ছোট্ট সহেলির মুখে ভাত- সুপ্রিয় রায়

আজ যেন বাড়িটা সত্যিই উৎসবের রঙে রঙিন। সকাল থেকেই আত্মীয়-স্বজন, হাসি-আনন্দ আর ব্যস্ততায় মুখর চারদিক। কারণ আজ বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্যা , ছোট্ট সহেলির মুখে ভাতের অনুষ্ঠান

বয়স মাত্র ছয় মাস। এখনও ঠিকমতো বসতেই শেখেনি সে। গোলাপি রঙের টুকটুকে পোশাকে তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা জীবন্ত পুতুল। মাথায় ছোট্ট ফুলের টায়রা, হাতে নরম চুড়ি—আজ সে-ই সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

কে তাকে কোলে নেবে, কে আগে ছবি তুলবে, কে তার সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটাবে—তা নিয়েই আত্মীয়দের মধ্যে মিষ্টি প্রতিযোগিতা চলছে।

কিন্তু সহেলি এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না।

সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে ভাবছে— “আজ হঠাৎ এত লোক আমাদের বাড়িতে কেন? আর সবাই আমাকে দেখেই এত খুশি হচ্ছে কেন?”

একজন এসে গাল টিপে বললেন,— “আহা! কী মিষ্টি!”

আরেকজন বললেন,— “এদিকে তাকাও, একটা ছবি তুলি।”

তৃতীয়জন,— “একটু হাসো তো মা!”

সহেলি মনে মনে ভাবল,- “আমি কি সত্যিই মানুষ, না কি চিড়িয়াখানার নতুন কোনো প্রাণী?”

চারদিকে বিশাল আয়োজন। রঙিন বেলুন, ঝলমলে আলো, ফুলের সাজ, সুন্দর মঞ্চ, কেক আর নানা রকম সুস্বাদু স্টার্টারে ভরা টেবিল। চিকেন পকোড়া, ফিশ ফিঙ্গার, চিজ বল, মোমো, আর কত রকমের শরবত —দেখে বড়রাও যেন ছোট হয়ে যাচ্ছে!

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, খাবারের চেয়ে সবাই বেশি ব্যস্ত সহেলিকে নিয়ে।শুরু হলো মহা ফটোসেশন।চারজন ফটোগ্রাফার চারটে ক্যামেরা আর আলো নিয়ে এমনভাবে প্রস্তুত, যেন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন কভার করতে এসেছেন!

একজন বললেন,— “বাচ্চাটাকে একটু হাসাতে হবে , সুন্দর ছবি হবে।”

ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল নানান কসরত।

ঠাকুমা ডাকল ,— “দিদিভাই, এদিকে তাকাও!”

দিদা খেলনা ঝাঁকাতে লাগল।

কাকাই  মোবাইলে কার্টুন চালাল।

পিসি এমন সব মুখভঙ্গি করতে লাগল, যা দেখে পাশের মানুষও হাসতে বাধ্য।

মনে হচ্ছিল, সহেলি নয়—আজকের সবচেয়ে বড় সেলিব্রিটি যেন সে-ই!

প্রথমে ব্যাপারটা সহেলির বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সে বুঝে গেল, অনুষ্ঠানটা বোধহয় তার চেয়ে ফটোগ্রাফারদেরই বেশি।

অবশেষে বিরক্ত হয়ে সে জোরে কেঁদে উঠল।

তখন সবাই মিলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। একটু আদর, একটু খেলা, একটু কোলে নেওয়া—অনেক কষ্টে আবার তার মুখে হাসি ফিরল।

তারপর তাকে নতুন পোশাক পরিয়ে ছোট্ট সিংহাসনের মতো সাজানো একটি চেয়ারে বসানো হলো।

এবার সত্যিই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—মুখে ভাতের পবিত্র অনুষ্ঠান।

রুপোর বাটিতে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি পায়েস।কাসার বড় বড় থালায় সযত্নে সাজানো ভাত, পাঁচ রকম ভাজা, নানা রকম তরকারি, মাছ, মাছের মাথা, কয়েক রকমের মিষ্টি —সবকিছু ফুল দিয়ে এমন সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে যে মনে হচ্ছে যেন কোনো শিল্পকর্ম।

চারদিকে বাড়ির মহিলারা জড়ো হয়েছেন।

হঠাৎই ভেসে উঠল উলুধ্বনি।

শঙ্খের মঙ্গলধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটা আরও পবিত্র, আরও আনন্দময় হয়ে উঠল।

ফটোগ্রাফাররা প্রস্তুত।

আত্মীয়রা নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন।সহেলির মামা তাকে কোলে নিয়ে বসেছেন। সবাই তাকিয়ে আছে সেই এক মুহূর্তের দিকে—যখন ছোট্ট সহেলি জীবনে প্রথমবারের মতো অন্নের স্বাদ নেবে।

প্রথম চামচ পায়েস মুখের কাছে যেতেই সহেলি মুখ ঘুরিয়ে নিল।

চারদিকে হালকা হাসি।

দ্বিতীয়বার চামচ এগোতেই সে মামার আঙুলটাই শক্ত করে ধরে ফেলল।

হাসি আরও বাড়ল।

তৃতীয়বার অল্প একটু পায়েস মুখে যেতেই সহেলির মুখের ভাব একেবারে বদলে গেল। প্রথমে একটু ভ্রু কুঁচকে যেন স্বাদটা বুঝে নিল, তারপরই চোখ দুটো বড় বড় করে এমন তৃপ্তির হাসি দিল যে সবাই হেসে উঠল।

মনে হচ্ছিল সে যেন বলছে—

“আচ্ছা, এই জিনিসটার জন্যই এত লোকজন, এত ছবি তোলা, এত হইচই! এতক্ষণ ধরে সবাই আমাকে কোলে কোলে ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছিল কেন, এবার বুঝলাম! আগে এটা দিলেই তো এত ঝামেলা হতো না!”

তারপর তো আর তাকে থামানোই মুশকিল। চামচটা সামনে এলেই মুখটা হাঁ করে খুলে দিচ্ছে। যেন ঘোষণা করে দিয়েছে—

“অনুষ্ঠান-টুষ্ঠান পরে হবে, আগে পায়েসটা আসুক! আজকের আসল নায়ক আমি নই, এই পায়েস!”

ছোট্ট সহেলির সেই নিষ্পাপ হাসি আর পায়েস খাওয়ার উৎসাহ দেখে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ। মনে হচ্ছিল, ছয় মাসের এই খুদে অতিথিই যেন পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মজার এবং সবচেয়ে সুখের মুহূর্তটা উপহার দিল।

এবার আর কেউ হাসি চেপে রাখতে পারল না।হাসির রোলে মুখর হয়ে উঠল পুরো বাড়ি। এরপর শুরু হলো আরেকটি মজার পর্ব যার থেকে নাকি ধারনা করা যাবে ভবিষ্যতে ও কি হবে ।

সহেলির সামনে রাখা হলো একটি বই, কলম, মাটি , টাকা, ছোট্ট তবলা, গিটার , খেলনা, ছোট্ট একটি গ্লোব আর একটি ক্যারাবিনার।

সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে— ছোট্ট মেয়েটি প্রথমে কী তুলে নেয়?

সহেলি কিছুক্ষণ সবকিছু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখল।

তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সোজা ক্যারাবিনারটাই তুলে নিল!

সহেলির বাবা আর কাকাই তো আনন্দে আত্মহারা।

সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,— “দেখেছ! বড় হয়ে ও আমাদের মতো পাহাড় ভালোবাসবে। ট্রেক করবে, অভিযানে যাবে!”

কিছুক্ষণ পর ক্যারাবিনার ছেড়ে সহেলি এবার গ্লোবটা ধরল।

দাদুর মুখে তখন গর্বের হাসি।

তিনি বললেন,— “আমার নাতনি বড় হয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে।”

সহেলি অবশ্য মনে মনে ভাবছে—আমি এখন শুধু খেলব, দুধ খাব আর ঘুমোব। তোমরা এত দূরের পরিকল্পনা করছ কেন?”

ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হলো।

অতিথিরা খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

কেউ গল্প করছেন, কেউ ছবি দেখছেন, কেউ আবার সহেলির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন।

আর দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি?

সে তখন সব কোলাহল, সব আলো, সব আয়োজনকে হার মানিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মনে হলো, ঘুমের মধ্যেই সে যেন মুচকি হেসে বলছে—”তোমরা সবাই আনন্দ করো। আজ আমার মুখে ভাত, কিন্তু আসল উৎসবটা তো তোমাদেরই!”

তার সেই নিষ্পাপ, শান্ত, ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই একটাই প্রার্থনা করল— জীবনের প্রতিটি দিন যেন তার জন্য এমনই আনন্দময় হয়, তার হাসি যেন সারাজীবন এমনই নির্মল ও মধুর থাকে।

29 thoughts on “ছোট্ট সহেলির মুখে ভাত- সুপ্রিয় রায়

  1. Aparajita Sengupta

    আমাদের নাতনি র মুখেভাতের অনুষ্ঠান খুব সুন্দর হয়েছিল, দারুণ আনন্দে ও আড্ডায় সারাদিন কেটেছিল। ছোট্ট নাতনি র জন্য রইল অনেক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা ।💓🩷🙌🙌

    Like

  2. Bani Paul

    দিদিভাই মুখেভাত তোমার আমরা মহাভোজ খেলাম।পরেরবার যখন আসবে তোমার সব প্রিয় ও পছন্দের পদ আমরা খাওয়াব,প্রতিজ্ঞা করলাম,ভীষণ আনন্দ করলাম,সবসময় এরকম হাসি খুশি থেকো

    Like

  3. Mamata Mukherjee

    দূর থেকে ও সহেলীর মুখেভাতের অনুষ্ঠানে র আনন্দ উপভোগ করতে পারলাম আপনার লেখা পড়ে।খুব ভালো লাগলো।অনেক আশীর্বাদ আর ভালোবাসা জানাই ছোট্ট দিদিভাইকে।

    Like

  4. Mitali Samadder

    অপূর্ব আয়োজন। ছবি গুলো খুব সুন্দর হয়েছে। মুখে ভাত নিয়ে এত সুন্দর লেখা কোনো দিন পড়িনি। অনেক আদর ও ভালোবাসা ছোট্ট মিশিকাকে।❤️❤️❤️😍😍😍

    Like

  5. Tapas Das

    অসাধারণ কথামালা সুপ্রিয় দা। আপনার নাতনির জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা আর শুভাশিস।

    Like

  6. Papia Kargupta

    বাহ খুব সুন্দর হয়েছে ছবি গুলি

    ছোট্ট সোনা অনেক বড়ো হোক মানুষের মতো মানুষ হিসেবে পরিচিত লাভ করুক এই আশীর্বাদ রইল ❤❤😘😘

    Like

  7. Probodh Pal

    সুন্দর অনুষ্ঠান। অনেক অনেক আশীর্বাদ ছোট দিদি ভাইকে। তোমরা সবাই ভালো থেকো আনন্দ করো।✋

    Like

Leave a comment