আমাদের চোখে পাঞ্জাব ও হিমাচলের ভ্রমণ কাহিনির তৃতীয় পর্ব – মানালি

গত 06/10/2024 আমরা 265 কিমি যাত্রা করে চণ্ডীগড় থেকে গাড়ি নিয়ে মানালি এসে পৌছালাম সাড়ে 6 ঘণ্টা পর । চণ্ডীগড় থেকে মানালি পর্যন্ত যাত্রাপথটি ছিল অত্যন্ত মনোরম এবং দারুণ আকর্ষণীয় ।পথে বিলাসপুরের কাছে সুন্দরনগরে দেখলাম অপূর্ব সুন্দর এক হ্রদ , মাণ্ডির পথে পান্ডোহ ড্যাম  আর বিয়াস বা বিপাশা নদীর তীর ধরে কুলু উপত্যকা যা মনের স্মৃতি কোঠায় সারা জীবন আঁকা থাকবেএই যাত্রা পথটি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অত্যন্ত সুন্দর এবং প্রতিটি মুহূর্ত মনে দাগ কেটে যায় । মানালি হল ভারতের হিমাচল প্রদেশের 6,726 ফুট( যেখানে দার্জিলিং 6700 ফুট) বা 2,050 মিটার উচ্চতার একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি মূলত পার্বত্য অঞ্চলের সৌন্দর্য, তুষারাবৃত পর্বত এবং শান্তিময় পরিবেশের জন্য পরিচিত। ।সন্ধ্যাবেলা মানালির হোটেলে পৌঁছেই তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র রেখে শীতের পোশাক পড়ে কাছেই হেঁটে চললাম মল রোড ঘুরতে । মানালির মল রোড হল শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এটি একটি জমজমাট এবং প্রাণবন্ত এলাকা যেখানে বিভিন্ন দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, হস্তশিল্পের বাজার এবং হোটেল রয়েছে। সন্ধ্যার সময় মল রোডে ঘুরে বেড়ানো স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনের স্বাদ নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে উপভোগ্য।

পরেরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে 10 টা নাগাদ বেড়িয়ে পড়লাম মানালির local sight seeing করতে । একে একে দেখলাম ১৫৫৩ সালে মহাভারতের চরিত্র ভীমের স্ত্রী হিড়িম্বা বা হাদিম্বাকে উৎসর্গ করে নির্মিত ঘন দেবদারু বনের মাঝে অবস্থিত  হাদিম্বা মন্দির , বশিষ্ঠ গ্রামে অবস্থিত বশিষ্ঠ মন্দির এবং গরম জলের ঝর্ণা, THE CLUB HOUSE , TIBETAN MONASTERY, মানালির কাছে একটি ঐতিহাসিক দুর্গ নাগগর কাসল যা একসময় কুল্লু রাজাদের আবাস ছিল এবং বর্তমানে এটি একটি হেরিটেজ হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আর বিয়াস নদীর ধারে বিশাল এক বন যার নাম বন বিহার । ইলেকট্রিক চালিত গাড়িতে পুরো বন বিহার ঘুরে দেখলাম । শুনলাম অনেক হিন্দি সিনেমার শুটিং হয়েছে এই বন বিহারে । সব দেখে ফিরে আসতে দুপুর হয়ে গেল । খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম সেরে আবার বেড়িয়ে পড়লাম বিকালে মল রোডে এই অঞ্চলের প্রাণবন্ত সংস্কৃতি অনুভব করতে। সকাল 9:00 টা থেকে রাত্রি 9:00 টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মল রোড ।  

পরেরদিন মঙ্গলবার সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পড়লাম মানালি থেকে প্রায় 51 কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 3,978 মিটারের বা 13051 ফুট উচ্চতায় অবস্থিত হিমালয়ের পূর্ব পীর পাঞ্জাল রেঞ্জের একটি উচ্চ বিখ্যাত পর্বত গিরিপথ রোহটাং পাসের উদ্দেশ্যে । এটি হিমাচল প্রদেশের লাহৌল এবং স্পিতি উপত্যকার সাথে কুল্লু উপত্যকাকে সংযুক্ত করেছে। রোহটাং পাস যাওয়ার পথে দেখলাম বিয়াস নদীর জন্মস্থান বিয়াস কুন্ড । রোহটাং পাস পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়, কারণ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণী পর্যটকদের দারুন ভাবে আকর্ষণ করে। রোহটাং পাসটি তার চ্যালেঞ্জিং রাস্তা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্যও পরিচিত। হিমবাহ, ভূমিধস এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এখানে সাধারণ সমস্যা। পাসটি বিশেষ করে মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে খোলা থাকে এবং বাকি সময় প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের কারণে বন্ধ থাকে। রোহটাং পাসে লেকের ধারে প্রচণ্ড হাওয়ার মধ্যেও বসে থাকতে দারুন লাগছিল । ঐ অত ওপরে একজন লোক ফ্লাক্সে করে কফি বিক্রি করছিল । অত ঠাণ্ডার মধ্যে এক কাপ কফি মনে হচ্ছিল অমৃত পান করছি । শুনেছি রোহটাং পাসে অনেকের শ্বাস কষ্ট হয় । যেহেতু আমাদের কোন রকম অসুবিধা হয়নি তাই মনে হচ্ছিল আমরা তেমন বুড়ো হইনি

তারপর গেলাম চন্দ্রভাগা নদীর পাশ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম হাইওয়ে টানেলগুলোর মধ্যে একটি ২০২০ সালে তৈরি অটল টানেলে যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯.০২ কিলোমিটার । এটি হিমালয়ের পীর পাঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর নিচ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি মানালি থেকে লাহুল-স্পিতি উপত্যকা পর্যন্ত সারাবছর যাতায়াতের সুবিধা করে দিয়েছে । শীতকালে যখন রোহটাং পাস প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে বন্ধ থাকে, তখনও এই টানেলটি চালু থাকে, যা সৈন্য ও সরঞ্জাম পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মানালি থেকে লেহ-লাদাখের দিকে যাত্রার সময়কে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে ।

অটল টানেল দেখে শিশু গ্রাম ঘুরে পৌছালাম মানালি থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশের আরও একটি সুন্দর উপত্যকা সোলাং ভ্যালিতে  যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপের জন্য বিখ্যাত। সোলাং ভ্যালি শীতকাল এবং গ্রীষ্মকাল উভয় ঋতুতেই আকর্ষণীয়। শীতকালে পুরো উপত্যকা তুষারে ঢাকা থাকে এবং এই সময় স্কিইং, স্নোবোর্ডিং, আইস স্কেটিং-এর মতো তুষার-সম্পর্কিত খেলা ও কার্যকলাপ খুব জনপ্রিয়। আর গ্রীষ্মকালে প্যারাগ্লাইডিং, জিপলাইনিং, মাউন্টেন বাইকিং, হাইকিং, জোরবিং-এর মতো অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপ চালু হয়। সোলাং ভ্যালি তার বর্ণময় প্রাকৃতিক দৃশ্য, খোলামেলা পরিবেশ, এবং অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ।

পরেরদিন অর্থাৎ 09/10/2024 সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম কুলু উপত্যকায় বিয়াস নদীর ধারে । রাস্তায় ব্রেকফাস্ট সেরে 43 কিমি দূরে সোজা গিয়ে পৌছালাম সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১,৭৬০ মিটার বা 5774 ফুট উচ্চতায় পার্বতী নদীর উপত্যকায় অবস্থিত মনিকরণে । ঐতিহাসিক এই তীর্থস্থানে একই সঙ্গে অবস্থান করছে প্রাচীন গুরুদ্বারা ও শিবমন্দির। রয়েছে উষ্ণ প্রস্রবণ , অনেকের বিশ্বাস মনিকরণ এর এই উষ্ণ প্রস্রবণ- এ স্নান করলে শরীরের কোথাও কোনো ব্যথা বেদনা থাকলে সেটারও উপশম হয়।পার্বতী নদীর জল এখানে ফুটন্ত। তারপর ওখান থেকে 214 কিমি দূরে পাহাড়ি রাস্তা ধরে মাণ্ডি হয়ে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ২২৭৬ মিটার বা 7467ফুট উচ্চতায় উত্তর-পশ্চিম হিমালয় পর্বতমালার সাতটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত সিমলা পৌছালাম রাত সাড়ে 10 টা নাগাদ ।

Leave a comment