শীতের সকালে দিঘা ভ্রমণ : পরিবার, সমুদ্র আর স্মৃতির রোদ্দুর – সুপ্রিয় রায়

শীতের সকালে সমুদ্র দেখার আলাদা এক মাধুর্য আছে। হালকা কুয়াশা, ঠান্ডা হাওয়া আর ঢেউয়ের নীরব ডাক—সব মিলিয়ে মন যেন আপনিই ছুটে যায় সমুদ্রের দিকে। ঠিক সেই টানেই গত ৬ জানুয়ারি ২০২৬, ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে  আমাদের বৃহত্তর পরিবারের ১৪ জন সদস্য একসঙ্গে রওনা দিলাম হাওড়া স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে, গন্তব্য—চিরচেনা অথচ বারবার নতুন লাগা সমুদ্রনগরী দিঘা।

ট্রেনের কামরায় তখন গল্প, হাসি আর পারিবারিক হুল্লোড়। কখন যে সময় পেরিয়ে সকাল  সাড়ে ১০টায় দিঘা স্টেশনে এসে পৌঁছলাম, টেরই পেলাম না। স্টেশনে দূর থেকে চোখে পড়ল মন্দিরের চূড়া । স্টেশন থেকে সোজা চলে গেলাম ওল্ড দিঘায় আমাদের পরিচিতহোটেলে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে আর দেরি না করে হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম সমুদ্র সৈকতে।

সমুদ্র দর্শন করতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠল। শীতের কামড় বেশ ভালোই ছিল, তাই ইচ্ছা থাকলেও সমুদ্রে স্নান করা হল না। তবে জলে নেমে একের পর এক ঢেউয়ের উপলব্দি বেশ ভালই লাগছিল ।

দুপুরের আহার সেরে বিকেল সাড়ে তিনটেয় পৌঁছে গেলাম দিঘার অন্যতম নতুন আকর্ষণ—শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দিরে। যদিও দিঘা বহুবার আসা হয়েছে, তবে মন্দির স্থাপনের পর এই প্রথম দর্শন। বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মিত মন্দিরটি অপূর্ব সুন্দর আর্কিটেকচারের এক অনন্য নিদর্শন। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নির্মিত এই মন্দিরটি স্থাপত্যের দিক থেকে সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। এত ভিড় থাকা সত্ত্বেও কোথাও ঠেলাঠেলি, পাণ্ডা বা পুরোহিতদের দাপট নেই, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।

মন্দির সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য

  • খোলা থাকে: সকাল ৫.৩০টা থেকে রাত ৯টা
  • বন্ধ: দুপুর ১২.৩০টা থেকে বিকেল ৩.৩০টা
  • মন্দিরে প্রবেশের নেই কোন কঠোর বিধিনিষেধ, শুধু ভিডিও ক্যামেরা আর বড় ব্যাগ সাথে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা যাবে না ।
  • জুতো ও ব্যাগ রাখার জন্য বিনামূল্যের ব্যবস্থা

দিনের আলোয় মন্দির যেমন সুন্দর, তেমনই সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় মন্দিরের রূপ হয়ে ওঠে আরও মোহময়।

মন্দিরের কাছেই রয়েছে জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি। সেখান থেকে দেখা সূর্যাস্ত এক কথায় অনবদ্য। একদিকে ঘন ঝাউবন, অন্যদিকে অসীম নীল সমুদ্র—তার মাঝখানে ধীরে ধীরে সূর্যের ডুবে যাওয়ার দৃশ্য মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

সন্ধ্যায় এসে বসলাম ওল্ড দিঘার সমুদ্র সৈকতে। ঢেউয়ের শব্দ, ঠান্ডা হাওয়া আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডায়—সময় যে কীভাবে ভেসে গেল বোঝাই গেল না।

পরদিন ভোরে প্রথমেই গেলাম চম্পা নদী ও সাগরের মোহনা দেখতে। এখানেই দিঘার প্রধান মাছের আড়ত, ফলে চারপাশে মাছের গন্ধ লেগেই থাকে। কর্মব্যস্ত এই মোহনাও দিঘার আর এক বাস্তব রূপ তুলে ধরে।

এরপর নায়কালি মন্দির দর্শন করে পৌঁছালাম শঙ্করপুর বীচে। নিউ বা ওল্ড  দিঘার তুলনায় অনেকটাই শান্ত ও নির্জন—যাঁরা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির কাছে থাকতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ।

দুপুরে হোটেলে ফিরে আহার সেরে খানিক বিশ্রামের পর বিকেলে রওনা দিলাম উড়িষ্যার উদয়পুর বীচে। এখানে সহজেই স্কুটার ভাড়া পাওয়া যায়। তাই স্কুটার নিয়ে বিচের ওপর দিয়েই পৌঁছে গেলাম সুবর্ণরেখা নদী ও সাগরের মোহনাতে, যা উদয়পুর বীচ থেকে প্রায় ২–৩ কিলোমিটার দূরে।বিচের ওপর দিয়ে স্কুটার চালিয়ে মোহনা পর্যন্ত যাওয়া—এক কথায় দারুণ অভিজ্ঞতা!মোহনার কাছে বালির ওপর চোখে পড়ল অসংখ্য লাল কাঁকড়া—প্রকৃতির এই রঙিন উপস্থিতি পথচলাকে আরও আনন্দময় করে তুলল।

ফেরার পথে ঢুঁ মারলাম নিউ দিঘা বীচে। এখানে সৈকত জুড়ে ভিড় যথেষ্ট । ওল্ড ও নিউ দিঘা—দুই সৈকত জুড়েই সারাদিন মাইকে ভেসে আসে বাংলা গান ও দিঘা পরিষ্কার রাখার সচেতনতামূলক বার্তা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, উন্নত পরিকাঠামো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটক-বান্ধব পরিবেশের কারণে দিঘা আজ আরও বেশি আকর্ষণীয়। সমুদ্র , মন্দির , সূর্যাস্ত আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু  অমূল্য সময়ের ঝুলি ভরা স্মৃতি নিয়ে পরদিন আবার সেই চেনা তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে চড়ে ফিরে এলাম বাড়ির পথে। তবে বৃহস্পতিবার হওয়ায় ট্রেনটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বিলম্বিত ছিল। পরে জানা গেল, সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার এই রুটে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসের দেরিতে চলার প্রবণতা নতুন নয়—যা ভবিষ্যৎ পর্যটকদের মাথায় রাখা ভালো।

16 thoughts on “শীতের সকালে দিঘা ভ্রমণ : পরিবার, সমুদ্র আর স্মৃতির রোদ্দুর – সুপ্রিয় রায়

  1. Aparajita Sengupta

    এই শীতের মরসুমে পরিবারের সকলে মিলে দীঘা বেড়াতে গিয়ে খুব আনন্দ করলাম। আমাদের রোজকার চলার পথে এই বেড়ানো আলাদা অক্সিজেন জোগালো।🧡❤🧡❤

    Like

Leave a reply to supriyoroy Cancel reply