কলেজের শেষ বর্ষের দিনগুলো।
ফেব্রুয়ারির বৃষ্টি—না পুরো শীত, না পুরো গরম—একটা অদ্ভুত মনখারাপের সময়।
সেদিন বিকেলে ক্লাস শেষ হতে দেরি হয়েছিল। চারপাশে সবাই ছুটছিল, আকাশের মুখ ভার, কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল।
সার্থক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, ব্যাগ কাঁধে, হাতে কিছু নেই—ছাতা আনিনি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে মৃদু কণ্ঠে কেউ বলল – “এই নাও, ছাতাটা ধরো। তোমার তো নেই।”
পেছন ফিরে দেখে , একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে—ওদের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী।
ওর পোশাকটা এখন আর মনে পড়ে না, শুধু মনে আছে ওর সেই হাসিটা—ভেজা মেঘের নিচেও সূর্যের মতো উজ্জ্বল।
সার্থক বলল -“না না, তোমারই লাগবে! তুমি তো ভিজে যাবে।”
ও হেসে বলল – “আমি তো পাশের গলিতে থাকি। তুমি তো অনেক দূরে যাবে, তাই না? নাও, কাল ফিরিয়ে দিও।”
ছাতাটা সার্থকের হাতে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ও হারিয়ে গেল।
ওর চলে যাওয়ার সময় বাতাসে একটা হালকা সুবাস রয়ে গেল—যেন কোনো অচেনা গানের সুর।
পরের দিন কলেজে ওকে খুঁজতে গিয়েছিল সার্থক ।
ওর ক্লাসে, ক্যান্টিনে—সব জায়গায় খোঁজ নিল। কোথাও নেই।
ওর এক বান্ধবী বলল – “ও আজ আসে নি। ওর বাবা অসুস্থ, জামশেদপুর গেছে।”
মনটা হঠাৎ কেমন যেন ভারী হয়ে গেল সার্থকের ।
ছাতাটা তখনও ব্যাগে রাখা—ওর স্পর্শ, ওর গন্ধ, ওর হাসি যেন এখনো সার্থকের গায়ে লেগে আছে।
বাড়ি ফিরে ওর বান্ধবীর দেওয়া নাম্বারটা বের করল।
অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল, ফোনটা করবে কি না ভাবছিল।
শেষমেশ সাহস করে কল করল —
কিন্তু ওপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
ওর কণ্ঠ শোনা গেল না।
আজও, সেই ছাতাটা সার্থকের সঙ্গে আছে—
ঠিক যেন ওর একটা নীরব স্মৃতি, ওর জীবনের কোণে গুঁজে রাখা এক টুকরো অতীত।
ভেবেছিল, কোনো একদিন নিশ্চয় দেখা হবে…
ফিরিয়ে দেবে ছাতাটা, ঠিক যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেদিন।
কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না—
দিন গড়ায়, বছর কেটে যায়, জীবন নিজের মতো পাল্টে যায়।
চাকরির টানে এখন সার্থক কলকাতায় থাকে ।
সেদিন অফিস যাওয়ার পথে দেখে , আকাশটা হঠাৎ করে কালো হয়ে উঠেছে—
একেবারে সেই ফেব্রুয়ারির বিকেলটার মতো।
মনে হচ্ছিল, যেন অতীতের দরজা আবার একটু ফাঁক হয়ে গেল।
অজান্তেই আলমারির ভেতর হাত বাড়িয়ে বের করল সেই পুরোনো ছাতাটা,যার হাতলটায় এখনো ওর স্পর্শ লেগে আছে যেন।
অফিস থেকে বেরোতেই শুরু হল বৃষ্টি।
ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করতে যাবে — এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এল এক চেনা গলা,
“এই ছাতাটা… এখনো রাখো?”
চমকে তাকাল সার্থক ।
দেখে , সেই চেনা হাসিটা—
যেটা সময়ও বদলাতে পারেনি।
ওর চোখে ছিল হালকা বিস্ময়, মুখে কোমল হাসি।
বলল, “আমি ভাবিনি তুমি এত বছর পরেও ওটা রেখেছ।”
সার্থক মৃদু হেসে বলল, “বলেছিলাম না, কাল ফিরিয়ে দেব?
হয়তো সেই ‘কাল’টা একটু বেশি লম্বা হয়ে গেল।”
ওও হেসে ফেলল।
বৃষ্টি তখন অনেকটা থেমে এসেছে।
ওরা দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল, গল্পে গল্পে।
অজান্তেই কখন যে এক ছাতার নিচে চলে এল— টেরই পাইনি।
চারপাশে গাড়ির শব্দ, ভেজা শহরের গন্ধ, আর এক অদ্ভুত শান্তি।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন শুধু দু’জনকে নিয়েই থমকে আছে।
যে ছাতাটা একদিন ফেরত দিতে চেয়েছিল সার্থক ,
আজ সেই ছাতাটাই হয়ে উঠল দু’জনের মাঝের নীরব সেতু।
ওটা আর ফেরত দেওয়া হল না—
কারণ ওটার অধিকার এখন দুজনেরই।
এক ছাতার নিচে, এক গল্পের ভেতর, এক জীবনের শুরু যেন সেখানেই। কখনো কখনো একফোঁটা বৃষ্টি একটা জীবনের গল্প লিখে দেয়… –