ভারতবর্ষ  —এক কাব্যময় ভ্রমণ” – সুপ্রিয় রায়

ভারতবর্ষ —এক কাব্যময় ভ্রমণ” – সুপ্রিয় রায়

এই ভারতবর্ষ — নামটা উচ্চারণ করলেই যেন কানে ভেসে আসে শঙ্খধ্বনি, রাগরাগিণীর সুর, আর কোনো পুরাতন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি।
উত্তরে বরফ ঢাকা হিমালয় — দাঁড়িয়ে আছে ঋষির মতো, নির্বাক অথচ অভিভাবকের মতো শক্ত।
দক্ষিণে সমুদ্র — বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর, হিন্দ মহাসাগরের গর্জন যেন বলে, “এসো, দেখো, অনুভব করো আমার নীল বিস্তার।”

যদি উত্তরের তুষারচূড়ো থেকে যাত্রা করি শুরু—

জম্মু ও কাশ্মীর – শিকারা ভাসে ডাল লেকে, গুলমার্গের বরফে খেলে শীতের রোদ আর কাশ্মীরি কাহওয়ার গন্ধে ভরে থাকে সকাল।
লাদাখ— যেখানে নীল আকাশের নিচে প্যাংগং লেক রঙ বদলায় দিনের ছায়ায়, আর থিকসে গোম্পায় ঘণ্টাধ্বনি বাজে নীল আকাশে।
হিমাচল প্রদেশ—শিমলা, মানালি, ধর্মশালার পাহাড়ি পথে পাইনগন্ধে ভরে ওঠে নিঃশ্বাস ,  প্রতিটি বাঁক যেন একেকটি গল্প, পাইনবনের নীরবতা জড়িয়ে থাকে শীতল হাওয়া।
উত্তরাখণ্ড—গঙ্গার উৎস গঙ্গোত্রী, কেদারনাথের ঘণ্টাধ্বনি, নৈনিতালের হ্রদের স্বপ্নিল জলরাশি—সব মিলিয়ে এক আধ্যাত্মিক স্পর্শ।

নেমে আসি গঙ্গার উপত্যকায়—


পাঞ্জাব—স্বর্ণমন্দিরের সোনালি প্রতিফলন, সরসো ক্ষেতের হলুদ সমুদ্র, আর ভাঙড়ার তালে জীবন উদযাপন।

হরিয়ানা—কুরুক্ষেত্রের কণ্ঠে শোনায় গীতা, আর পিপল বৃক্ষের ছায়ায় যুদ্ধ ও ধর্মের চিরন্তন উপাখ্যান।
দিল্লি—লাল কেল্লা, কুতুব মিনার, ইন্ডিয়া গেট—প্রতিটি দেয়াল ও পাথরে মুঘল ও স্বাধীনতার ইতিহাস খোদাই হয়ে আছে।
উত্তর প্রদেশ—, গঙ্গার উপত্যকায় বারাণসীর ঘাটে সন্ধ্যার আরতি, মথুরার রাসলীলা, অযোধ্যার মন্দিরের প্রার্থনা—সবই শতাব্দীর সুরে বাঁধা। তাজমহলের চাঁদনি স্নান—চিরন্তন প্রেমের উপাখ্যান।

পূর্বের প্রকৃতির টানে —


ঝাড়খণ্ড—বেতলা অরণ্যের বন্যপথ, জলপ্রপাতের ঝংকার, আর আদিবাসী নৃত্যের উচ্ছ্বাস।

বিহার—নালন্দার ভগ্নাবশেষ, বোধগয়ার বোধিবৃক্ষের ছায়া, আর মহাবীরের শান্ত বার্তা—ইতিহাস এখানে নিঃশ্বাস নেয়।

পশ্চিমবঙ্গ – সুন্দরবনের বাঘ, দার্জিলিঙের চা-বাগান, কলকাতার ঐতিহ্য আর দুর্গাপুজোর মহিমা।
ওডিশা – পুরীর সমুদ্রতটে মহাপ্রভুর রথযাত্রা, কোনার্কের সূর্য মন্দিরের পাথরে খোদাই সূর্যকাব্য।
সিকিম –  গ্যাংটকের পাহাড়ি রঙ, ছাঙ্গুর হ্রদের বরফজল, কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি ভোর।
আসাম – কাজিরাঙার গণ্ডার, ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকা, চা-বাগানের সবুজ তরঙ্গ।
অরুণাচল প্রদেশ –  তাওয়াং মঠের নীরবতা, বরফঢাকা গিরিপথে সূর্যের লাল আভা।
নাগাল্যান্ড –  হর্নবিল উৎসবের রঙ, পাহাড়ি গ্রামগুলোর ধোঁয়ামাখা সকাল।
মণিপুর –  লোকটাক লেকের ভাসমান দ্বীপ, ইম্ফলের নৃত্যকলার সৌন্দর্য।
মিজোরাম – পাহাড়ে জড়িয়ে থাকা শহর, ঝর্ণার স্নিগ্ধতা।
ত্রিপুরা – উনকোটি পাহাড়ে পাথুরে খোদাই, আগরতলার রাজপ্রাসাদের গৌরব।
মেঘালয় – চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিস্নান, জীবন্ত শিকড়ের সেতু, শিলং-এর গানবাজনা।

পশ্চিমের সূর্যতাপে—


রাজস্থান—থর মরুভূমির বালি, জয়পুরের গোলাপি প্রাসাদ, উদয়পুরের হ্রদনগর, আর জোধপুরের নীল নগরীর রঙিন স্মৃতি।
গুজরাট – গির অরণ্যের সিংহ, সোমনাথের মন্দির, কচ্ছের সাদা মরুভূমির চাঁদনি।
মধ্যপ্রদেশ – খাজুরাহোর মন্দির, সাঁচির স্তূপ, কানহা অরণ্যের বন্যস্বপ্ন।

ছত্তীসগড় — চিত্রকূটের ঝরনা, কেভার ধোল রাজ্যের গুহার আঁধার, আর সবুজ বনের নিভৃত সৌন্দর্য।

মহারাষ্ট্র – আজন্তা-ইলোরা গুহা, মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভ, কঙ্কনি সমুদ্রতট।
গোয়া – বালুকাবেলার ঢেউ, পর্তুগিজ গির্জার স্থাপত্য, সঙ্গীতের রঙিন রাত।

দক্ষিণের সমুদ্রবায়ুতে—


আন্ধ্র প্রদেশ – তিরুপতির পাহাড়মন্দির, বিশাখাপত্তনমের সৈকত।
তেলেঙ্গানা – চারমিনারের গৌরব, গোলকোন্ডা দুর্গের ইতিহাস।
কর্নাটক – হাম্পির ধ্বংসাবশেষ, মাইসোরের প্রাসাদ, গোকর্ণের শান্ত সমুদ্র।
তামিলনাড়ু – মীনাক্ষী মন্দিরের রঙিন গোপুর, মহাবলিপুরমের পাথুরে শিল্প, কন্যাকুমারীর সূর্যাস্ত।
কেরালা – আলেপ্পির ব্যাকওয়াটার, মুনারের চা-বাগান, কাথাকলির নাচ।

দ্বীপের নীল জলপথে—
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ – হ্যাভলক দ্বীপের স্বচ্ছ সমুদ্র, সেলুলার জেলের ইতিহাস।
লক্ষদ্বীপ – প্রবাল দ্বীপের বর্ণিল জলজগৎ।

এছাড়া এখানে উৎসব প্রতিদিন — হোলি, দুর্গাপুজা , দীপাবলি, ঈদ, বড়দিন —
ধর্ম আর সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে হাসে, নাচে, গেয়ে ওঠে “বিবিধের মাঝে ঐক্য।”
খাবারেও যেন একটা মানচিত্র — কলকাতার রসগোল্লা থেকে লখনউর কাবাব, পঞ্জাবের মক্কা-রুটি থেকে চেন্নাইয়ের ইডলি-দোসা।

এই তো আমার ভারত—
যেখানে তুষারচূড়া থেকে প্রবাল দ্বীপ, মরুভূমি থেকে বৃষ্টিঘন অরণ্য—
প্রতিটি প্রদেশ একেকটি কবিতার স্তবক, আর পুরো দেশটি এক মহাকাব্য।

Leave a comment