বন্ধু – সুপ্রিয় রায়

অনেক দিন পর গতকাল সার্থক দেশের বাড়িতে এসেছে । খুব ইচ্ছা করছে নিজ হাতে বাজারে গিয়ে পছন্দের জিনিসগুলো নিয়ে আসে । আজকাল দেশের সবকিছুই বিদেশে বসে পাওয়া যায় । তবে এখানকার মত অত টাটকা মাছ ওখানে পায়না । ওর খুব ইচ্ছা করছে বাজারে যাওয়ার । তাই রেডি হয়ে মাকে বলল – মা , আমি একটু বাজারে যাচ্ছি । কিছু আনতে হোলে বল ।

– তুই এতদুর থেকে জার্নি করে এসেছিস । তারমধ্যে আবার তোদের সাথে আমাদের দেশের সময়ের তফাত । সবাই বলে দুদিন নাকি hang over থাকে , খালি ঘুম পায় । তুই একটু রেস্ট নে না । বাবাকে বল কি কি খাবি । বাবা সব  নিয়ে আসবে ।

সার্থকের বাবা বারান্দায় বসে পেপার পরছিল । ওদের কথা কানে যেতেই উঠে আসলো ।

– হ্যারে বল কি কি আনবো ? তোদের ওখানে তো কেউ কাউকে ঠকায় না । দরদামও করতে হয় না । আর এখানে যদি বোঝে তুই বিদেশ থেকে এসেছিস তাহলে ঠকিয়ে ভুত বানিয়ে দেবে । তার থেকে আমায় বল আমি সব দেখে শুনে নিয়ে আসব ।

– না বাবা , আমিই যাই । কতদিন এখানকার বাজারে যাই না । এছাড়া যদি রাস্তা ঘাটে কারও সাথে দেখা হয়ে যায় । তোমাদের কত বলেছি সব সময়ের জন্য কাজের লোক রাখ । তোমরা পায়ের ওপর পা তুলে থাকো । আমরা ভাল উপার্জনের জন্য কেন বিদেশে পড়ে আছি বল ?  সংসারের সবাইকে ভাল রাখার জন্যই তো । আমরা থাকতে তোমাদের তো আর টাকা পয়সার অভাব নেই ।

বাজারের ব্যাগগুলো ছেলের হাতে দিয়ে মা বলে – তোরা বিদেশে থেকে  আমাদের জন্য যা করিস অনেকে দেশে থেকেও বাবা , মার জন্য সেরকম কিছু করে না ।  ছেলে মা , বাবার কাছে থাকলো কি বাইরে থাকলো সেটা বড় ব্যাপার না । আসল ব্যাপারটা হল সন্তানের বাবা, মার প্রতি কতটা টান আছে সেটা দেখার ।

  • শোন না , আমি যাই । এরপর দেরী হয়ে যাবে ।

এই বলে সার্থক বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো বাজারের উদ্দ্যেশে । বাড়ির থেকে বেশী দূর না বাজার , তাই চলল হেঁটে হেঁটে । হঠাৎ ‘সার্থক’ ডাক শুনে পিছনে থাকিয়ে দেখে ওর স্কুলের বন্ধু সৌম্য ওকে ডাকতে ডাকতে ওর দিকেই আসছে ।কাছে এসে সৌম্য বলল – কিরে সার্থক কবে এসেছিস ?

  • গতকাল এসেছি ।
  • তা শুনেছি তুই এখন নাকি ইংল্যান্ডে থাকিস আর খুব ভাল উপার্জন করছিস ।
  • আরে ছাড় না , এতদিন বাদে দেখা হোল তুই কেমন আছিস বল । গত দু বছর আগে যখন তোর বিয়ে হোল তখন আমি একটা নুতন চাকরীতে সবে জয়েন করেছি । তাই আসতে পারিনি । কিছু মনে করিস না ।
  • ঠিক আছে ভাই কোন ব্যাপার না । এখন তো কদিন আছিস , আমাদের বাড়িতে আয় একদিন । বৌয়ের সাথে পরিচয় হবে । আর একটা ভাল খবর দিই এর মধ্যে আমাদের একটা ছেলে হয়েছে ।
  • Congratulation সৌম্য । তা কোথায় যাচ্ছিস?
  • তুই তো জানিস এখন আমাদের দেশেও work from home করা যায় । তাই অফিসে না গিয়ে বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করছিলাম । বৌ বলল বাচ্চার দুধ নাকি শেষ হয়ে গেছে , এখনি আনতে হবে । কি করি বল তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম । দুধটা এনে দিয়েই আবার কাজে বসতে হবে । খুব প্রেসাররে অফিসের ।
  • ঠিক আছে , ঠিক আছে তুই যা । পরে কথা হবে ।

সৌম্য কিছুটা এগিয়ে গিয়েই আবার ফিরে আসে । বলে -দ্যাখ না সার্থক তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের হতে গিয়ে মানিব্যাগটাই আনতে ভুলে গেছি । বাড়ি গিয়ে টাকা আনতে অনেক দেরী হয়ে যাবে । কি করি বলতো ?

  • কত টাকা লাগবে তোর ? আপাতত আমার থেকে নিয়ে যা । আমি তো আছি এখন , পরে দিয়ে দিস ।এই বলে সার্থক হাজার টাকা বের করে সৌম্যর হাতে দিল ।  

সৌম্য টাকাটা নিয়ে বেজার মুখে বলে – খুব খারাপ লাগছে রে সার্থক । এতদিন বাদে তোর সাথে দেখা হোল , আর তোর থেকেই টাকাটা নিতে হচ্ছে । তা বিকালে বাড়িতে থাকবি তো , আমি এসে তোকে টাকাটা দিয়ে যাব ।

 – ঠিক আছে , ঠিক আছে । তুই এখন তাড়াতাড়ি যা । আসিস বিকালে , আমি থাকবো ।

একটু এগোতেই  আবার কল্যাণের সাথে দেখা । কল্যাণও সার্থকের সাথে স্কুলে পড়তো । সার্থককে দেখে কল্যান ওকে জড়িয়ে ধরল ।

সার্থক বলল – আজকে কার মুখ দেখে উঠেছি , বলতো । দু দুটো ছোটবেলার বন্ধুর সাথে দেখা ।

কল্যাণ জিজ্ঞেস করল – আবার কার সাথে দেখা হোল ?

  • আরে সৌম্যর সাথে ।
  • সৌম্যর সাথে ? টাকা চেয়েছে নিশ্চয় ?

সার্থক না বুঝে অবাক হয়ে কল্যাণের দিকে তাকাল । কল্যাণ বলতে শুরু করল – ছয় মাস হোল ওর চাকরী নেই । তুই তো বাইরে থাকিস , তাই তুই জানিস না । ও ওর জানা শোনা সবার থেকেই  মিথ্যা বলে টাকা নেয় । ওর কাছে অনেকেই টাকা পায় । তাই আর কেউ দেয়না ।

  • তা কল্যাণ , ওদের চলছে কি করে ? বিয়ে করেছে , একটা ছোট বাচ্চাও আছে শুনলাম ।
  • ও তো computer engineer , টুকটাক freelancer job কিছু করে । তবে তেমন কিছু না । ভাল মত চলে না সংসার । ওকে দেখলেই এখন বন্ধুরাও পালিয়ে যায় । তা তুই টাকা দিসনি তো । দিলে আর পাবি না ।

সার্থক , কল্যাণকে আর সৌম্যকে টাকা দেওয়ার কথা বলল না । কল্যাণের থেকে বিদায় নিয়ে ও বাজারের দিকে চলল ।

সন্ধ্যাবেলা সার্থক একা একা সৌম্যর বাড়ি গিয়ে পৌছাল । দরজার কড়া নাড়তেই সৌম্য দরজা খুলে সার্থককে দেখে ভাবল ও নিশচয় টাকা ফেরত নিতে এসেছে । ও সাথে সাথে বলে উঠল – দ্যাখ সার্থক , আমি কাল সকালে তোর বাড়ি গিয়ে টাকাটা দিয়ে আসব । কিছু মনে করিস না ।

সার্থক বলল – না রে , আমি সে জন্য তোর বাড়ি আসি নি । তোর বিয়েতে আসতে পারিনি তাই তোর বৌয়ের সাথে পরিচয় করতে আসলাম ।

  • আয় , আয় , ভিতরে আয় ।  সার্থক ঘরে ঢুকেই উপলব্ধি করতে পারলো ওদের দুরাবস্থার কথা । সার্থক পকেট থেকে একটা  বড় খাম বের করলো । ওটা সৌম্যর হাতে দিয়ে বলল – দ্যাখ , আমি তো তোদের বিয়েতে আসতে পারিনি , তাই আমার তরফ থেকে তোদের জন্য একটা ছোট্ট উপহার ।

সৌম্য খামটা খুলেই দেখল ওর মধ্যে ১০০ টা পাঁচশ টাকার নোট । ও অবাক হয়ে সার্থকের দিকে তাকাল । তারপর খুব ধীরে ধীরে আস্তে আস্তে বলল – তুই সব জানিস , তাই না । নিশ্চয় তোকে কেউ আমার অবস্থার কথা বলেছে । তারপরও তুই এসেছিস আমাকে সাহায্য করতে । যখন এখানে সবাই আমাকে দেখে না চেনার ভান করে , আর তখন তুই বিদেশ থেকে দেবদূতের মত আমার পাশে এসে দাঁড়ালি । জানিস তো আমাদের দেশের চাকরীর অবস্থা ।আমার মত হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ার প্রত্যেক বছর বিভিন্ন কলেজ থেকে পাশ করে বেরোচ্ছে । এখানে চাকরীর থেকে candidate বেশী ।তাই কোম্পানিগুলো সস্তায় আমাদের পরিশ্রম কেনে । যারা ভাল সুযোগ পাচ্ছে তারা তোর মত বিদেশে চলে যাচ্ছে ।আর মুষ্টিমেয় কিছু ছেলে মেয়ে দেশে ভাল চাকরী পাচ্ছে । সরকারি চাকরী আর কতগুলো , বেশিরভাগই প্রাইভেট কোম্পানিতেই চাকরী করছে । এখন তো সরকার , সরকারি কোম্পানিগুলোকে  ধীরে ধরে প্রাইভেট কোম্পানিতে রূপান্তরিত করছে । প্রাইভেট কোম্পানিগুলিতে যেহেতু কোন strong union  নেই তাই চাকরীরও কোন স্থিরতা নেই ।বলতে বলতে সৌম্যর চোখদুটি ছলছল করে উঠল । সার্থকের হাত ধরে বলতে থাকে – নিশচয় তোর মনে আছে যে কয়েক মাস আগে দেশে , বিদেশে একসাথে প্রচুর লোককে বড় বড় প্রাইভেট কোম্পানিগুলো চাকরী থেকে ছাটাই করেছে । তার মধ্যে আমিও একজন অভাগা । হটাত একদিন কোম্পানি হাতে নোটিশ ধরিয়ে দিয়ে  জানালো কোম্পানির অবস্থা খারাপ , হাতে তেমন প্রোজেক্ট নেই । তাই আমাদের চলে যেতে হবে । কি করবো বল , মেনে নেওয়া ছাড়া তো আর কোন গতি নেই । খুব চেষ্টা করছি ঘুরে দাঁড়ানোর ।তার মধ্যে আবার বিয়ে করেছি । খরচা অনেক বেড়ে গেছে । খুব কষ্টে আছি রে ভাই । বন্ধু বান্ধব , আত্মীয় স্বজন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । সেখানে তুই এতদিন বিদেশে থেকেও যে দেশের পুরানো বন্ধুদের প্রতি ভালবাসা রেখেছিস এটা ভাবা যায় না ।আসলে নির্ভর করে  মানুষটার মানসিকতা কেমন তা সে দেশে থাকুক বা বিদেশে থাকুক । বিদেশের প্রাচুর্যের মাঝে যে সবাই দেশের কথা ভুলে যায় এটা যে ভুল সেটা তোকে দেখলেই বোঝা যায় ।

আর বলতে পারে না সৌম্য । সার্থককে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরে ।

Conclusion বা উপসংহার হিসাবে বলতে পারি :

বন্ধুত্ব কোনো সীমা মানে না। এটি কোনো রঙ, জাতি বা শ্রেণীর ধার ধারে না। একে অপরকে সাহায্য করা এবং ভালোবাসা দিয়ে সত্যিকারের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা জীবনে এক নতুন রঙ নিয়ে আসে।

Leave a comment