হীনমন্যতা সমাজের শেখানো এক নীরব শৃঙ্খল – সুপ্রিয় রায়

সুবিনয় খুব সাধারণ একটি ছেলে, কথা কম বলে। । শহরের ছোট্ট লাইব্রেরিটায় সে সকাল থেকে বিকেল অবধি বই সাজায়। ধুলো ঝাড়ে, রেজিস্টারে নাম লেখে, আর কার্ড ফেরত নেয়। লোকজন তাকে দেখে, কিন্তু খুব একটা লক্ষ করে না—যেমন দেয়ালের ঘড়িটাকে সবাই দেখে, কিন্তু কেউ আলাদা করে ভাবে না। অথচ তার ভেতরে ছিল গল্প লেখার প্রবল ইচ্ছে। ছোটবেলায় খাতার পেছনে পেছনে কত গল্প লিখেছে!কিন্তু বড় হতে হতে সে লেখা বন্ধ করেছে।

কারণ কেউ কোনোদিন তাকে কাঁধে হাত রেখে বলেনি—“ভালো লিখেছ।”
বরং বারবার শুনেছে—“তুই এসব করে কী করবি? তোর মতো ছেলের কি লেখক হওয়া মানায়? মানুষ বড় বড় লেখকের লেখা পড়ে, তোর লেখা কেন পড়বে?”

কথাগুলো প্রথমে ছিল অন্যের মুখে , একসময় সেগুলোই তার মাথার ভেতর নিজের কণ্ঠস্বর হয়ে বসে গেছে।

সে ফেসবুকে স্ক্রল করে—গল্প, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, কত কিছু।সব যে তার ভালো লাগে, তা নয়।তবু সে নিজেকে বোঝায়—“ওরা আলাদা জাতের মানুষ। আমি না।”

তার ভয় লেখাটা খারাপ হবে বলে নয়।তার ভয়—কেউ যদি তার লেখা পড়ে হেসে ফেলে?লেখাটাকে নয়, যদি তাকেই হাস্যকর মনে করে?

ছোটবেলায় সুবিনয় খুব কথা বলত। গল্প বানাত। স্কুলের ম্যাগাজিনে একবার লেখা ছাপা হয়েছিল। সেদিন খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু খুশি বেশিদিন থাকেনি। কেউ একজন বলেছিল,“লেখা খারাপ না, কিন্তু ওর ভাষাটা খুব সাধারণ।”

সেই “সাধারণ” শব্দটাই ধীরে ধীরে তার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সুবিনয়  বুঝে নেয়, সাধারণ মানে আলাদা হওয়ার যোগ্য না হওয়া।

একদিন লাইব্রেরিতে এক বয়স্ক মানুষ এলেন। প্রতিদিন আসেন। সুবিনয় জানে, উনি দর্শনের বই পড়েন। খুব চুপচাপ মানুষ। কিন্তু চোখে অদ্ভুত একটা উষ্ণতা আছে।

একদিন হঠাৎ ওনি সুবিনয়ের হাতে সুবিনয়ের লেখার খাতাটা দেখে বলেন,
“তুমি লেখো নাকি?” প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক ছিল। বিচার নেই, কৌতূহলও বেশি নয়।

সুবিনয় চুপ করে থাকে।

বয়স্ক ভদ্রলোক বলেন, “তুমি জানো, হীনমন্যতা আসলে অহংকারের উল্টো দিক না—ও একই মুদ্রার অন্য পিঠ।
তুমি ভাবছ তুমি লেখক নও, তাই লেখা দেখানোর যোগ্য নও। কিন্তু লেখক হওয়া মানে নিখুঁত হওয়া নয়—লেখা চালিয়ে যাওয়া।”

এই কথাটা সুবিনয়কে দারুনভাবে নাড়া দেয়। সে ঠিক করল, লিখবে—কেউ পড়ুক বা না পড়ুক।

কয়েকদিন পর লাইব্রেরির নোটিস বোর্ডে তার একটি ছোট লেখা টাঙানো হয়। কে টাঙিয়েছে, সে জানে না।

একদিন এক তরুণী লাইব্রেরিতে এসে বলল,“আপনি কি ওই ছোট গল্পটা লিখেছেন? নোটিস বোর্ডে টাঙানো আছে।”
সুবিনয় অবাক হয়ে তাকাল। সে তো নিজের লেখাটা লুকিয়েই রাখতে চেয়েছিল।

“ভালো লেগেছে,” মেয়েটা বলল।
খুব সাধারণ একটা বাক্য। কিন্তু সুবিনয়ের কাছে সেটাই যথেষ্ট।

সেদিন রাতে সুবিনয় নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াল।অনেকদিন পর সে নিজের চোখের দিকে তাকাল। সে বড় লেখক হয়নি। কিন্তু নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বরটা—যে তাকে বারবার ছোট করত—তার আওয়াজ অনেকটা কমে এসেছে।

এইটুকুই তার শুরু। সুবিনয় বিখ্যাত লেখক হয় না।কিন্তু সে নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচতে শুরু করে।

উপসংহার হিসাবে এটাই বলতে চাই –

সুবিনয় একা নয়।আমাদের চারপাশে অজস্র সুবিনয় আছেন—যাদের প্রতিভা নেই বলে নয়, বরং নিজেদের অযোগ্য ভাবতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেই তারা থেমে যান। সমাজ অনেক সময় সরাসরি থামায় না; সে কেবল বারবার মনে করিয়ে দেয় কে “সাধারণ”, আর কে “বিশেষ”। এই তুলনার ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় হীনমন্যতা।

ভয় সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দেয়,
আর হীনমন্যতা পেছন থেকে ফিসফিস করে বলে—
“তুই পারবি না।”

এই ফিসফিসানিটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

মানুষ হীনমন্য হয়ে জন্মায় না।
সমাজ তাকে ধীরে ধীরে ছোট হতে শেখায়।

এটা কাটানো মানে বড় হওয়া নয়,
এটা কাটানো মানে—
নিজের জায়গাটুকু দখল করে নেওয়া।

হীনমন্যতা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটা শেখানো এক নীরব অসহায়তা। আর সেই অসহায়তা কাটানোর প্রথম শর্ত—নিজের আয়নায় চোখ তুলে তাকানো ।

18 thoughts on “হীনমন্যতা সমাজের শেখানো এক নীরব শৃঙ্খল – সুপ্রিয় রায়

  1. Satyabrata Gupta

    বাঃ! কি সুন্দর গল্পের মাধ্যমে একটা সামাজিক বার্তা দিলেন। দারুণ লাগলো পড়ে। এই ধরণের বার্তা গল্পের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে আরও ছড়িয়ে পড়ুক।👏💐🌹

    Like

  2. Sudhir Bagchi

    অসাধারণ লিখেছ ভাই। খুব ভাল লাগল খুব ভাল। লিখে যাও ভাই। তুমি বরাবরই ভাল লেখ। নতুন কিছু নয়। খুব ভাল থাকো সবাইকে নিয়ে মঙ্গল হোক মঙ্গল হোক।

    Like

  3. Dalia Deb

    কত অকৃত্রিম বাস্তবায়ন….শত বার সমাদরের যোগ্য…সুবিনয় তার হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠুক নিজের পরিপূর্ণতা পেয়ে…এটাই কাম্য❤️❤️

    Like

  4. Chandana Banerjee

    খুব সুন্দর অনুগল্পটি।আর তার অভ্যন্তরীণ বার্তা। ধন্যবাদ জানাই। ভালো থাকুন দুজনেই।আর এমনি লিখে যান। মন জাগানো লেখা।

    Like

Leave a reply to supriyoroy Cancel reply