী দু’কাপ চা বানিয়ে আনল।
চায়ের কাপ হাতে সার্থক বলল,— “একটা নিয়ম করি?”
— “কী নিয়ম?”
— “দিনে যত ব্যস্ততাই থাকুক, রাতে অন্তত আধঘণ্টা শুধু আমাদের জন্য।”
সাথী মুচকি হেসে বলল,— “ঠিক আছে। তবে মাঝে মাঝে ফুচকাও চাই।”
দু’জনেই হেসে উঠল।
সংসারের সব সমস্যার সমাধান হয়তো একদিনে হয় না।
কিন্তু একটু বোঝাপড়া, একটু বিশ্বাস, আর একটু ভালোবাসা থাকলে— কঠিন পথও সহজ লাগে।