প্রবন্ধ গুচ্ছ – সুপ্রিয় রায়

প্রবন্ধ গুচ্ছ – সুপ্রিয় রায়

হেলসিঙ্কির মহামায়া


ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে মহামায়া দ্বারা সংগঠিত সার্বজনীন দুর্গাপূজা মহা ধুমধামের সাথে পালিত হলো ৮ ও ৯ ই অক্টোবর অর্থাৎ শনি ও রবিবার । এই পুজোর দুদিনের প্রতিটা মুহুর্তের সাক্ষী থাকতে পেরে খুব ভালো লাগছিল । প্রকৃত অর্থে এই পূজা ছিল সার্বজনীন । সমস্ত ধর্মের এক মিলন মেলা ।দর্শনার্থীদের মধ্যে হিন্দু ছাড়াও ছিল মুসলিম , ফিনিস ও রাশিয়ান ।এই আনন্দ অনুষ্ঠান সবাইকে দেখলাম নিজেদের মত করে ভাগ করে নিতে । উদক্তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন সময়ে বাংলা দেশ থেকে এদেশে এসে বসবাস করছেন । কেউ কেউ এদেশে পড়তে এসেছিলেন তারপর কাজের খাতিরে এখানেই রয়ে গেছেন । পাকিস্তান থেকে আসা এক হিন্দু পরিবারের সাথেও কাটালাম এই দুইদিন ।
ফাইবার গ্লাসের প্রতিমার মূর্তির সাথে এবছর কলকাতা থেকে এসেছে ঢাক । ঢাকের তালে কোমর দোলে । ঢাক না হলে পুজো জমে ? কিন্তু ঢাকী আনতে অনেক খরচ ।কুচ পরোয়া নেই । দেখলাম পশ্চিমবাংলা থেকে আগত তিন যুবক পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ময়দানে উপস্থিত । ঢাক , কাসর ঘন্টা আর তাশা নিয়ে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখল পূজা মন্ডপ । পূজা মন্ডপ মানে এখানকার ছোট বাচ্চাদের এক স্কুল বাড়ি । এখানকার বাড়িগুলো এমনভাবে তৈরী যে বাইরের কোনো আওয়াজ ভিতরে আসতে পারে না বা ভিতরের আওয়াজও বাইরে যেতে পারে না । বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন ভিতরের তাপমাত্রা সবসময় ২০ থেকে ২১ ডিগ্রীর এর মধ্যে । বাইরে থেকে শীতের পোশাক পরে ভিতরে ঢুকে সবাই চলে যাচ্ছে ড্রেসিং রুমে ।তারপর ড্রেসিং রুম থেকে বেড়চ্ছে বাঙালি হয়ে ।ছেলেদের গায়ে থাকছে পাঞ্জাবি আর মেয়েদের শাড়ি । মনে পরে যাচ্ছে সেই গানটা – “একদিন বাঙালি ছিলাম রে “। দুর্গাপূজার পুরোহিত পাওয়া বিদেশের মাটিতে খুবই কষ্টকর । ব্রাহ্মন ছাড়া পূজা করার রীতি যেহেতু এখনও নেই , তাই পুজোর সমন্ধ্যে ওয়াকিবহল ব্রাহ্মন পাওয়া এদেশে সত্যিই কঠিন ।কিন্তু তাও দেখলাম জোগার হয়ে গেল । কলকাতা থেকে এখানে চাকরি করতে আসা এক ঝকঝকে যুবক পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে বসে গেল । পাঁচ দিনের পূজা দুদিনের মধ্যেই করতে হবে । দুদিনে অনেকেই অঞ্জলি দিল । দেশের মতো এখানেও মাইকে হচ্ছিল অঞ্জলি পাঠ । অঞ্জলি দানে ফুল হিসাবে ছিল গোলাপের পাপড়ি । এই হেলসিঙ্কিতে জিলিপি ছাড়া অন্য কোনো মিষ্টি চোখে পরেনি । যেহেতু জিলিপির উত্স ইরান তাই এখানকার ইরানিয়ান দোকানে জিলিপি পাওয়া যায় । স্বাদ একটু আলাদা । আমার তাই খুব কৌতহল ছিল পূজার ভোগে কি মিষ্টি দেয় তা দেখার । কিন্তু দেখি পূজার ভোগে ফল ছাড়া রয়েছে খিচুরি ,পাঁচ মিশালি তরকারি, লুচি , বাঁধাকপির তরকারী ,আপেলের চাটনি , পায়েসের সাথে ছিল মালপোয়া,নারু,রসগোল্লা ,সন্দেশ ও পাটিসেপ্টা ।আমি অবাক । এত সব কোথায় পেল ?স্বভাবতই জানতে ইচ্ছা করলো । সব বানিয়েছে মহিলারা । সত্যিই দশভুজা । চাকরি করছে , সাজগোজ করছে আবার এত লোকের জন্য বাড়ির থেকে খাবার বানিয়ে আনছে । এখানে কাজের লোক , রান্নার ঠাকুর পাওয়া খুবই মুশকিল । সব কিছু নিজেদেরকেই করতে হয় । খাবার বানানোর ব্যাপারটা মহিলারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে । পূজা হয়ে যাওয়ার পর পুরো স্কুলবাড়িটাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে । কোথায় কিছু ফেলে আসলে বা নোংরা করে আসলে দিতে হবে ফাইন । পূজা মন্ডপে সবসময় দর্শনার্থীদের জন্য ছিল চা ও কফির ব্যবস্থা । এছাড়া সবার জন্য ছিল ভোগ । সন্ধ্যাবেলাও দেখেছি দর্শনার্থীদের প্রসাদ খেতে । কিন্তু কোথাও একটুও নোংরা হতে দেখিনি ।পরিস্কার রাখার দায়িত্ব যেন সকলের । সন্ধ্যাবেলা ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । অনেক বিদেশীদের দেখলাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতে । তিনজন বাঙালি মুসলিম যুবক একটার পর একটা সুন্দর গান পরিবেশন করে সবাইকে মাতিয়ে রাখলো । নিজেদের মধ্যেই কেউ করলো কবিতা আবৃত্তি , কেউ বা গান , কেউ নাচ -সুন্দর একটা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা দিল উপহার । এছাড়া ছিল ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ । কিন্তু একটাই ব্যাপার সময়টা ছিল নির্দিষ্ঠ । রাত্রি দশটা ।সবাই যে যার মতো ঘরে চলে গেল । মহিলাদের দেখলাম রাত্রি দশটার সময়ও গা ভর্তি সোনা পরে যেতে কোনো সংশয় ছিল না ।
পরের দিন তিথি অনুযায়ী অষ্টমী । সন্ধ্যাবেলা যখন দেশের সমস্ত মন্ডপে মন্ডপে ভীড় উপচে পরছিল তখন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কির পূজা মন্ডপে চলছিল সিন্দুর খেলা ।বাইরের তাপমাত্রা ছিল ৪ বা ৫ ডিগ্রী কিন্তু মন্ডপের ভিতরের উত্তাপ ক্রমশঃ বেড়েই চলছিল । ঢাকের তালে তালে মাতোয়ারা সবাই ।কেননা আবার একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে । তাই এবছরের দুর্গাপূজার শেষ আনন্দটুকু সবাই ভাগ করে নিতে চাইছিল । এবছরের এই দুদিনের দূর্গা পূজার আনন্দের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলছিল । সিন্দুর খেলার পর চলছিল মিষ্টিমুখ । হাতে বানানো রসগোল্লা ও পাটিসেপ্টা । খাওয়া দাওয়ার সাথে সাথে বিসর্জনের ঢাকের বাদ্যির সাথে চলছিল নাচ মাকে একবছরের জন্য বিদায় জানাতে ।নদী , লেকে বা সমুদ্রে নয় । মা দূর্গা তার পরিবার নিয়ে চলে যাবেন বাক্সের মধ্যে ।পরের বছর আবার সপরিবারে মাকে বাক্স থেকে বের করে বরণ করে নিয়ে আসা হবে মন্ডপে । তবে এবছরের মতো ফিনল্যান্ডে দুর্গাপূজা শেষ তা নয় ।আগামী ১৪ থেকে ১৬ ই অক্টোবর হেলসিঙ্কিতে আরেকটা দূর্গা পূজার আয়োজন করেছে ফিনবেন , আরেকটা বেঙ্গলি কমিটি ।তাদের এবার ১৮ তম বছর ।

হেলসিঙ্কির মহামায়া ২০১৭


দেশের মাটির আগমনীর সুর এখন প্রবাসের ঘরে ঘরে। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সাজ সাজ রব । সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে সবাই এই দুটো দিনের জন্য। সারা বছরের আনন্দ এই দুটো দিনে ভাগ করে নিতে চলে সারা বছর ধরে প্রস্তুতি। এই মিলন মেলার একটা বড় আকর্ষণ সাং স্কৃতিক সন্ধ্যা , যার প্রস্তুতি চলে অনেকদিন ধরে । বেশ কদিন ধরেই চলছে নাচ , গান, কবিতা ,নাটকের রিহার্সাল । এই রিহার্সাল রুমটা সবার কাছেই বড়ই আনন্দের । আড্ডার সাথে সাথে চলে রিহার্সাল । ব্যস্তময় জীবনের মধ্যে হটাৎ করে অতিরিক্ত পাওয়া যায় কিছু অক্সিজেন আর কদিন মাতৃভাষার স্বাদ গ্রহণ করা যায় অনেকক্ষণ ধরে । উচ্চারণগত ত্রুটি ভালই সংশোধন করা যায় এই রিহার্সাল রুমে । সদ্য যারা দেশ থেকে এসেছে তারাই দেখেছি বেশি জোর দেয় উচ্চারণের উপর।
দেশের মত ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতেও দুর্গা পুজার আয়োজন চলছে পুরাদমে । ফিনল্যান্ডের মহামায়া তাদের এবারের পুজার আয়োজন করেছে ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে ১লা অক্টোবর Nallitie 3,00940 , Helsinki তে ।অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ১০ টা থেকে । এই দুদিনের আনন্দমেলায় রয়েছে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার আমন্ত্রন। একসাথে সবাই মিলে পাতপেরে খাওয়ার মজাই এখানে আলাদা । সকাল থেকে রাত অবধি সবাই মিলে একসাথে পূজা মণ্ডবে নাচে , গানে আত্মহারা হয়ে থাকে । মাঝে মাঝে চলে প্রসাদ আর তার সাথে মিষ্টি অবশ্যই দেশীয় ধরনের । সবই বানায় এখানকার মহিলারা ।
এছাড়া ফিনবেন দ্বারা আয়োজিত হেলসিঙ্কির সবচেয়ে পুরানো পূজা এবারও অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ২৯ শে সেপ্টেম্বর থেকে ১লা অক্টোবর Asukastalo Kulkuri, Rastilanpolku 1, 00980 Helsinki (near Rastila metro station)। শুরু বিকেল ৫ ঘটিকায় । প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দেবী সপরিবারে আসবেন বাক্স বন্দী হয়ে । বাক্স উন্মোচন করে প্রতিষ্ঠা করা হবে মণ্ডবে আবার এখানকার বিজয়ার পর দেবী সপরিবারে যাবেন ঐ বাক্সের মধ্যে পরেরবার আগমনের জন্য। এখনে বেশিরভাগ প্রতিমাই ফাইবার গ্লাসের ।ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা পরা শুরু হচ্ছে ফিনল্যান্ডে , পুজার সময় রাত্রের তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডতো হবেই । কিন্তু মণ্ডবের ভিতরে সব সময়ই থাকে নরমাল তাপমাত্রা । সবাই থাকে দেশীয় পোশাকে। মনে পরে যায় গানের সেই লাইন – ‘একদিন বাঙ্গালি ছিলাম রে’।


হারাতে চাই না আমার মাতৃভাষাকে


আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি বেশিরভাগ মানুষই তার মাতৃভাষাকে ভালবাসে এবং চায় না তার প্রিয় মাতৃভাষাকে হারিয়ে যেতে দিতে । অনেক ভাষা এখন শুধু ইতিহাস । পালি ভাষাকে আমরা দেখতে পাই শুধু জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থে । আর সংস্কৃত ভাষার প্রচলন পাওয়া যায় কেবলমাত্র হিন্দুদের মন্ত্র উচ্চারণে । প্রাচীন বৈদিক ভাষাতে যে কাব্য়গ্রন্থ বা ধর্মগ্রন্থ লেখা হয়েছিল তার ভাষা যখন বেশিরভাগ মানুষের কাছেই দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল তখন সৃষ্টি হয়েছিল সংস্কৃত ভাষার , প্রাকৃত ভাষাকে নানাভাবে সংস্কার করে । অথচ আজ সে ভাষা কথ্য় ভাষা নয় । একটা ভাষাকে সংস্কার করে বা সহজ করে সর্বজনগ্রাহ্য় করে তোলাই তো সংস্কৃতি , হারিয়ে দেওয়া তো সংস্কৃতি নয় ।
নিজের মাতৃভাষা ছেড়ে নিজেদের মধ্যে মুসলিম রাজত্বকালে উর্দু ভাষায় এবং ইংরেজদের রাজত্বকালে ইংরাজি ভাষায় কথা বলাকে অনেকে অভিজ্যাতের ব্যাপার বলে মনে করত । যেমন আজও দেখা যায় অনেকেই নিজের মাতৃভাষা ছেড়ে ইংলিশ বা হিন্দিতে কথা বলতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে । যদিও আমরা সবাই জানি অন্য যেকোন ভাষার থেকে মাতৃভাষা শিখতে অনেক কম সময় লাগে যদি ইচ্ছা থাকে । নিজেদের প্রয়োজনে অন্য ভাষা নিশ্চই শিখতে হবে তাই বলে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করলে পারতপক্ষে আমার মাতৃভাষাকে হারিয়ে যেতে আমি সাহায্য করছি না কি ?
আমার মাতৃভাষা বাংলা । আমিও ভালবাসি আমার মাতৃভাষাকে । এটা ভাবতে কষ্ট হয় যে কোনোদিন আমার মাতৃভাষাও হারিয়ে যেতে পারে । কত মানুষের রক্তের ও আন্দোলনের বিনিময়ে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা পৃথিবীতে তার অধিকার অর্জন করেছে । বাংলা ভাষাকে যারা ভালবাসে তারা সবাই আন্তরিক ভাবে স্বরণ করবে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ ) ভাষা আন্দোলনের সেই দিনটিকে যাকে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছিল । তাই ২১শে ফেব্রুয়ারী ভাষা দিবস হিসাবে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করা হয় । আমরা গেয়ে উঠি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী , আমি কি ভুলিতে পারি “।

স্মৃতির পাতা থেকে:- ১


তখন আমি দিল্লীতে ব্যাঙ্কের একটা শাখায় কর্মরত । আমার সাথে আমার থেকে কিছুটা বয়সে বড় এক পান্জাবি ভদ্রলোক ঐ শাখাতে আমার সহকর্মী ছিলেন । দারুন জলি । সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে খুব মজা করতো। তখন ব্যাঙ্কে কম্পিউটার আসেনি , সবকিছুই হাতে কলমে করতে হয় । ওনি সেভিংস ও কারেন্ট একাউন্টের ইনচার্জ ছিলেন । withdrawal allow করার সময় ব্যাঙ্কের কর্মীরা সবাই specimen card দেখে স্বাক্ষর মিলিয়ে নিত । কিন্তু ওর কাজের ধরন ছিল কিছুটা আলাদা । ঐ সময় ওর যা মাইনে ছিল তত অবধি withdrawal এর স্বাক্ষর ও specimen card দেখে মেলাতো না । এমনিই allow করে দিত । আমরা অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু কে শোনে কার কথা । সাধারণত বেশ কিছুদিন কাজ করলে গ্রাহকদের অনেকের মূখ ও স্বাক্ষর চেনা হয়ে যায় । ভালই চলছিল । বাধ সাধলো এক দিনের ঘটনা । কম টাকার একটা withdrawal allow করার সময় ও ওই গ্রাহককে কাছে ডাকলো । ওকে বলতে শুনলাম “ কি ব্যপার , প্রতিদিন withdrawal এ স্বাক্ষর করো , আজ হঠাৎ টিপসই কেন ?”
যে ছেলেটা ওর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে একটা ছেলেকে দেখিয়ে বললো “ এটা আমার এই ভাইয়ের খাতা । ও স্বাক্ষর করতে জানেনা , তাই আমিই স্বাক্ষর করে টাকা তুলতাম। আজ ও আমার সাথে এসেছে তাই আমি স্বাক্ষর করিনি ও টিপসই দিয়েছে”। আমার সাহকর্মী বন্ধুটি বুঝতে পারলো এতদিন কি ভুল করেছে । আর কি করা যাবে । ledger দেখে আগের যত withdrawal ছিল সব বের করা হলো । তারপর সব withdrawal এ এক এক করে যার খাতা তাকে দিয়ে টিপসই লাগানো হলো । ভাগ্য ভাল পকেট থেকে টাকা যায়নি । আমরাও সুযোগ পেয়ে গেলাম পিছনে লাগার । চললো কিছুক্ষন । খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি পেয়ে তবে সবাই থামলাম । ভালই শিক্ষা হলো । আর নয় , এবার নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করার অঙ্গিকার করলো ।

স্মৃতির পাতা থেকে:- ২


ভূমিকম্পে আমরা
সালটা ছিল ২০১১ আর তারিখ ছিল ১৮ ই সেপ্টেম্বর । সন্ধ্যাবেলা আমরা সবাই জড় হয়েছিলাম শিলিগুরির বিঁধান মার্কেটের কাছে একটা হোটেল । অল্পবয়সী একদল ছেলে মেয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে পরেরদিন আমাদের অফিসে যোগদান করতে ।তাই আমরা এসেছি ওদের সাথে পরিচিত হতে এবং আমাদের অফিস সমন্ধে ওদের কিছুটা পরিচিত করাতে ।ভালই সময় কাটছিল । হটাৎই সবার কানে আসলো ঝনঝন আওয়াজ আর একটানা গোঁ গোঁ আওয়াজ ।সবাই বেড়িয়ে আসলাম রাস্তায় । কিছু বোঝার আগে দেখলাম সামনের বাড়িগুলো দুলছে । প্রবল ঝড়ে যেমন নারকেলগাছ বা তালগাছ দোলে সেরকম দোল খাচ্ছে সামনের বাড়িগুলো । একটানা ঝনঝন ও গোঁ গোঁ আওয়াজ হয়ে চলেছে । রাস্তাটা মনে হচ্ছে সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলছে । চারপাশে মানুষজনের কানফাটা চীৎকার । বুঝতে পারছি প্রবল ভুমিকম্প শুরু হয়েছে ।মনে হচ্ছে পৃথিবী বোধহয় ধ্বংস হতে চলেছে । এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম । সম্বিৎ ফিরতেই মনে পড়ল ঘরে স্ত্রী একা । দুই ছেলেই তখন বাইরে । হটাৎ চারিদিকের সব আলো নিভে গেল । অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ছুটে চললাম বাড়ির দিকে । বাড়ি যাওয়ার আগেই সব শান্ত হয়ে গেল । বাড়ি পৌছাতেই দেখি পাড়ার সবাই রাস্তায় এসে জড় হয়েছে । আমাকে দেখে আমার স্ত্রী এগিয়ে আসলো । তখনও দেখি ওর চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন । ঘরে বসে বই পড়ছিল হটাৎ দেখে সামনের সব কিছু নড়ছে । মাথার উপর পাখাটা রীতিমতো দোল খাচ্ছে । যে বিছানায় বসে ছিল সেটা নড়ছে । তাড়াতাড়ি চাবি নিয়ে কোনরকমে দরজা বন্ধ করে বাইরে বেড়িয়ে এসেছে । তিনতলা থেকে একতলায় কি করে যে ও নেমেছে সেটা ভাবতেই ওর গায়ে জ্বর এসে যাচ্ছে । উপর থেকে নামবে কি সিঁড়িগুলো সব দোল খাচ্ছে । নৌকার মতো নাগরদোলা যেমন দোলে তেমনি দুলছিল সিঁড়িগুলো । ভুমিকম্পের পরে কেউ আর বাড়ি ঢুকছে না । আমরাও রাস্তায় ঘুরতে লাগলাম । দেখি আমাদের পাড়ার একটা বাড়ি তার পাশের বাড়ির প্রায় উপর হেলে পড়েছে । সবাই একে একে যে যার বাড়িতে ফিরতে লাগলো । আমরাও ফিরলাম । আবার আলো জ্বলে উঠল পাড়ায় পাড়ায় । টিভি খুলে জানতে পাড়লাম “ ভারতীয় স্থানীয় সময় অনুযায়ী সন্ধ্যে ৬ টা ১০ মিনিটে ৬.৯ (Mw) তীব্রতাসহ নেপাল সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চল ও ভারতের সিকিম রাজ্যে অনুভুত হয় যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা সংরক্ষণ অঞ্চল । ভূমিকম্পের প্রভাব উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ তিব্বত জুড়ে অনুভূত হয়েছিল।এই ভূ-প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কমপক্ষে ১১১ জন নিহত হওয়ার কথা জানা যায়৷ সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির খবর পাওয়া যায় সিকিম থেকে এবং পূর্ব সিকিমের সিংতাম জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ সিকিমের প্রধান শহর গ্যাংটক্ -এর অনেক বহুতল ভেঙে পরে৷ নেপালে সর্বমোট ৬ জন নিহত হওয়ার কথা জানা যায় যার মধ্যে তিনজন কাঠমান্ডুর ব্রিটিশ এমব্যাসির ভেঙে পড়া দেওয়ালে পিষ্ট হয়ে মারা যান৷ বাংলাদেশ, ভুটান এবং তিব্বত জুড়ে প্রাণহানি, ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি ও সম্পত্তি নাশের কথা জানা গেছে; উত্তরাঞ্চলেও সাতজনের প্রাণহানির কথা জানা যায়।”
এর পর অনেকদিন আমরা সমস্ত দরকারি নথি , সার্টিফিকেট ও চাবি সাথে নিয়ে ঘুমাতাম ।


সাদা না কালো , কোনটা ভালো


আমাদের শরীরের উপর থেকে চামড়াটা ছাড়িয়ে নিলে তার ভিতরের রঙটা সবারই মনে হয় এক । ছাল ছাড়ান অবস্থায় সমস্ত মুরগীর রঙ যেমন একই লাগে । উপরের চামড়াটার জন্যই তো যত ঝামেলা – পরিচয় হয় ফর্সা না কালো , সাদা চামড়া না কালো চামড়া । অথচ আমরা কি জানি যে আমাদের আদিম মানুষের রঙ কি ছিল বা কি কারণে আমাদের চামড়ার রঙ সাদা বা কালো । গবেষকদের মত অনুযায়ী প্রায় ২০০,০০০ বৎসর আগে আমাদের আদিম মানুষের রঙ ছিল কালো এবং তারা থাকতো বিষুব রেখার কাছকাছি যেখানে আলটা ভাইওলেত রশ্মির বিকিরণ বেশি বা বলা যায় যেখানে সূর্যের কিরন বেশি । মানুষ যখন নিজেদের প্রয়োজনে বিষুব রেখার থেকে দূরে গিয়ে থাকতে লাগলো , তখন তাদের শরীরে আলটা ভাইওলেত রশ্মি কম লাগতে লাগলো কারন সেখানে সূর্যের কিরন কম । অনেক বৎসর লাগলো ঠিকই কিন্তু মানুষের চামড়ার রঙ ধীরে ধীরে কালো থেকে সাদা হতে লাগলো । গবেষকদের মত অনুযায়ী সময় লাগলো প্রায় ৫০,০০০ বৎসর । তারপর বংশানুক্রমে চলে আসছে সাদা আর কালো চামড়া । কিন্তু এখনও চলছে পরিবর্তনের ধারা । গবেষকদের মত অনুযায়ী লাগছে প্রায় ১০০ টি প্রজন্ম । যে প্রধান পদার্থের উপর চামড়ার রঙ নির্ভর করে তার নাম মেলানিন (Melanin)। আমাদের চুলের রঙও এই পদার্থের উপরই নির্ভর করে । চুলের রঙ সাদা হলে তাকে আমরা কালো করি আবার শরীরের রঙ কালো হলে তাকে সাদা করার আপ্রান চেষ্টা করি । কিন্তু আমরা কি জানি Dark skin reduces the incidence of skin cancer and sunburn । আমাদের একসময়ের শাসক অর্থাৎ ইংরেজদের রঙ সাদা চামড়া ছিল বলেই কি আমাদের বেশিরভাগ সাদা চামড়ার প্রতি আকৃষ্ট ! তাই কি এখনও বিজ্ঞাপনে দেখতে পাওয়া যায় –“ফর্সা পাত্রী চাই “।
সাদা চামড়া বা কালো চামড়ার বদলে আমাদের বলা উচিৎ হালকা বা ঘন চামড়া । হালকা চামড়ার রঙ হয় নীল -সাদা । তার নীচ দিয়ে শিরার মধ্য দিয়ে লোহিত কণিকা প্রবাহিত হয় বলে চামড়ার রঙ লালচে লাগে । যেটা রেগে গেলে ভালো বোঝা যায় । মুখমণ্ডল হয়ে ওঠে রক্তবর্ণ । হালকা চামড়ার মানুষদের দেখতে পাওয়া যায় সমুদ্রের ধারে রৌদ্রের মধ্যে শুয়ে থাকতে কারন তাদের দরকার সূর্যের থেকে ভিটামিন ডি । শরীরে ক্যালসিয়াম গ্রহন করতে এই ভিটামিন ডি দারুনভাবে সাহায্য করে ।
হালকা চামড়ার মানুষ বেশি দেখা যায় ইউরোপ, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া , সুমেরু অঞ্চল ও আমেরিকাতে । আর ঘন চামড়ার মানুষ বেশি দেখা যায় গ্রীষ্ম প্রধান আফ্রিকা , ভারতবর্ষের দক্ষিণ অংশ , ইন্দোনেশিয়া , মেলানেসিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে । মোটামুটি বলা যায় যারা অনেকদিন ধরে বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকে তাদের চামড়ার রঙ হয় ঘন আর যারা উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অনেকদিন ধরে থাকে তাদের চামড়ার রঙ হয় হালকা ।


তিল মানুষের শরীরে কেন হয়? এর উপকারিতা বা অপকারিতা কি ?


যে কোন মানুষের শরীরেই তিল হতে পারে । কারও হয় জন্মগত , আবার কারও পরেও হতে দেখা যায় । চামড়ার রঙ সাদা বা কালো কেন হয় , সেটা আমার আগের একটা লেখাতে পরিষ্কারভাবে লিখেছি যে, যে প্রধান পদার্থের উপর চামড়ার রঙ নির্ভর করে তার নাম মেলানিন (Melanin)। আমাদের চুলের রঙও এই পদার্থের উপরই নির্ভর করে । এই মেলানিন হল এক ধরনের কালচে – বাদামী রঙের রঞ্জক কণা যেটা হয় মেলানোব্লাসট কোষের ভিতরে । এরা আমাদের চামড়ার নিচে থাকে । কোন কারণে চামড়ার নিচের কোন জায়গায় এই মেলানিন কণা যদি একসাথে জমা হয় তাহলে সেখানে কালো বা বাদামী ফুটকি তৈরি হয় । আর সেটাকেই বলা হয় তিল ।
শরীরের যে কোন জায়গায়ই শারীরিক কারণে তিল হতে পারে। তার মানে এই নয় যে , যার হাতে তিল আছে তার খুব টাকা হবে , যার পায়ে তিল আছে তার খুব বেড়ানো হবে বা যার পেটে তিল আছে সে খুব ভাগ্যবান হবে – এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই । কাকতালীয় ভাবে কারও কারও মিলে যেতে পারে। সবার ক্ষেত্রে কোনমতেই হওয়া সম্ভব না । শুধু একটাই খেয়াল রাখতে হবে যে তিল ক্রমাগত বড় হতে থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ । এছাড়া তিল কোন ক্ষতি করে না ।

শব্দের প্রহার


২২/০২/২০১৭ শতাব্দী এক্সপ্রেসে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা আসছিলাম । ঠিক ভোর সাড়ে পাঁচটায় এন জি পি স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল । আমাদের পিছনেই বসেছিল দক্ষিণের এক পরিবার । ৩-৪ বছরের একটা ছোট বাচ্চা ছিল ওই পরিবারের সাথে । ট্রেনের গতির সাথে সাথে বাড়তে লাগলো বাচ্চাটির কণ্ঠস্বর । এক ওনাদের ভাষা বুঝিনা, তার উপর ছিল সুরের খুব তারতম্য , তাই হয়ত কানে খুব লাগছিল।পরিবারের সন্মিলিত চেষ্টায় মাঝে মাঝে ছিল একটু বিরতি । হঠাৎ কানে ভেসে আসলো পিয়ুসকান্তি সরকারের এক বিখ্যাত গান –‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে ……’। কেউ তার মোবাইল থেকে গানটা চালিয়েছে । খারাপ লাগছিল না । বাচ্চাটার শব্দের কম্পাঙ্ক তাই কিছুটা কম লাগছিল। কিন্তু আরেকজন হাতে তুলে নিল মোবাইল আর শুরু করলো তার আন্তরিক কথোপকথন । এমনই আন্তরিক যে কামরার সবাই শুনতে পারছিল । জানলাগুলো খুলতে পারলে ভাল হতো ।মনে হচ্ছিল পাশাপাশি অনেককটা গ্রুপ পিকনিক করছে।শব্দের জ্বলন । আওয়াজ তৈরি করার সময় অন্যদের কথা একটু মাথায় রাখলেই হয় । তা না । বুঝতে পারলাম ইয়ার ফোনের কি দারুন উপকারিতা আর ঠারে ঠারে উপলব্ধি করলাম শব্দের প্রহার ।

শব্দ চুরি


শব্দ দূষণ অনেকদিন থেকেই আমাদের সমাজের একটা বড় অঙ্গ ।আমাদের প্রতেকেরই প্রায় গা সওয়া হয়ে গেছে । এখানে সাম্যবাদ । জোরে চিত্কার করা বা করানো আমাদের সবারই মজ্জাগত অধিকার । আমরা বেশিরভাগ মানুষই আমাদের কথা বা আমাদের পছন্দের জিনিস নিজেদের থেকে অন্যদের শোনাতে বেশি ভালবাসি । তাই বোধহয় স্বভাবতই আওয়াজটা জোরে হয়ে যায় । এতে অন্যদের কি কি অসুবিধা হতে পারে সেটা চিন্তা করতে আমাদের বয়েই গেছে । এর সপক্ষে অনেকে অনেক যুক্তি বলতে দ্বিধা করবেনা জানি । কিন্তু খুব ভালো করে উপলব্ধি করলাম বেশ কদিন দেশের বাইরে থাকার ফলে । আরো উপলব্ধি করলাম যখন জানলাম বিদেশে থাকাকালীন আমার বাড়িতে ঘটে যাওয়া চুরির ঘটনায় । কলকাতায় আমাদের একটা বাড়ি আছে যেটা G+3 এবং প্রতিটা ফ্লোর এক এক ভাইয়ের । আমারটা চার তলা । বাইরের কেউ নেই , তাই বাড়ির নাম ‘ROYS’ । মহালয়ার দিন যখন সবাই ঘুম ঘুম চোখে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডিপাঠ শুনতে বা শোনাতে ব্যস্ত তখন সন্তর্পনে আমার বাড়িতে ঘটে চলেছে অমাবস্যার অসুরীয় কার্যকলাপ ।বোধহয় তখনও দেবীপক্ষ শুরু হয়নি । যখন গাক গাক করে চন্ডিপাঠ চলছে পারায় মাইকে আর উচ্চস্বরে ঘরে ঘরে , তখন অসুরীয় আত্মাদের মহালয় ঘটছে আমার ঘরে । গ্রিলের তালা এবং দরজার তালা ভাঙার আওয়াজ মিলেয়ে যাচ্ছে শব্দ দুষণে । তাই আমার কাছে এটা শব্দ চুরি ।

রাস্তার নামকরণ


আমরা সবাই জানি যে কলকাতা শহরের দক্ষিণে গড়িয়া একটি প্রাচীন জনবহুল এলাকা । উত্তরে যাদবপুর , পূর্বে সন্তোষপুর , দক্ষিণে নরেন্দ্রপুর আর পশ্চিমে টালিগঞ্জের মধ্যখানের এলাকার নাম গড়িয়া । বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অনেক মানুষের বসবাস । গড়িয়াকে দুইভাগে বিভক্ত করেছে গড়িয়ার খাল বা টালিনালা । টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়ার দিকে আসতে খালের ডানদিকে যে বিশাল জনবসতি তার নাম কামডহরি ।এখানে সব বাড়ির আলাদা আলাদা নম্বর আছে ঠিকই কিন্তু কোন রাস্তার কোন নাম নেই , যদিও এই অঞ্চল ম্যুনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের মধ্যে অনেকদিন থেকেই আছে । বিস্তীর্ণ গড়িয়া অঞ্চলে প্রধান পাঁচটি রাস্তা আছে সেগুলি হল – ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস , নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড , রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক রোড , গড়িয়া মেন রোড , গড়িয়া স্টেশন রোড । এছাড়া আছে অগন্তি রাস্তা বা গলি যার কোন নাম নেই । ভাবতে অবাক লাগে এতদিন ধরে কেন কেউ এর উদ্যোগ নেয়নি । একদম কম খরচে বিশাল এলাকার ভৌগলিক উন্নয়ন করতে কারও ইচ্ছা কেন হলনা তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না । জানি অনেকসময় রাস্তার নাম নিয়ে অনেকেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে । কিন্তু এই কামডহরি অঞ্চলে প্রতিটা বাড়ির নম্বর শুরু বর্ণমালা দিয়ে । যেমন এস -১৫ । যেখানে এস দিয়ে বাড়ির নম্বর সেখানকার রাস্তার নাম যদি ‘এস রোড’ হয় এবং যেখানে আর দিয়ে বাড়ির নম্বর সেখানকার রাস্তার নাম যদি ‘আর রোড’ হয় তাহলে তো আর বিতর্কের অবকাশ থাকে না ।রাস্তার নাম না থাকাতে ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনেক অসুবিধার সন্মুখিন হতে হচ্ছে । বিভিন্ন জন তাদের ইচ্ছা মত এলাকার রাস্তার নাম দিয়ে দিচ্ছে ।Ola আর Uber এর ক্ষেত্রে এটা খুব হচ্ছে । তাই আপনাদের মাধ্যমে অনেক লোকের মধ্যে এটা ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছি যদি এর কোন সুরহা হয় । তবে যতদূর আমার মনে হয় কাজটা কর্পোরেশনের । অপেক্ষায় থাকলাম ।

ভোট


আমাদের দেশে ভোটের রাজনীতি এমন একটা জায়গায় চলে গেছে যে সকাল বেলায় উৎসাহ নিয়ে খবরের কাগজ খুললেই প্রথম পাতায়ই দেখা যায় একদল , আরেকদলকে ব্যাক্তিগত আক্রমণ করছে । সেখানে নেই কোন রাজনৈতিক সমালোচনা । বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ হচ্ছে নিহত বা আহত । । কারণ তাদের অভাব বেশী । নেতাদের তুষ্ট করতে প্রানের বাজি রাখতেও তারা পিছপা হচ্ছে না । ফল সরূপ সর্বস্তরেই দেখা যাচ্ছে ভোটকে লক্ষ্য রেখে হানাহানি। যেনতেন প্রকারে দলের ভোট বৃদ্ধিটাই লক্ষ্য । তাই এক দল , আরেক দলকে নানা কৌশলে বিরত রাখছে ভোটদান থেকে । ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারছে না । অনেক সময় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথেই ভোটাররা হচ্ছে আক্রান্ত ।
তাই আমার মনে হয় যদি ভোট দিতে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে না হয় , ভোটকেন্দ্র আসে ভোটারের কাছে ভোট নিতে – তাহলে কেমন হয় ?
যেমন বাঙ্কিং সেক্টরের কথাই ধরা যাক । আজকাল বেশিরভাগ মানুষকে টাকা পয়সার লেনদেনের জন্য আর বাঙ্কে যেতে হয় না । আছে ATM নয়তো ONLINE । যারা লেখাপড়া জানেনা তাদের জন্য আছে bio metric ATM । এমনকি অনেক অফিসেই কম্পিউটার খুলতে গেলে লাগে bio metric device । যাতে হাতের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে প্রমাণ করা যায় সঠিক ব্যাক্তিকে । সঠিক লোক ভোট দিতে পারছে কিনা সেটাই শুধু দেখার । laptop/EVM এর সাথে bio metric device যোগ করে যেকোন জায়গা থেকেই ভোট দেওয়া নিশ্চয় খুব একটা অসুবিধাজনক হবে না । মোবাইল ভ্যান , রাজনৈতিক এজেন্ট ও পুলিশ নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরবে । এতে বয়স্ক , শারীরিক প্রতিবন্দি ও মহিলাদের ভোট দেওয়া অনেক সহজ হবে । যারা প্রথম প্রথম এমনি ভাবে ভোট দিতে পারবে না তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে ।সব ভোটারের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে যদি bio metric device এর মাধ্যমে ভোটারকে সনাক্ত করা যায় তাহলে আর ছাপ্পা বা ফলস ভোটের সুযোগ থাকবে না ।
রাজনৈতিক দলগুলি কি এটা চাইবে ?

ব্যাংকের এল পি জি


আমাদের দেশে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন হয়েছে ব্যবসা করার জন্য। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে কলিকাতা এবং বোম্বায়ের ইংলিশ এজেন্সী হাউস ,ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যাংকার হিসাবে কাজ করার মনস্থ করলো ।১৭৭০ সালে তৈরী হলো হিন্দুস্থান ব্যাংক কিন্তু বেশ কয়েক বছর চলার পর ১৮৩২ সালের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য় হলো । ১৭৮৬ সালে এল জেনেরেল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, ১৭৯১ তে দেউলিয়া হলো । ১৮০৬ সালের জুন মাসে আবির্ভাব ঘটলো ব্যাংক অফ কলিকাতার , পরে ১৮০৯ সালে তার নুতন নাম হলো ব্যাংক অফ বেঙ্গল । এর সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আরো দুটো প্রেসিডেন্সী ব্যাংক তৈরী করলো – ব্যাংক অফ বোম্বে- ১৮৪০ সালে আর ব্যাংক অফ মাড্রাস্- ১৮৪৩ সালে । তখনকার সময়ে সমস্ত সরকারি কাজকর্ম হতো এই তিনটি স্বশাসিত প্রেসিডেন্সী ব্যাংক দ্বারা হতো । ১৯২১ সালে এই তিনটি ব্যাংক একত্রিত হয়ে তৈরী হলো ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া যার ১৯৫৫ তে নামকরণ হলো স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ।১৯৩৫ সালে রিজার্ভ ব্যাংক তৈরী হওয়ার আগে এই ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্কই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক । ইম্পেরিয়াল ব্যাংক ছিল ব্যক্তিগত মালিকনাধীন । বেশিরভাগ শেয়ার ছিল ইউরোপিয়ানদের হাতে । যেহেতু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রধানত কলিকাতা বন্দর দিয়েই বেশি হতো তাই ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কলিকাতাতে ১৮৩৯ সালে ইউনিয়ন ব্যাংক স্থাপন করলো । কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ১৮৪৮ সালে তা বন্ধ হয়ে গেল । ১৮৫৮ সালে শুরু হলো ব্রিটিশ শাসন । পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলো আমাদের মাতৃভূমি । ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অবধি দীর্ঘ সময় অনেক ব্যাংক আবির্ভূত হলো আবার অনেক ব্যাংক পাততারিও গুটিয়ে ফেললো । যেসব ব্যাংক টিকে থাকলো এবং পরবর্তীতে জাতীয়করণ হলো সেইসব সরকারি বা পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলির জন্মতারিখ নিচে দেওয়া হলো ।
ব্যাংকগুলির নাম জন্মতারিখ এবং জাতীয়করণের বছর
এলাহাবাদ ব্যাংক ২৪ এপ্রিল ১৮৬৫, জাতীয়করণ ১৯৬৯
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ১৯ মে ১৮৯৪, জাতীয়করণ ১৯৮০
ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৬ , জাতীয়করণ ১৯৮০
কর্পোরেশন ব্যাংক
১২ মার্চ ১৯০৬, জাতীয়করণ ১৯৬৯
কানাড়া ব্যাংক
১ জুলাই ১৯০৬, জাতীয়করণ ১৯৬৯
ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক ১৫ অগাস্ট ১৯০৭ , জাতীয়করণ ১৯৮০
ব্যাংক অফ বরোদা ২০ জুলাই ১৯০৮ , জাতীয়করণ ১৯৮০
পাঞ্জাব ও সিন্ধ ব্যাংক ২৪ জুন ১৯০৮ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২১ডিসেম্বর১৯১১ (প্রথম স্বদেশী ব্যাংক ), জাতীয়করণ ১৯৬৯
ইউনিয়ন ব্যাংক ১১ নভেম্বর ১৯১৯, জাতীয়করণ ১৯৮০
অন্ধ্র ব্যাংক ২০ নভেম্বর ১৯২৩, জাতীয়করণ ১৯৬৯
সিন্ডিকেট ব্যাংক ১৯২৫ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
বিজয়া ব্যাংক ২৩ অক্টোবর ১৯৩১ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
ব্যাংক মহারাষ্ট্র ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ , জাতীয়করণ
১৯৮০
ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৭ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
দেনা ব্যাংক ২৬ মে ১৯৩৮ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৪৩ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
ইউকো ব্যাংক ৬ জানুয়ারী ১৯৪৩ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ১৯৫০ , জাতীয়করণ ১৯৬৯
আইডিবিআই ব্যাঙ্ক জুলাই ১৯৬৪, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি
ভারতীয় মহিলা ব্যাংক ১৯ নভেম্বর ২০১৩ , ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
২ জুন ১৮০৬,সরকারীকরণ ২ জুন ১৯৫৬
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাতিয়ালা ১৭ নভেম্বর ১৯১৭, সরকারীকরণ ১৯ জুলাই ১৯৫৯
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ মহীশূর ২ অক্টোবর ১৯১৩ , সরকারীকরণ ১৯ জুলাই ১৯৫৯
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ত্রিবাঙ্কুর ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫, সরকারীকরণ ১৯ জুলাই ১৯৫৯
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ বিকানের জয়পুর ১৯৬৩ তে সংযুক্তিকরণ (স্টেট ব্যাঙ্ক অফ বিকানের ১৯৪৪ ও স্টেট ব্যাঙ্ক অফ জয়পুর ১৯৪৩ ), সরকারীকরণ ১৯ জুলাই ১৯৫৯
স্টেট ব্যাংক অফ হায়দ্রাবাদ ৮ অগাস্ট ১৯৪১, সরকারীকরণ ১৯ জুলাই ১৯৫৯
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ সৌরাষ্ট্র ১৯০২ (১৩ আগস্ট ২০০৮ এসবিআই সঙ্গে মার্জ হয় )
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্দোর ১৯২০(১৫ জুলাই ২০১০ , এসবিআই সঙ্গে মার্জ হয় )
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ১ এপ্রিল ১৯৩৫ ,জাতীয়করণ ১৯৪৯
ব্যাংক তৈরী হওয়ার সময় থেকে জাতীয়করণ অবধি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে অনেক ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল । বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যাংক শিল্পের ওপর আসলো আঘাত । মজবুত ভিতের অভাবে আসলো অর্থনৈতিক সংকট । ব্যক্তিগত মালিকাধীন ব্যাংক তার দায় নিতে চাইছিলনা । আমানতকারীরা তাদের আমানত পুরোপুরি ফেরত পেলনা । ১৯১৩ থেকে ১৯৪৮ সাল অবধি আনুমানিক ১১০০ মত ব্যাংক তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য় হয়েছিল । শুধু ভারতবর্ষে নয় বিদেশেও ১৯৩০ সালের প্রথম দশ মাসে প্রায় ৭৪৪ টা ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেছিল এবং ১৯৩৩ সালে সারা বছরে প্রায় ৪০০০ এর বেশি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেছিল সারা বিশ্বে । সমস্ত ব্যাংক ছিল ব্যক্তিগত মালিকাধীন । বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজকর্ম ঠিক মতো চলার জন্য তদানীন্তন ভারত সরকার ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্ট ১৯৪৯ হাজির করলো । পরে এর নাম পরিবর্তন করে করা হলো ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৪৯ । এর দ্বারা রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে ব্যাংকগুলো রক্ষনাবেক্ষণ করার প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া হলো । ব্যাংক শিল্প জাতীয়করণ হওয়ার আগে পর্যন্ত দেশের মানুষের ব্যাংকের প্রতি আস্থা ছিল কম । পোস্ট অফিসে অতিরিক্ত সঞ্চয় জমা করার প্রবনতা ছিল বেশি । তার ফলে ব্যাংক শিল্পে সেভিংসের বৃদ্ধির হার ছিল খুবই কম । স্টেট ব্যাংক এবং তার সহযোগী ব্যাংক ছাড়া প্রায় সমস্ত ব্যাংক ছিল ব্যক্তিগত মালিকনাধীন । বেশির ভাগই ছিল বড় বড় শিল্পপতিদের । সাধরণ মানুষের জমানো টাকা ভোগ করত তারাই বেশি । তাদের মূল লক্ষই ছিল লাভ । তার ফলে শহর অঞ্চলের বাইরে স্টেট ব্যাংক এবং তার সহযোগী ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংকের পরিসেবা পাওয়াই যেত না । উচ্চ বিত্তের লোকেরাই ব্যাংকের সুবিধা ভোগ করতে পারতো । গ্রামের অর্থনীতির প্রসারে বা যে কোনো শিল্পের অগ্রগতিতে সাধরণ মানুষ ব্যাংককে কখনই পাশে পেত না । সুদখোর মহাজনদের কাছ থকে সাধারণ মানুষকে বেশি সুদে টাকা ধার করতে হত । স্বাধীনতার পরেও দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের গতি ছিল মন্থর । দেশের বেশিরভাগ মানুষের উপার্জন ছিল দ্রারিদ্র সীমার নিচে । দেশীয় অর্থনীতির সুবিধা ভোগ করত মুষ্টিমেয় মানুষ । দেশের অর্থনীতির উন্নতিতে ব্যাংক শিল্পের অবদান অপরিহার্য । তাই দেশের অর্থনীতির উন্নতি সাধনে ১৯৬৯ সালে ১৪ টা ব্যাংককে জাতীয়করণ করা হয় এবং আরো ছটা ব্যাংককে জাতীয়করণ করা হয় ১৯৮০ সালে । এর ফল সরূপ সরকারি ব্যাংকের শাখা প্রায় ৮০০% বৃদ্ধি পেল আর ব্যবসা বৃদ্ধি পেল ১১০০% । আজ সমস্ত পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের শাখা ৮৬০০০ এর ওপর আর এটিএম আছে সমগ্র দেশে ১৪২০০০ এর ওপর । সাধরণ মানুষ ভরসা করতে আরম্ভ করলো সরকারি মানে পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলোকে ।পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের লক্ষ্য আর শুধুমাত্র লাভ রইলো না , আসলো সামাজিক দায়িত্ব ।সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কগুলো সরকারী নির্দেশ অনুসারে শুরু করলো :
• মোট ঋণের ১৮% কৃষি খাতে প্রদান করতে
• মোট ঋণের ৪০% প্রায়োরিটি সেক্টরকে (ছোট ,মাঝারি কল-কারখানা ,ছোট ব্যবসা , সমস্ত রকম কৃষি ঋণ, এক্সপোর্ট -ইম্পোর্ট , শিক্ষা- ঋণ, গৃহ – ঋণ ইত্যাদিকে প্রদান করতে
• ক্লাস ব্যাংকিং থেকে মাস ব্যাংকিং । কম টাকাতে ব্যাংকে খাতা খোলার সুযোগ
• অবসরকালীন ভাতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান
• বিভিন্ন সরকারী ভাতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান
• কম সুদে সরকারী ঋণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান
• দারিদ্র সীমার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সরকারী অনুদান প্রদান
• কম খরচে বিভিন্ন পরিসেবা প্রদান
• গ্রামে এবং আধা শহরে প্রচুর শাখা খোলা লাভের কথা চিন্তা না করে
• বোর্ড গঠন করে সরকারী নিয়ম অনুসারে কর্মী নিয়োগ
• নতুন নতুন শাখা খোলা আর দিন দিন কর্মী নিয়োগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া
• এছাড়া দৈনন্দিন ব্যাংকিং

জাতীয়করণের ফলে ব্যবসায়িক ব্যাংকগুলো কয়টি ভাগে বিভক্ত হলো ।
(১) পাবলিক সেক্টর ব্যাংক
(২) প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংক
(৩) ফরেন ব্যাংক
(৪) রিজনাল রুরাল ব্যাংক
(৫) কোপেরাটিভ ব্যাংক
পাবলিক সেক্টর ব্যাংক বলতে আমরা বুঝি যে সব ব্যাংকের শেয়ারের শতকরা ৫১ ভাগ ও তার বেশি রয়েছে সরকারের হাতে । সারা ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে মোট ৫৬ টা রিজনাল রুরাল ব্যাংক আছে এবং সবাই সরকারী ।এদের ৫০% শেয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের , ১৫% শেয়ার রাজ্য সরকারের এবং ৩৫% শেয়ার স্পন্সর ব্যাংকের মানে পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের ।
উপরোক্ত সবকটি পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু একটি মাত্র ব্যংকের সরকারী শেয়ার শতকরা ৬০ ভাগের নিচে । সুচতুর ভাবে চেষ্টা চলছে সবকটি পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের সরকারী শেয়ার ক্রমশঃ নিচের দিকে নিয়ে আসা । এমন একটা সময় আসবে যখন দেখা যাবে পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলো প্রাইভেট সেক্টরে রূপান্তরিত হয়েছে । সমস্ত ব্যাংক শিল্পের কর্মচারীগণ এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালাছে । ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয়েছে লড়াই LPG অর্থাৎ Liberalisation, Privatisation and Globalisation(উদারীকরণ , বেসরকারীকরণ ও বিশ্বায়ন ) এর বিরুদ্ধে । যখন ১৩ তম রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর Mr. M. Narasimhan কে দিয়ে একটা কমিটি গঠন করে সরকার ব্যাংক সংস্কারের দিকে নজর দেয় । বিস্তারিত রিপোর্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো: –
• সুদের ব্যাপারে সরকারী নিয়ন্ত্রণ থাকবে না , বাজারের ওপর তা নির্ভর করবে
• সমস্ত ব্যাংকের ৮% ক্যাপিটাল এডিকুইসী (মূলধনের পর্যাপ্ততা ) থাকতে হবে
• সমস্ত ঋণকে চারভাগে ভাগ করতে হবে যথক্রমে স্ট্যান্ডার্ড , সাব স্ট্যান্ডার্ড , ডাউটফুল ও লস
• অনাদায়ে লভাংসো থেকে সংস্থান করে রাখতে হবে সম্পদের জন্য
• ব্যাংকগুলি জনসাধারণের কাছ থেকে তাদের মূলধন বাড়াতে পারবে শেয়ার বিক্রি করে
• নতুন বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরবিআই নিয়মের কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে
• মোট ঋণের ৪০% – প্রায়োরিটি সেক্টরের পরিমান কমিয়ে ১০% করার কথা বলা হলো অর্থাৎ কৃষিক্ষেত্রেও ১৮% ঋণের পরিমান কমলো
• আন্তর্জাতিক স্তরে ৩ থেকে ৪ টা বড় ব্যাংক তৈরী করা , জাতীয় স্তরে ৮ থেকে ১০ টা এবং গ্রামীণ ব্যাংক শুধু গ্রামীণ এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে
• আর কোনো ব্যাংকের জাতীয়করণ নয় ,নতুন ব্যাংক হিসাবে প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংককে স্বাগত জানানো ,ব্যাংকগুলির শাখা খোলার জন্য লাইসেন্সের বিলুপ্তিকরণ , বিদেশি ব্যাংক খোলার ব্যাপারে নীতি আরও উদার করা
• Assets Reconstruction Fund (ARF) নামে নতুন একটা সংস্থা খোলা যারা ব্যাংকগুলি থেকে doubtful assets কম দামে কিনে সেই ঋণ আদায় করবে
শুরু হয়ে গেল কমিটির সুপারিশ কার্যকর করার । ১৯৯২ থেকেই কার্যকর হলো নতুন নিয়ম ব্যাংকের সম্পদের জন্য -New prudential norms for income recognition, classification of assets and provisioning of bad debts এবং capital adequacy measure বা Capital to Risk Weighted Asset ratio । সমস্ত ঋণকে চারভাগে ভাগ করা হলো মুনাফা আদায়ের ভিত্তিতে যথাক্রমে স্ট্যান্ডার্ড , সাব স্ট্যান্ডার্ড , ডাউটফুল এবং লস । স্ট্যান্ডার্ড সম্পদের নাম হলো পারফর্মিং এসেট আর সাব স্ট্যান্ডার্ড , ডাউটফুল এবং লসের নাম হলো নন পারফর্মিং এসেট । মার্চ মাসে রিজার্ভ ব্যাংকের নির্দেশ অনুসারে লভাংসো থেকে প্রভিশনিং বা সংস্থান করে রাখা হলো প্রথমে সমস্ত ঋণের জন্য় । তারপর সমস্ত সম্পদের জন্য় । যেসব ঋণে কোনো লিকুইড সিকিউরিটি নেই সেইসব ঋণ নন পারফর্মিং এসেট বা এন পি এ হলে তার প্রভিসনের পরিমান বেশি । এর ফলে প্রতিটা ব্যাংকের লাভ একধাক্কায় অনেকটা কমে গেল বা অনেক ব্যাংকের লাভের জায়গায় ক্ষতি হতে লাগলো । এছাড়াও সমস্ত সম্পদের ঝুঁকির পরিমান নির্ধারণ করা হলো রিজার্ভ ব্যাংকের নির্দেশ অনুসারে । মূল সম্পদ থেকে ঝুঁকির পরিমান বাদ দিলে নিট সম্পদের মূল্য বেরোবে । যেমন ধরা যাক মোট গৃহ ঋণের পরিমান ১২০ টাকা , ব্যাংকের কাছে লিকুইড সিকিউরিটি বাবদ ধরা আছে ২০ টাকা আর ঝুঁকির গুনক ৪০% তাহলে ঐ সম্পদের নিট মূল্য দাঁড়াবে =[১২০ – {(১২০ -২০)৪০ %}] =৮০ । এবার ব্যাংকগুলিকে বলা হলো ৮% মূলধন পর্যাপ্ততা বা capital adequacy রাখতে হবে । তারমানে এই দাঁড়ালো যে (৮০৮%) বা ৬.৪ টাকা মূলধন হিসাবে ব্যাংককে রাখতে হবে । দিন দিন প্রভিশনিং বাড়ছে , ঝুঁকির গুনক বাড়ছে আর সাথে সাথে কমছে প্রফিট । ব্যাংকের মূলধন বাড়ছে না অথচ সম্পদের পরিমান বাড়ছে তাই সম্পদের ঝুঁকির পরিমানও বাড়তে বাধ্য় । capital adequacy এর মাত্রা(যেটা দিন দিন বাড়ছে, ব্যাসেল ৩ চালু হলে পরিমান আরো বাড়বে ) বজায় রাখতে ব্যাংকগুলিকে বাইরে থেকে মূলধন জোগার করতে হচ্ছে । শেয়ার বিক্রি করা ছাড়া ব্যাংকগুলির কাছে কোনো বিকল্প থাকছে না । বলা হচ্ছে capital adequacy এর মাত্রা ঠিক রাখলে ব্যাংক ফেল পড়বে না অথচ আমেরিকাতে ২০০৮ সালে বড় বড় ব্যাংক ফেল করলো যার মধ্যে অন্যতম লেহমন ব্রাদার্স যার capital adequacy আমাদের যে কোনো ব্যাংক থেকে বেশি । অর্থনৈতিক মন্দায় যখন ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ টার ওপর ব্যাংক ফেল পড়ল, বিশিষ্ঠ অর্থনীতিবিদদের ভাষায় আমাদের দেশের অর্থনীতি মজবুত রইলো আমাদের পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের জন্য । ব্যাংক শিল্প জাতীয়করণের পর থেকে আজ অবধি প্রায় ৩৪ টার ওপর প্রাইভেট ব্যাংক ফেল পরার হাত থেকে বেঁচে যায় শুধুমাত্র অন্য ব্যাংকের সাথে মিলিত হওয়ার ফলে । এর মধ্যে বেশ কটি ব্যাংক তাদের কার্যভার শুরু করে ১৯৯২ সালের পর অর্থাৎ ব্যাংকিং রিফর্মের পর বা বলা যায় এরা সব নিউ জেনারেশন ব্যাংক ছিল । এদের মধ্যে অন্যতম গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাংক যাকে ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স , একটা পাবলিক সেক্টর ব্যাংক অধিগ্রহণ করে । ব্যাসেল -১ , ব্যাসেল-২ ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলির ওপর প্রয়োগ করা হয়ে গেছে । সামনের বছর প্রয়োগ হবে ব্যাসেল -৩ , তারফলে ব্যাংকের মূলধন আরও বাড়াতে হবে । নানা কারণে ব্যাংকের এন পি এ দিন দিন বাড়ছে । অনাদায়ের অনেক কারণ আছে কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ বেশ কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃত ভাবে ঋণ পরিশোধ করছে না । যাদের বলা হয় উইলফুল ডিফলটার । পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলিতে মোট উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ৩১৯২ এবং সম্পদের পরিমান ২৮৭৭৫ কোটি ,স্টেট ব্যাংক ও তার সহযোগী ব্যাংক মিলিয়ে উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ১৫৪৬ এবং সম্পদের পরিমান ১৮৫৭৬ কোটি , প্রাইভেট ব্যাংকগুলিতে উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ৭৯২ এবং সম্পদের পরিমান ১০২৫০ কোটি , অনান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ৪২ এবং সম্পদের পরিমান ৭২৮ কোটি , ফরেন ব্যাংকগুলির উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ৩৮ এবং সম্পদের পরিমান ৪৬৩ কোটি । মোট সমস্ত ব্যাংক মিলিয়ে উইলফুল ডিফলটারের সংখ্যা ৫৬১০ এবং সম্পদের পরিমান ৫৮৭৯২ কোটি । সরকারের আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে ব্যাংকগুলির পক্ষে এই অনাদায়ী সম্পদ আদায় করা কোনো ব্যাপারই না । এইসব সম্পদের সম পরিমান অর্থ প্রভিসন করে রাখার ফলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে । তারফলে ব্যাংকগুলির মূলধন তো বাড়ছে না বরং কমছে ক্ষতি হওয়ার জন্য । খরচা কমাবার জন্য ব্যাংকগুলি বিভিন্ন পদে প্রয়োজনের তুলনায় নিয়োগ করছে কম । যে সংখ্যক কর্মী প্রতি বছর অবসর গ্রহণ করছে সেই সংখ্যক কর্মীও ব্যাংকগুলি নিয়োগ করছে না । পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলির চরিত্র ধীরে ধীরে আবার বদলে যাচ্ছে , বদলে যাচ্ছে তার সামাজিক দায়িত্ববোধ । দেশীয় থেকে হয়ে যাচ্ছে অন্তর্দেশীয় । দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করছে উদারীকরণ , বেসরকারীকরণ ও বিশ্বায়নকে ।

ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন


২০০৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুসারে ভারতবর্ষে প্রত্যেক বিবাহকে অবশ্যই নথিভুক্ত করতে হবে হিন্দু বিবাহ আইন (the Hindu Marriage Act, 1955) বা বিশেষ বিবাহ আইন
( the Special Marriage Act, 1954) অনুসারে ম্যারেজ রেজিস্তারের কাছে । আইন আনুসারে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রমাণ করার সহজ ও একমাত্র উপায় হল এই ম্যারেজ প্রমাণপত্র ।এটা না হলে সেটা হবে আইনানুসারে অপরাধ । পাত্র ও পাত্রী উভয়েরই চাই ঠিকানা ও জন্ম তারিখের প্রমাণ আর দুটো পাসপোর্ট সাইজ ছবি ।

হিন্দু বিবাহ আইন (the Hindu Marriage Act, 1955)
(১) প্রয়োগ করতে পারে কেবলমাত্র হিন্দু , বৌদ্ধ , জৈন ও শিক ধর্মাবলীরা
(২) বিবাহের জন্য ছেলেদের বয়স ২১ আর মেয়েদের বয়স ১৮ বৎসর সম্পন্ন করতে হবে
(২) ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই হতে হবে আবিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্ত বা
(৩) পতি ও পত্নীর মধ্যে যে কেউ মারা গেলে অন্যজন বিবাহ করতে পারবে
(৪) ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই হতে হবে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ
(৫) ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যে কোন একজনকে বিবাহের তারিখের ৬ মাস আগে অবধি ওই এলাকায় থাকতে হবে যেখানে তাদের বিবাহ নথিভুক্ত হবে
(৬) বিয়ের কার্ড বা পুরহিতের কাছ থেকে প্রশংসা প্ত্র আনতে হবে । বিবাহ নথিভুক্ত করার সময় অনুষ্ঠান সাধারণত এক সাথে হয় না
(৭) বিবাহ নথিভুক্ত করার সময় পাত্র ও পাত্রী উভয়কেই সাক্ষী সমেত উপস্থিত থাকতে হবে
(৮) বিবাহের একমাসের মধ্যেই বিবাহ নথিভুক্ত করার নিয়ম
(৯) অন্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে আসলে এই নিয়মেই বিবাহ নথিভুক্ত করতে হবে

বিশেষ বিবাহ আইন ( the Special Marriage Act, 1954)
(১) প্রয়োগ করতে পারে ভারতবর্ষের সমস্ত নাগরিক
(২) বিবাহের জন্য ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই ২১ বৎসর হতে হবে
(৩) বিবাহ নথিভুক্ত করার পূর্বে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে
(৪) ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যে কোন একজনকে বিবাহের তারিখের ৩০ দিন আগে অবধি ওই এলাকায় থাকতে হবে যেখানে তাদের বিবাহ নথিভুক্ত হবে ।
(৫) বিবাহ নথিভুক্ত করার সময় এক সাথে অনুষ্ঠান করা যাবে বা অনুষ্ঠানের পরও বিবাহ নথিভুক্ত করানো যাবে
(৬) বিয়ের কার্ড বা পুরহিতের কাছ থেকে প্রশংসা প্ত্র আনতে হবে না ।

বাস , ট্রাম , ট্রেনের সিঁড়ি আর একটু নিচু করা যায়না কি ?

কিছুদিন আগে আমেদাবাদ যাওয়ার জন্য গুজরাটের ভেরাভল রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম । আমাদের সামনে একটা ট্রেন এসে দাঁড়াল । দুই হাতে দুটো স্ক্র্যাচ নিয়ে একটি লোককে দেখলাম একটি কামরার পিছনের দিকের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতে । কামরাটির সামনের দরজাটি খোলা ছিল । ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলাম লোকটির একটা পা নেই । লোকটি একটি যুবককে পিছনের দরজাটা খুলে দিতে অনুরোধ করলো ।কিন্তু ছেলেটি ঐ লোকটিকে ঘুরে আসতে বলল । আমি যেখানে বসে ছিলাম সেখান থেকে সব শোনা যাচ্ছিল ।তাই আমি ট্রেনে উঠে পিছনের দরজাটা খুলে দিলাম এবং ওনাকে ট্রেনে উঠতে সাহায্য করতে গেলাম ।কারণ ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে যে ওনি উঠতে পারবেনা সেটা আমি ভালই বুজতে পারছিলাম । লোকটি আমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলল যে ওনি নিজেই উঠতে পারবেন । তারপর দেখলাম লোকটি স্ক্র্যাচদুটিকে দরজা দিয়ে ট্রেনের মধ্যে রাখল ।দুই হাতে ট্রেনের হাতল ধরে ট্রেনের দরজায় বসে পড়ল । তারপর দুইহাত দিয়ে মেজেতে চাপ দিয়ে শরীরটাকে ঘসে ঘসে কামরার ভিতরে প্রবেশ করলো । স্ক্র্যাচদুটিকে বসার জায়গায় রাখল । দুইহাত দিয়ে ধরে ধরে বসার জায়গায় কোনরকমে শরীরটা রাখল ।ভালই কষ্ট করতে হলো । লোকটি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয় । আমাদের দেশে এরকম ঘটনা প্রায়ই দেখা যায় । কিন্তু বেশ কিছুদিন ফিনল্যান্ডে থাকার সুবাদে পার্থক্যটা খুবই চোখে পড়ল । এরকম শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষজন বা পেরাম্বুলেটারে বাচ্চাকে নিয়ে মায়েদের বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে উঠতে ফিনল্যান্ডে কোন কষ্টই করতে দেখিনি । কারও সাহায্য ছাড়া যেকোন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে একা একা বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে চলাফেরা করতে পারে । কেননা তাদের কথা সরকার চিন্তা করে । বাস , ট্রাম বা ট্রেনের দরজা এতটাই নীচে থাকে যে পেরাম্বুলেটারে বাচ্চাকে নিয়ে মায়েদের উঠতে কোন কষ্টই হয় না । শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য থাকে চার চাকার একটা ছোট ব্যাটারি চালিত গাড়ি । একটা মানুষের বসতে যতটা জায়গা লাগে ততটাই জায়গা নেয় গাড়িটি যেটা নিয়ে তাদের কোথাও যেতে কোন অসুবিধা হয়না । এমনকি মলে গিয়ে তাদেরকে বাজার করতেও দেখেছি কারও সাহায্য ছাড়াই । বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে ঐ চার চাকার ছোট গাড়ি নিয়ে খুব সহজেই সফর করা যায় । ভেরাভল স্টেশনে বসে ভাবছিলাম আমাদের দেশে কেন এমনটি হয়না । কারও সাহায্য ছাড়া আমাদের দেশের শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের চলাফেরা করা বাস্তবে খুবই কঠিন । শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ কেন বয়স্ক মানুষদেরও খুবই কষ্ট হয় । বাস , ট্রাম এবং ট্রেনের সিঁড়ি আর একটু নিচু করা যায় না কি ?

বাংলা ভাষার বানান শেখার সহজ উপায়


Social Media বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে ইংরাজি হরফের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, সেটা ইংরাজি ভাষা লিখতেই হোক বা অন্য ভাষায় যোগাযোগ করতেই হোক । তার অবশ্য কয়েকটি কারন আছে ।যেমন আমার মনে হয় ঃ-
• ইংরাজি ভাষা লেখা সহজ
• বানান ভুলের চান্স থাকে না(অবশ্য ইংরাজিটা বাংলায় লেখলেও তাই হয়)
• (আ , ই ,উ , ঊ ) -কার, রেফ এবং যুক্তাক্ষর ইংরাজি ভাষায় থাকে না
• ইংরাজি ভাষা অনেক তাড়াতাড়ি লেখা যায়
• বাংলা ভাষা অনেকে বলতে জানে কিন্তু লেখার অভ্যাস নেই
• বাংলা ভাষা অনেকে বলতে জানে কিন্তু লিখতে জানে না
যদিও একটা কথা আশাকরি সবাই মানবে যে , যোগাযোগের মাধ্যম যে ভাষায় হচ্ছে সেই ভাষার হরফ ব্যবহার করলে ভাষাটা বুঝতে অনেক বেশি সুবিধা হয় এবং ভাষাটাকে সন্মান জানানো হয় । যেহেতু বাংলা ভাষার অনেক শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে এবং বানানের অনেক নিয়ম সংস্কৃত ব্যাকরণ থেকে এসেছে তাই অনেক সময়ই বানান লেখতে ভুল হয়ে যায় । Social Media বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সব ভাষার ভুল বানানের ব্যবহার দেখে দেখে অভ্যস্ত ।তাই আমার মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলাভাষার প্রতি সন্মান দেখাতে বাংলাভাষার বানানের কিছু সহজ নিয়ম বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে নিজের ভাষায় তুলে ধরছি যাতে Social Media তে বাংলা ভাষার ব্যবহারে আরও শুদ্ধতা আসে ।
• কোন শব্দের শেষে অনুস্বার (ং) উচ্চারণ হলে অনুস্বারই ব্যবহৃত হয় যেমন: পালং, রং , সং ইত্যাদি । কিন্তু অনুস্বারের সঙ্গে যদি কোন স্বর যুক্ত হয় তাহলে অনুস্বারের বদলে তা ‘ঙ’ হবে। যেমন: বাঙালি ( বাং + আলি ) , বাঙাল , ভাঙা(ভাং + আ ) ইত্যাদি । তবে ব্যাতিক্রম হচ্ছে – বাংলা ও বাংলাদেশ । বাংলা ও বাংলাদেশ কখনই বাঙলা বা বাঙলাদেশ হবে না । এছাড়া যেমন— কিংবদন্তী, সংজ্ঞা, সংক্রামণ, সংক্রান্ত, সংক্ষিপ্ত, সংখ্যা, সংগঠন, সংগ্রাম, সংগ্রহ, সংগৃহীত।
• দূরত্ব বোঝায় না এমন শব্দে ‘দ’ এর সাথে সবসময় ‘উ’ কার হবে । যেমন – দুরবস্থা, দুরন্ত, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্গা, দুর্গতি, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয় ইত্যাদি।
• দূরত্ব বোঝায় এমন শব্দে ‘দ’ এর সাথে সবসময় ‘ঊ’ কার হবে । যেমন – দূর, দূরবর্তী, দূর-দূরান্ত, দূরীকরণ, অদূর, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ ইত্যাদি।
• শব্দ বা পদের শেষে ‘জীব’ বা ‘-জীবী’ থাকলে সবসময় ঈ-কার হবে।
যেমন— সজীব, রাজীব, নির্জীব চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, আইনজীবী ইত্যাদি।
• আবার পদের শেষে ‘-বলি’ থাকলে সবসময় ই-কার হবে।
যেমন— কার্যাবলি, শর্তাবলি, ব্যাখ্যাবলি, নিয়মাবলি, তথ্যাবলি ইত্যাদি।
• ইংরাজি শব্দে যেখানে st আছে যেমন Post, Station সেখানে st এর জায়গায় বাংলায় ‘স্ট’(স +ট ) ব্যবহার হবে। যেমন—পোস্ট, স্টার, স্টাফ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, স্ট্যাটাস, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টুডিও, ফাস্ট, লাস্ট, বেস্ট ইত্যাদি। এছাড়া ট-বর্গীয় বর্ণে ‘ষ্ট’( ষ +ট ) ব্যবহার হবে। যেমন— বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট ইত্যাদি।
• পূর্ণ শব্দটি যেখানেই থাক ‘প’ এর সাথে ‘ঊ’ আর ‘ণ’ এর সারে ‘রেফ’ হবে । যেমন – পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ ইত্যাদি।
• কিন্তু পুন শব্দটি থাকলে ‘প’ এর সাথে ‘উ’ আর ‘ন’ হবে । যেমন – পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন,পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ইত্যাদি।
• পদের শেষে ‘-গ্রস্থ’(স+থ) নয় ‘-গ্রস্ত’(স+ত) হবে।যেমন— বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ইত্যাদি।
• যে শব্দে অঞ্জলি আছে সেখানে ‘ই’ কার যোগ হবে । যেমন – অঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি ইত্যাদি।
• বিদেশি শব্দ বাংলায় প্রকাশ করার সময় ‘ণ’, ‘ছ’, ‘ষ’ এর ব্যবহার হবে না। যেমন— হর্ন, কর্নার, সমিল (করাতকল), স্টার, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি।
• ইংরেজি ‘S’ বর্ণের জায়গায় বাংলা প্রতিবর্ণ হবে ‘স’ এবং sh, -sion, -tion শব্দগুচ্ছে ‘শ’ হবে।যেমন— সিট (Seat/Sit), শিট, (Sheet), রেজিস্ট্রেশন (Registration), মিশন (Mission) ইত্যাদি।
• বিদেশি শব্দে ‘ই-কার’ ব্যবহার হবে। যেমন— আইসক্রিম, স্টিমার, জানুয়ারি, ফ্রেরুয়ারি, ডিগ্রি, চিফ, শিট, শিপ, নমিনি, কিডনি, ফ্রি, ফি, ফিস, স্কিন, স্ক্রিন, স্কলারশিপ, পার্টনারশিপ, ফ্রেন্ডশিপ, স্টেশনারি, নোটারি, লটারি, সেক্রেটারি, টেরিটরি, ক্যাটাগরি, ট্রেজারি, ব্রিজ, প্রাইমারি, মার্কশিট, গ্রেডশিট ইত্যাদি।
• বিশেষণবাচক কোন শব্দের সাথে ‘আলি’ যোগ হলে শব্দে ‘ই-কার’ হবে।
যেমন— সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, হেঁয়ালি, খেয়ালি, মিতালি ইত্যাদি।
• অদ্ভুত, ভুতুড়ে বানানে ‘উ-কার’ হবে। এ ছাড়া সকল ভূতে ‘ঊ-কার’ হবে।
যেমন— ভূত, ভস্মীভূত, বহির্ভূত, ভূতপূর্ব ইত্যাদি।
• হীরা ও নীল অর্থে সকল বানানে ‘ঈ-কার’ হবে।যেমন— হীরা, হীরক, নীল, সুনীল, নীলক, নীলিমা ইত্যাদি।
• যেকোন ভাষা ও যেকোন জাতি বোঝাতে ‘ই-কার’ ব্যবহৃত হবে। যেমন— বাঙালি/বাঙ্গালি, জাপানি, ইংরেজি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি।
• কোন শব্দের সাথে ‘-কারী’ বা ‘আরী’ যোগ করলে যদি কোন ব্যক্তিকে বোঝায় তাহলে ‘ঈ-কার’ ব্যবহৃত হবে।যেমন— সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী, পথচারী, কর্মচারী ইত্যাদি।কিন্তু যদি কোন ব্যক্তিকে না বোঝায় তাহলে ‘ই-কার’ হবে । যেমন— সরকারি, দরকারি ইত্যাদি।
• কোন শব্দের সাথে ‘-কারী’ বা ‘আরী’ যোগ করলে যদি একের বেশি ব্যক্তিকে বোঝায় তাহলে ‘ই-কার’ ব্যবহৃত হবে। যেমন— সহকারী>সহকারিগণ, কর্মচারী>কর্মচারিগণ,কর্মী>কর্মিগণ, আবেদনকারী>আবেদনকারিগণ ইত্যাদি।
• বহু বা অনেক অর্থে ব্যবহৃত হবে ‘ বেশি’ আর শব্দের শেষে ব্যবহৃত হলে হবে ‘বেশী’ । যেমন – ছদ্মবেশী, প্রতিবেশী ইত্যাদি ।
• রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত হলে সেটা কখনই দ্বিত্ব হবে না৷
যেমন— অর্চনা, অর্জন, অর্থ, অর্ধ, কর্দম, কর্তন, কর্ম, কার্য, গর্জন, মূর্ছা, কার্তিক, বার্ধক্য, বার্তা, সূর্য৷
• ‘ঈ-কার’ যুক্ত শব্দের শেষে “ ত্ব, তা, নী, ণী, সভা, পরিষদ, জগৎ, বিদ্যা, তত্ত্ব ” যোগ হলে ঈ-কারটা ‘ই-কার’ হয়ে যাবে । যেমন— দায়ী/ দায়িত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী/ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রার্থী/প্রার্থিতা , দুঃখী/দুঃখিনী, অধিকারী/অধিকারিণী, সহযোগী/সহযোগিতা, মন্ত্রী/মন্ত্রিত্ব, মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিপরিষদ, প্রাণী/প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিজগৎ, প্রাণিসম্পদ ইত্যাদি।
• আবার ‘ই-কার’ যুক্ত শব্দের সাথে “ ঈ, ঈয়, অনীয় ” যোগ হলে ‘ই-কার’ ‘ঈ-কার’ হয়ে যাবে । যেমন— জাতি/জাতীয়, দেশি/দেশীয়, পানি/পানীয়, জলীয়, স্থানীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, শোচনীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, করণীয়।
• ‘ৎ’-এর সাথে স্বরচিহ্ন যোগ হলে ‘ত’ হবে। যেমন— জগৎ>জগতে জাগতিক, বিদ্যুৎ>বিদ্যুতে বৈদ্যুতিক, ভবিষ্যৎ>ভবিষ্যতে, আত্মসাৎ>আত্মসাতে , সাক্ষাৎ>সাক্ষাতে ইত্যাদি।
• ‘অ-কারের’ সাথে ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘অ-কার’ , ‘আ-কার’ হয়ে যাবে । যেমন— অঙ্গ>আঙ্গিক, বর্ষ>বার্ষিক,পরস্পর>পারস্পরিক, সংস্কৃত>সাংস্কৃতিক, অর্থ>আর্থিক, পরলোক>পারলৌকিক, প্রকৃত>প্রাকৃতিক, প্রসঙ্গ>প্রাসঙ্গিক, সংসার>সাংসারিক, সপ্তাহ>সাপ্তাহিক, সময়>সাময়িক, সংবাদ>সাংবাদিক, প্রদেশ>প্রাদেশিক, সম্প্রদায়>সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি।

প্রিয় বন্ধু


ছোটবেলায় শুনেছিলাম সবচেয়ে ভাল বন্ধু হলো বই । এখনও অনেককে এটাই বলতে শুনি । ইদানিং আমার বইকে সবচেয়ে ভাল বন্ধু বলে মনে হচ্ছে না । নিঃসন্দেহে বই ভাল সঙ্গী । অবশ্যই একটা নয়, অনেক- অসংখ্য । বইয়ের সঙ্গলাভ আনন্দ দেয় , জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় – সব ঠিক আছে কিন্তু বিশ্বাস করে মনের কথা উজার করে দিতে পারি কই । স্বার্থপরের মত চুপ করে থাকে , বন্ধুর বিপদে ঝাপিয়ে পরেনা ।অথচ আমার বন্ধুকে দেখো সে কখনই আমার ক্ষতিতো করেই না বরং সবসময় আমাকে রক্ষা করার চেষ্ঠা করে । যে কোন ব্যাপারের ভালো , মন্দ দুটো দিকই আমার সামনে তুলে ধরে ।সবসময়ের জন্য আমাকে সঙ্গ দেয় । না করে ঝগড়া , না করে রাগারাগি , না করে সমলোচনা , না করে ব্যঙ্গ । সবসময় অকৃত্রিম, মুখে যা মনেও তাই । যখনই ডাকি তখনই চলে আসে আমার সাথে গল্প করতে বা আমার সাথে কোন বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে আলোচনা করতে । এই ভালো বন্ধুটিকে আগে চিনতেই পারিনি কিন্তু অবসর গ্রহনের পর এই বন্ধুটির ভাল করে উপলব্ধি করতে পারলাম । পাড়ার বন্ধু , স্কুল – কলেজের বন্ধু , অফিসের বন্ধু সবার থেকে একদম আলাদা । ওর কষ্ট হলে আমারও কষ্ট হয় । ও ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকি । জানিনা ও দেখতে কেমন বা ওর নাম কি । হয়ত ওর নাম হতে পারে – মন বা ব্রেন বা ইন্দ্রিয় । ও আর কেউ নয়, ও আমার প্রতিচ্ছবি । কিন্তু সে যে আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এটা বলতে পারি ।

প্রয়োজনীয় দরকারি টুকিটাকি ( নানা জায়গা থেকে সংগৃহীত)


১। অনেকদিন ঘর বন্ধ থাকার পর খুললে একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসে । দুই বা তিনটে দিয়াশেলাই কাটি জ্বালালে একটু বাদেই গন্ধ চলে যাবে ।
২। যে পাত্রে চিনি রাখা হয় সেটা ভাল করে বন্ধ না করে রাখলে পিঁপড়ে ঢুকে পড়তে পারে । তিন/ চারটে লবঙ্গ ঐ পাত্রে রাখলে পিঁপড়া আসবে না ।
৩। এক ফোটা ভিনিগার দিয়ে চশমার কাচ পরিষ্কার করলে কাচ ঝকঝকে করবে ।
৪। চা-পাতা ফোটানো জল ঠাণ্ডা করে নিয়ে কাঠের আসবাবপত্র পালিশ করা হলে আসবাবপত্র ঝকঝক করবে ।
৫। ফ্রিজের গায়ে কোন কিছুর দাগ লাগলে , ঐ দাগের উপর একটু টুথপেস্ট দিয়ে ঘষলে সেই দাগ উঠে যাবে ।
৬। জানলা , দরজার কাঁচ গ্লিসারিন দিয়ে ভালভাবে পরিষ্কার করলে কাঁচ ঝকঝক করবে।
৭। এক চামচ ফিনাইল , একটা লেবুর রস আর একটু ডিটারজেন্ট পাউডার মিশিয়ে বাথরুমের টাইলস ভালভাবে ঘষে পরিষ্কার করলে খুব ভাল পরিষ্কার হয় ।
৮ । ঘর বন্ধ করে দু/ তিন টুকরো কর্পূর জ্বালিয়ে দিলে , আর চড়ুই পাখি ঘরে বাসা বাঁধতে চাইবে না ।
৯ । গ্যাসস্টোভের বার্নার ময়লা হলে , ড্রেনের পাইপ পরিষ্কার করার পাউডার ফুটন্ত জলে ভাল ভাবে মিশিয়ে তার মধ্যে ১/২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে দিয়ে , ভাল করে জল দিয়ে ধুয়ে নিলে দারুন পরিষ্কার হয় ।
১০। গরম পোশাক বা সিল্কের পোশাক ধোওয়ার পর , এক বালতি জলে দুই টেবিল চামচ ইউক্যালিপটাসের তেল মিশিয়ে তার মধ্যে ডুবিয়ে নিলে পোকা কাটার ভয় থাকবে না ।
১১ । উলের পোশাক ধোওয়ার পর , এক বালতি জলে আধ চামচ গ্লিসারিন দিয়ে ডুবিয়ে নিলে উলের পোশাক নরম থাকবে।
১২ । বাচ্চাদের জামাকাপড়ে কাচার পর যদি বমির দুর্গন্ধ থেকে যায়, তবে জলে আধ চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে তাতে জামাকাপড় ডুবিয়ে নিলে দুর্গন্ধ চলে যাবে ।
১৩। ইস্ত্রি করার সময় জলে কয়েক ফোঁটা সেন্ট ঢেলে সেটা কাপড়ের উপর ছিটিয়ে নিয়ে ইস্ত্রি করলে কাপড় থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোবে ।
১৪। সেন্টের শিশি সবসময় ভাল করে তুলো বা কাপড়ে জড়িয়ে রাখলে অনেকদিন ধরে পুরো গন্ধ থাকবে ।
১৫। অনেকসময় আংটি বা কোন গহনার প্রান্তের খোঁচায় কাপড় ছিঁড়ে গেলে বা সুতো উঠে গেলে , সেই ধারালো প্রান্তের অংশে ন্যাচারাল নেলপালিশ লাগিয়ে দিলে আর খোঁচা লাগবে না ।
১৬ । সূতির কাপড়ে মাড় দিতে না পারলে , পঞ্চাশ গ্রাম সাবুদানা জলে ফুটিয়ে , ছেঁকে নিয়ে , ঠাণ্ডা করে তার সাথে দুই টেবিল চামচ সাদা ভিনিগার মিশিয়ে , ইস্ত্রি করার সময় ছিটিয়ে নিলে মাড়ের কাজ হবে ।
১৭ । জামা কাপড় বা জুতো ভেজা থাকলে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে সাময়িক শুকিয়ে নেওয়া যাবে ।
১৮ । বেশির ভাগ সময় দেখা যায় নতুন স্টিলের বাসনে কোম্পানির নাম লেখা স্টিকার থাকে । স্টিকার লাগানো অংশের উল্টোদিকটা একটু গরম করে নিলে স্টিকার সহজে উঠে আসবে।
১৯ । কোন জিনিসপত্রের ওপর থেকে দামের লেবেল বা কোন লেবেল তুলতে হলে তার উপর ভাল করে সেলোটেপ লাগিয়ে দিয়ে তারপর সেলোটেপ ধরে টান দিলে লেবেলটি উঠে আসবে ।
২০ । যদি ফুটন্ত গরম জলে পেরেক ডুবিয়ে সেই পেরেক হাতুরি দিয়ে দেওয়ালে আটকাতে গেলে, দেওয়ালের প্লাস্টার খসবে না।
২১। যন্ত্রপাতির বাক্সে ছোট্ট শিশিতে কর্পূর রেখে ভাল করে মুখ বন্ধ করে রেখে দিলে যন্ত্রপাতিতে মরচে পড়বে না।
২২ । ফ্রিজ বন্ধ করে কিছুদিনের জন্য কোথায় যাওয়ার আগে পাতি লেবু রেখে গেলে ফ্রিজে দুর্গন্ধ হবে না ।
২৩ । অনেকসময় ফ্রিজে বাজে গন্ধ হয় । একটা পাত্রে একটু সরষের গুঁড়োর সাথে একটু জল মিশিয়ে ফ্রিজ খোলা রেখে দিলে পরেরদিন আর গন্ধ থাকবে না ।
২৪ । তেল , দুধ , দই এসবে যে টেট্রাপ্যাক ব্যবহার করা হয় , সেগুলো খালি হয়ে গেলে ভাল করে ধুয়ে , কেটে ডিপ ফ্রিজে রেখে তার উপরে মাছ , মাংসের পাত্র রাখলে আটকে যাবে না ।
২৫ । প্রেসার কুকারের গ্যাসকেট মাঝে মাঝে ফ্রিজে রেখে দিলে অনেকদিন টিকবে ।
২৬ । খাম বন্ধ করার জন্য আঠা না থাকলে ন্যাচারাল কালার নেলপালিশ ব্যবহার করে খাম বন্ধ করা যাবে ।
২৭ । সেলোটেপের মুখ খুঁজে না পেলে মিনিট দশেক ফ্রিজে রেখে দিলে রিলটা খুলে আসবে ।
২৮ । অনেকসময় ড্রয়ার টানাটানি করলেও সহজে খোলা যায়না তাই ড্রয়ারের ধারে মোম লাগিয়ে রাখলে আর সহজে আটকাবে না।
২৯ নেলপালিশ ফ্রিজে রাখলে সহজে শুকোবে না।
৩০ । দু/ তিন চামচ ডিটারজেণ্ট , এক লিটার জলে ভাল করে মিশিয়ে নিয়ে স্প্রেগান বা পিচকিরিতে ভরে ঘরের আনাচে কানাচে স্প্রে করলে আরশোলা মরবে ।
৩৪ । মোমবাতির স্ট্যান্ডে একটু তেল লাগিয়ে মোমবাতি জ্বালালে মোমবাতি ফুরিয়ে গেলে জমা মোম তুলতে অসুবিধে হবে না।
৩৫। বোতলের ছিপি খুব শক্ত হয়ে আটকে গেলে, একটা রুমাল গরম জলে ভিজিয়ে নিংড়ে বোতলের ছিপির নীচে জড়িয়ে রাখলে কিছুক্ষণ পরে ছিপিটি আলগা হয়ে আসবে।
৩৬। সিলিণ্ডার ক্যারিয়ার না থাকলে থার্মোকলের ওপর গ্যাস সিলিণ্ডার রাখলে সিলিণ্ডারেও যেমন মরচে পড়বে না, মেঝেতেও মরচের দাগ লাগবে না ।
৩৭। রান্না করতে করতে গ্যাস ওভেন-এ কিছু পড়ে গেলে একটু নুন ছিটিয়ে ওভেন ঠাণ্ডা হলে পোড়া জিনিসগুলো ভিজে স্পঞ্জ দিয়ে ভালভাবে মুছলে ওভেন আবার আগের মতো হয়ে যাবে ।
৩৮। বেসিন ও সিঙ্কের পাইপে রাতের দিকে মাঝে মাঝে আধ কাপ মতো ভিনিগার ঢেলে রেখে দিয়ে , সকালে জল দিয়ে ধুয়ে নিলে পাইপ পরিষ্কার এবং জীবাণু মুক্ত থাকবে ।
৩৯। সিঙ্কের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে একটু বেশী নুন দিয়ে জল ফুটিয়ে সিঙ্কের মুখে ঢেলে দিলে মুখ পরিষ্কার হয়ে যাবে।
৪০। ব্যবহার করা চা পাতা ধুনোর বদলে ব্যবহার করলে ঘরের সমস্ত মশা, মাছি পালিয়ে যাবে।
৪১। কয়েক টুকরো কর্পূর আধকাপ জলে ভিজিয়ে খাটের নীচে রেখে দিলে মশা আসবে না ।
৪২। মশা হলুদ আলো থেকে দূরে থাকতে চায়, তাই যদি ঘরের আলোটিকে হলুদ সেলোফেনে জড়িয়ে ফেলা যায় তাহলে ঘরে মশা কম হবে ।
৪৩। খাবার টেবিলে গ্লাসে জল নিয়ে তাতে ৫/৬ গাছি পুদিনা রেখে দিলে মাছি আসবে না ।
৪৪। তোশক বা গদির তলায় নিমপাতা রাখলে পোকামাকড় হবে না।
৪৫। কিছুটা রসুন বেটে কাপড়ে বেঁধে ঘরের কোণে রেখে দিলে ঘরের ভিতর সাপ ঢুকবে না।
৪৬। সোনা-রূপোর বা পাথরের গয়না টুথপেস্ট দিয়ে ঘষে , শুকনো কাপড়ে দিয়ে ভালভাবে পেস্ট মুছে ফেললে গয়নার উজ্জ্বলতা বাড়বে।
৪৭। কয়েক ফোঁটা সরষের তেলের সাথে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে পেতলের বাসন ঘষলে চকচক করবে।
৪৮। চাল ধোয়া জলে স্টীল ও কাঁচের বাসন কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে তারপর ধুয়ে নিলে বাসনগুলো ঝকঝক করবে।
৪৯। রান্না করতে গিয়ে খাবার পুড়ে পাত্রের নীচে আটকে গেলে , নুনজল দিয়ে পাত্রটিকে ভর্তি করে আঁচে বসাতে হবে । জল ফুটতে শুরু করলেই পোড়া অংশ আলগা হয়ে উঠে যাবে।
৫০। রান্নার সময় হাতে হলুদের দাগ লাগলে , আলুর খোসাতে হাত ঘষে নিলে হলুদের দাগ উঠে যাবে ।
৫১। দই পাতবার সময় দুধের সঙ্গে ১ চামচ কর্ণফ্লাওয়ার গুলে দিলে দই অনেক বেশি ঘন হবে।
৫২। দুধ ঠিক সময় মতো গরম না করলে দুধ কেটে যাবার ভয় থাকে। দুধের মধ্যে দু-ফোঁটা সরষের তেল দিয়ে রাখলে দুধ যখনই ফোটান হোক না কেন দুধ কাটবে না।
৫৩। অনেকক্ষণ বাইরে পড়ে আছে দুধ। ভয় হচ্ছে আঁচে বসালেই কেটে যাবে। আঁচে বসানোর আগে দুধে ১ চিমটি সোডা মিশিয়ে নিলে দুধ কাটবে না।
৫৪। দুধ পুড়ে গেলে বা দুধ থেকে পোড়া গন্ধ দূর করতে হলে তাতে পান পাতা ফেলে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিলে পোড়া গন্ধ কেটে যাবে।
৫৫ । চালের গুঁড়োর পিঠে করলে সাধারণত শক্ত হয়। পিঠে করার আগে যদি চালের গুঁড়োতে কিছুটা খই মাখিয়ে নেওয়া হয় তবে পিঠে নরম হয় এবং খেতেও ভাল লাগে।
৫৬। ছানা কাটানোর জন্য লেবুর রসের বদলে ফুটন্ত দুধে ১ চামচ দই ফেলে দিলে ছানা নরম হবে।
৫৭ । বিস্কুটের টিনে বা পাত্রে এক টুকরো ব্লটিং পেপার রেখে দিলে বিস্কুট মিইয়ে যাবে না।
৫৮। পোড়ামাটির জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখতে হলে ওগুলোর ওপর ন্যাচারাল রঙের নেলপালিশ লাগিয়ে দিলে রং অক্ষত থাকবে আর নোংরা হবে না।
৫৯। টিকটিকি থেকে বাচতে – ঘরের কোণে, ভেন্টিলেটর, আলমারির ফাঁকে, কিংবা যে জায়গায় টিকটিকি বেশি সেখানে রসুনের কোয়া রেখে দিতে পারেন। রসুনের গন্ধে ঘরে বাকি পোকা-মাকড়-মশা যেমন পালায়, তেমনই টিকটিকিও।পেঁয়াজও কাজে দেবে একই ভাবে। পেঁয়াজের মধ্যে সালফারের গন্ধ অনেক পোকা-মাকড়ই সহ্য করতে পারে না। টিকটিকির ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। ডিমের খোলাও ভাল কাজে দেয় টিকটিকি তাড়াতে। ডিমের গন্ধ সহ্য হয় না টিকটিকির। তাই অল্প সময়েই পালাবে।গোলমরচি জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে পারেন ঘরের কোণে। বা যেখানে টিকটিকির উপদ্রব বেশি। মরিচের গন্ধে টিকটিকির মস্তিষ্ক অবশ হয়ে যায়। তাই তারা এই গন্ধ পেলে ধারেকাছে আসবে না।

৬০ । বিছানার তলায় মুচকুন্দ ফুল রাখলে ছারপোকা পালাবে।

পুজোর আগে ফিনল্যান্ডে

তিন মাস হলো ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কির লাগোয়া শহর এসপুতে আছি । দুই শহরের মধ্যে পার্থক্য চোখে পরার মতো কিছুই নেই । শুধু মাত্র ট্রাম চলতে দেখিনি এসপুতে । বাকি সব একইরকম । আর পাঁচটা দিনের মতোই ছিল এবারের মহালয়া, আলাদা করে বোঝার কোনো উপায় ছিল না । ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে থাকতেই পারার সব বাড়িতে আলো জ্বলে ওঠা , বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠে আগমনী পাঠ , দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় বা সুপ্রীতি ঘোষের কন্ঠে মনমাতানো গান শোনার অভিজ্ঞতা এবার বাদ গেল । সামনে দূর্গা পূজা । হেলসিঙ্কি ও পাশের আর একটা শহর বান্তা ,এই দুই শহর মিলিয়ে এবার তিনটি দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে ।গতবারের থেকে একটা বেশি । পুজারী সমাজের দুটি পূজা হবে ৮ ই এবং ৯ই অক্টোবর আর বাঙ্গালী সমাজের পূজা অনুষ্ঠিত হবে ১৩ই অক্টোবর সন্ধ্যে থেকে ১৫ই অক্টোবর রাত্রি অবধি । তিনটি পূজাই হবে হলের মধ্যে ।
কলকাতার বিভিন্ন পূজা মন্ডপের মত এখানে তিনটে পূজারই নেই কোনো আলাদা রকমের থিম, আছে একটাই থিম যার নাম মিলন মেলা ।কলকাতা থেকে অনেকদূরে পৃথিবীর প্রায় শেষ সীমানায় সুমেরু বৃত্তের কাছের একটি দেশে প্রচন্ড ঠান্ডা তাপমাত্রা থাকা সত্বেও কতিপয় কিছু উত্সাহী বাঙালির প্রচেষ্ঠায় অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজা ।দেখা যাক এই মিলন মেলা আমার হৃদয়ে কতটা প্রলেপ লাগাতে পারে । তবে একটা জিনিস শুনে খুব ভালো লাগছে যে এই মিলন মেলায় ভারতবাসী ছাড়াও রাশিয়ান , সুইডিস ও ফিনিস লোকেরাও অংশ গ্রহণ করে । ভারবর্ষের বিভিন্ন শহরের পূজা দেখার সৌভাগ্য় আমার হয়েছে । সেখানেও দেখেছি বাঙালি ছাড়া অন্য ভাষা-ভাষিদের আন্তরিকভাবে দুর্গাপূজায় অংশ গ্রহণ করতে । কিন্তু বাইরে থাকলে দুর্গাপুজো হওয়ার আগে যেটা প্রচন্ডভাবে মিস করি, সেটা হলো শরত কালের ঝকঝকে নীল আকাশ আর তার মাঝে পাঞ্জা তুলার মতো মেঘ । আর যেটা দেখলেই বুঝি পুজো এসেছে সেই কাশ ফুল আর শিউলির গন্ধ । এখানে দেখছি মাপেল গাছের পাতার রঙ সবুজ থেকে ধীরে ধীরে সোনালী বা কোনো অংশে গোলাপী হতে শুরু করেছে ।শীতের আগমনের ছোঁয়া এক এক দেশে এক এক রকম ।
আমাদের কোলকাতার বাড়ির সামনেই একটা পুকুর আছে যেটাকে স্থানীয় সবাই কালিগঙ্গা হিসাবে মানে ।মহালয়ার দিন সকাল থেকেই দেখা যায় অসংখ্য মানুষের ভিড় । সবাই তর্পণ করছে বা বলা যায় প্রয়াত পূর্ব পুরুষদের তিল জল দিয়ে স্মরণ করার রীতি পালন করছে । বেশ দূর থেকেও সে আওয়াজ শোনা যেত কিন্তু কে কি বলছে সেটা কখনো বোঝা যেত না । পিকনিকে একসাথে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন গান চালানোর মতো । সকাল বেলায় রেডিওতে মহালয়া আর তারপর তর্পণ মানে আকাশে বাতাসে এলো পুজোর গন্ধ । ভীড় শুরু রাস্তা ঘাটে । দোকানে দোকানে জামা কাপড় কেনার ভীড়, চলবে আরো কটা দিন । সুদুর ফিনল্যান্ডে বসে কল্পনায় দেখতে পারছি দেশের প্রতিটা মন্ডপে দ্বিগুন উত্সাহে কাজ শেষ করার চেষ্ঠা চলছে । পাড়ায় , অফিসে , ট্রেনে , বাসে সর্বত্রই চলছে পূজার আলোচনা ।সারা পশিমবঙ্গ এই সময় সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে যায় বলে মনে হয় ।খুব মিস করছি প্রতিটা মুহূর্তকে ।
এক অপরিচিত দেশের অজানা অনেক ভাল লাগার জিনিস প্রায় প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করছি এখানে । উপলব্ধি করছি বা জানতেও পারছি এখানে ক্রাইম নেই বলেলেই চলে ।কোনো জিনিস রাস্তায় পরে গেলে সেটা আবার খুঁজে পাওয়া যাবে । কোনরকম দূষণ নেই ।গাড়ি হর্ন দেয়না আওয়াজ হবে বলে ।লোকেদের ব্যবহার অত্যন্ত ভদ্র । জোরে বা চিত্কার করে কথা বলতে কাউকে দেখিনি । রাস্তায় কেউ থুথু ফেলে না । লোডশেডিং কি বস্তু এখানে সেটা কেউ জানে না । সবখানে ,সব জায়গায় পাওয়া যায় ইন্টারনেট আর পরিশ্রুত জল । কিন্তু পাওয়া যায় না রোল ।পাড়ায় পাড়ায় সিঙ্গারা , চপ ,মোমোর দোকান নেই । ইচ্ছা হলেই রুটি ,তরকা কিনে ঢোকা যায় না বাড়ি । আর আমাদের দেশের যে কোনো বড় শহরের বিরিয়ানি-কোথায় পাব তারে ?মিষ্টি বলতে শুধু জিলিপী । সেটা পাওয়া যায় ইরানীদের দোকানে কারণ ওটা নাকি ওদেরই তৈরী । দূর্গা পূজা আসলেই যেন বেশি করে খাবারের কথা মনে পরে ।
দূর্গা পূজার প্রধান আকর্ষণ পারিবারিক মিলন ।পরিবারের যে যেখানে থাকে সবাই চেষ্ঠা করে পূজায় একত্রিত হতে । পূজার সারাদিন মন মতন খাওয়া আর চুটিয়ে আড্ডাই হলো আমাদের প্রধান আকর্ষণ । প্রতিটা পূজা মন্ডপে গেলেই আগে ভেসে আসে খাওয়ার গন্ধ ।কত রকমের খাওয়ার দোকান । তারপর আছে মন্ডপের সাজসজ্জা , আলোকসজ্জা , প্রতিমার এক এক রূপ । কোথাও নবদুর্গা, আবার কোথাও পঞ্চদুর্গা , কত রকমের প্রতিমা । এখানে সেটা সম্ভব নয় । পূজার সামগ্রী জোগার করতেই কতদিনের প্রস্তুতি নিতে হয় সেটা বেশ উপলব্ধি করতে পারছি । বেশিরভাগ জিনিসই আনতে হয় দেশ থেকে । সারা বছর ধরে নিতে হয় প্রস্তুতি । শুনেছি এখানে পূজা মন্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে । দেশের পূজার কথা সব সময় মনে হচ্ছে ঠিকই আবার মনকে বোঝাচ্ছি এ এক নতুন অভিজ্ঞতা । এখানকার লোকেদের সানিধ্য়ে এবারের পূজার স্বাদ হোক না একটু আলাদা । ফিনল্যান্ডের দুর্গাপূজার প্রতিটা মূহুর্ত থাকবে আমার ক্যামেরায় বন্দী ।আশা করি এই অভিজ্ঞতা সারা জীবন ধরে মনে থাকবে ।

পরিবহণে পরিবর্তনের আশায়


কিছুদিন আগে আমেদাবাদ যাওয়ার জন্য গুজরাটের ভেরাভল রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম । আমাদের সামনে একটা ট্রেন এসে দাঁড়াল । দুই হাতে দুটো স্ক্র্যাচ নিয়ে একজন লোককে দেখলাম একটি কামরার পিছনের দিকের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতে । কামরাটির সামনের দরজাটি খোলা ছিল । ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলাম লোকটির একটা পা নেই । লোকটি একজন যুবককে পিছনের দিকের দরজাটা খুলে দিতে অনুরোধ করলো যাতে তাকে ঘুরে যেতে না হয় ।কিন্তু ছেলেটি ঐ লোকটির কথার কোন মূল্য না দিয়ে চলে গেল । আমি যেখানে বসে ছিলাম সেখান থেকে সব শোনা যাচ্ছিল ।তাই আমি ট্রেনে উঠে পিছনের দরজাটা খুলে দিলাম এবং ওনাকে ট্রেনে উঠতে সাহায্য করতে গেলাম ।কারণ ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে যে ওনি উঠতে পারবেনা সেটা আমি ভালই বুঝতে পারছিলাম । লোকটি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল যে ওনি নিজেই উঠতে পারবেন । তারপর দেখলাম ওনি স্ক্র্যাচদুটিকে দরজা দিয়ে ট্রেনের মধ্যে রাখলেন ।দুই হাতে ট্রেনের হাতল ধরে ট্রেনের দরজায় বসে পড়লেন । তারপর দুইহাত দিয়ে মেজেতে চাপ দিয়ে শরীরটাকে ঘসে ঘসে কামরার ভিতরে প্রবেশ করালেন । স্ক্র্যাচদুটিকে বসার জায়গায় রেখে দুইহাত দিয়ে ধরে ধরে বসার জায়গায় কোনরকমে শরীরটাকে রাখলেন ।ভালই কষ্ট করতে হলো । লোকটিকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে তার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয় । আমাদের দেশে এরকম ঘটনা প্রায়ই দেখা যায় । কিন্তু বেশ কিছুদিন ফিনল্যান্ডে থাকার সুবাদে পার্থক্যটা খুবই চোখে পরেছে । এরকম শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষজন বা পেরাম্বুলেটারে বাচ্চাকে নিয়ে মায়েদের বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে উঠতে ফিনল্যান্ডে কোন কষ্টই করতে দেখিনি । কারও সাহায্য ছাড়াই যেকোন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে একা একা বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে চলাফেরা করতে দেখেছি । কেননা তাদের কথা সরকার চিন্তা করে । বাস , ট্রাম বা ট্রেনের দরজার সিঁড়ি এতটাই নীচে থাকে যে পেরাম্বুলেটারে বাচ্চাকে নিয়ে মায়েদের উঠতে কোন কষ্টই হয় না । দেখেছি শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য রয়েছে চার চাকার একটা ছোট ব্যাটারি চালিত গাড়ি । একটা মানুষের বসতে যতটা জায়গা লাগে ততটাই জায়গা নেয় গাড়িটি , যেটা নিয়ে তাদের কোথাও যেতে কোন অসুবিধা হয়না । এমনকি মলে গিয়ে তাদেরকে বাজার করতেও দেখেছি কারও সাহায্য ছাড়াই । বাসে , ট্রামে বা ট্রেনে ঐ চার চাকার ছোট গাড়ি নিয়ে খুব সহজেই সফর করা যায় । ভেরাভল স্টেশনে বসে ভাবছিলাম আমাদের দেশে কেন এমনটি হয়না । কারও সাহায্য ছাড়া আমাদের দেশের শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের চলাফেরা করা বাস্তবে খুবই কঠিন । শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ কেন বয়স্ক/বয়স্কা মানুষদেরও খুবই কষ্ট হয় । ইদানিং দেখা যায় ভলভো বাসে উঠার জায়গাটা কিছুটা সুবিধাজনক । বাকি বাস এবং ট্রেনে উঠার জায়গাটা এমন করা যায় নাকি যাতে শারীরিক প্রতিবন্ধী , বয়স্ক/বয়স্কা মানুষদের উঠতে কোন কষ্ট না হয় । যেমনটা দেখেছি বিদেশে । জনসংখ্যা নিশ্চয় এখান অন্তরায় নয় । যানবহনে শুধু কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন । আশা করতে পারি কি ?

পরিবর্তনের আশায়


আমার জানলা দিয়ে উত্তর দিকে তাকালেই দেখা যায় একটা পুকুর যার রাশভারী নাম কালিগঙ্গা । তাই এই পুকুরে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে প্রতিমা বিসর্জন । আমাদের ছোটবেলায় মানে ৪৫ বছর আগে এই পুকুরের ছিল ভরা যৌবন । আর এখন নানা রোগে জরাজীর্ণ । শরীর অনেকটাই শুকিয়ে গেছে । কিন্তু শোষণ বন্ধ হয়নি । দূষণের উপর আরও বাড়ছে দূষণ ।আর নানা জীবাণু পাকাপাকিভাবে আস্তানা গেরেছে । তাই যারা প্রতিমা নিয়ে আসছে তারা বেশিরভাগই জলে না নেমে নিচের সিঁড়ি (এই পুকুরে একটা বাঁধানো ঘাট আছে ) থেকেই বিসর্জন দিচ্ছে । খারাপভাবে বলতে গেলে বলতে হয় প্রতিমা ছুড়ে দিচ্ছে । প্রতিমা জলে ডুবছে না । কেউ কেউ ধাক্কা মেরে একটু দূরে পাঠানোর চেষ্টা করছে মাত্র । কিন্তু জল কম তাই প্রতিমা ভাসতে ভাসতে দূরে যেতে পারছেনা । নিয়ম মেনে পূজা করার পরে বিসর্জনটা বড়ই নিদারুন । পরদিন সকাল হতেই আসে কিছু যুবক যারা কাঠামো সমেত সব প্রতিমাই পুকুর পারে তুলে রাখে । তারপর লরি এসে সব নিয়ে চলে যায় । অর্থাৎ যারা প্রতিমা বানায় তাদের কাছে বিক্রি করে দেয় recycle হওয়ার জন্য ।
বিদেশে তো প্রতিমার বিসর্জন হয় না । বাক্স বন্দী হয়ে চলে যায় কারও বাড়িতে , পরের বছর আবার আসবে বলে । আমাদের এখানে যদি প্রতিমা জলে বিসর্জন না দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কেমন হয় ? যার কাছ থেকে প্রতিমা আনা হয়েছিল তাকেই ফেরত দেওয়া হল । শুধু প্রতিমা কদিন ব্যবহার করার জন্য তাকে তার পারিশ্রমিক দেওয়া হল । প্রতিমার জন্য খরচা তাহলে অনেকটাই কমবে কিন্তু প্রতিমা শিল্পীদের কোনরকম ক্ষতি হবে না । সমাজের কারও তো কোন ক্ষতি হবেই না বরং পুকুর , নদীর দূষণ এইজন্য কমবে । পরিবেশ দূষণও কমবে কেননা গাছ কাটা কম হবে । আমার পাশের পুকুরের মতো আরও অনেক অপরিষ্কার জলাশয় আছে যেখানে বিসর্জন হয় , সেখান থেকে আর জীবাণু ছড়াতে পারবে না । বিসর্জনের আনন্দও কিছু কমবে না । সর্বোপরি ধর্মের উপরও কোন আঘাত আনা হচ্ছে না । তাই পরিবেশের স্বার্থে এই পরিবর্তন মানা কি খুবই অসম্ভব ?

যদি পদবি না থাকত

আধুনিক যুগে যখন বিশ্বের যেকোনো খবর মুহুর্তের মধ্যে হাতের কাছে পাওয়া যায় তখনও আমরা পরে আছি জাতপাত ও ধর্ম নিয়ে । শুধু আমরা নয় বাংলাদেশ ও পাকিস্থানও পরে আছে একই অবস্থায় । স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই আধুনিক যুগেও এই তিনটি দেশ ,ধর্মের নামে বিরোধিতা করে যাচ্ছে । ইংরেজদের তৈরী করা ধর্মের নামে Divide and rule policy আজও বিদ্যমান । তাই আজও ভারতবর্ষ ও পাকিস্থান প্রতিরক্ষা খাতে যে পরিমান খরচা করে চলেছে তার কিছুটা যদি উন্নয়ন খাতে খরচা করত তাহলে দুটো দেশের অবস্থা আজ অন্যরকম হত । দুই দেশের মৌলবাদী শক্তি ও কিছু বহিরাগত শক্তি ধর্মের জিগির তুলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ বিদ্যমান রাখতে সাহায্য করে চলেছে ক্রমাগত । যেন তেন প্রকারণে ভোট যুদ্ধে জয়ী হতে মোটামুটি প্রায় সব রাজনৈতিক দলই বেছে নিয়েছে তোয়াজ নীতি । ধর্ম দিয়ে যেমন বড় গোষ্টিতে আলাদা করা হচ্ছে তেমনি জাত দিয়েও তৈরী করা হচ্ছে ছোট ছোট গোষ্টি। আর জাত ও বর্ণ বিদ্বেষ টিকিয়ে রাখতে পারলেই দেশের জনগণ কোনো কালেই এক হতে পারবে না যেটা কিছু মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী মানুষের কাম্য । এখনও অনেক শিক্ষিত আধুনিক মনস্ক মানুষ আছেন যারা জাতের উপরেই যেতে পারছেন না , ধর্মতো বাদই দিলাম । অথচ এই জাতপাতের সৃষ্টি খুব বেশি দিন আগে নয় । ঐতিহাসিকদের মত অনুযায়ী জাতের সৃষ্টি সেন বংশের রাজত্বকালে অর্থাৎ ১১৫৮-১১৭৯ সাল যখন পদবি আসে আমাদের নামের সাথে লেজ হিসাবে । উপাধি, উপনাম কিংবা বংশসূচক নামকে সাধারণ ভাবে পদবি বলা হয়। আমাদের সনাতন ধর্মে আমরা দেখতে পাই বর্ণপ্রথা যেমন ব্রাহ্মণ , বৈশ্য , ক্ষত্রিয় ও শূদ্র এই চার বর্ণকে ।সমস্ত মানবজাতির মধ্যে তখনকার দিনের সমাজের মাথারা সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে কাজের ভাগ করে দিয়েছিলেন এই চার বর্ণের মধ্যে কিন্তু উপাধি বা পদবির সৃষ্টি করেননি । এই চার বর্ণ সৃষ্টি হওয়ার আগেতো সবাই এক ছিল । যদি আমরা একটা সম্প্রদায়ের মানুষদের সাথে একটা কার্যালয়ের তুলনা করি ।যেমন একটা অফিসে কিছু লোক কাজ করে । তাদের কাজ অনুযায়ী বিভিন্ন উপাধি দেওয়া হলো । যারা পরিচালনের সাথে যুক্ত তাদের একটা উপাধি বা পদবি , যারা ব্যবসা-বাণিজ্যর সাথে যুক্ত তাদের একটা উপাধি বা পদবি , যারা রক্ষনাবেক্ষণের সাথে যুক্ত তাদের একটা উপাধি বা পদবি আর যারা কার্যালয়ের দৈনন্দিন কাজকর্মের সাথে যুক্ত তাদের একটা উপাধি বা পদবি । কার্যালয়ের লোকসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে স্বভাবতই একই উপাধি বা পদবির ধারকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে । কার্যালয়ের বিভাগ বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে উপাধি বা পদবির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক । আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও এমনি করেই উপাধি বা পদবির সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে গেল । শুধু ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই সংখ্যা প্রায় তিনশোর উপর ।একটি কার্যালয়ে বিভিন্ন পদাধিকারীর জায়গায় তাদের সন্তান সন্ততি ঠিক ওই পদেই কাজ করবে এটা ভাবাটা হাস্যকর নয় কি ? যে দুটি বেদ পরেছে তার উপাধি বা পদবি দেওয়া হলো দ্বিবেদী বা দুবে । এমনি করেই বেদী , ত্রিবেদী , চতুর্বেদীর সৃষ্টি ।অথচ এখন একই উপাধি বা পদবি নিয়ে বংশ পরম্পরায় অনেকেই আছে হয়ত বেদ পরাতো দুরের কথা দেখেনি পর্যন্ত । সব বর্ণের মধ্যেই এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায় । সমাজের মধ্যে বিষবৃক্ষ স্থাপন করা হয় হাজার হাজার পদবি বা উপাধি সৃষ্টি করে যারফলে আসে সর্বনাশা এই জাতপ্রথা । আসে জাতপাতভেদ এবং জাতপাতভিত্তিক পদবি সংরক্ষণ। এই সব হাজার হাজার পদবির উত্তরাধিকারত্ব লাভ করেছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান। তাই দেখা যায় রায়,চৌধুরী, তালুকদার, সিকদার, হালদার, মণ্ডল, বিশ্বাস, মজুমদার, খান, মলি, মুন্সি, সরকার, সরদার প্রভৃতি প্রায় সকল পেশাগত সামাজিক পদবি হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে বিভিন্ন বর্ন-উপবর্ণের মধ্যে পাওয়া যায়। এই পদবিগুলো হলো ধর্ম নিরপেক্ষ এবং একান্তভাবে বাঙালির ।মোগল ও ব্রিটিশ আমলেও তাদের স্বার্থে তৈরী হয়েছে অনেক উপাধি বা পদবি । তাই আমাদের পদবির মধ্যে এসেছে অনেক আরবি এবং ফারসি শব্দ । যেমন শিক এসেছে আরবি থেকে আর দার এসেছে ফারসি থেকে , দুটো মিলে তৈরী শিকদার উপাধি যেটা পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে পদবিতে । এরকম অসংখ্য় উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ।আবার প্রচুর পদবি আছে আঞ্চলিক । যেমন গাঙ্গুলিদের বা গঙ্গোপাধ্যায়দের উৎপত্তিস্থল বর্ধমান জেলার গাঙ্গুল গ্রাম , আবার কুশারি পদবি এসেছে কুশ গ্রাম থেকে। পদ থেকে পদবির অনেক উদাহরণ আছে কোচবিহারের রাজবংশ থেকে। যেমন রাজকীয় ডাকবিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের ডাকুয়া উপাধি দেওয়া হত। উত্তরবঙ্গে এমন অসংখ্য ডাকুয়া পদবিধারী আছেন যারা ডাকবিভাগের কর্মচারী নন । অন্য দেশ বা অন্য জাতির শব্দও আমাদের পদবিতে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়ে যেমন গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে দাম পদবি । দেখা যাচ্ছে আধুনিক যুগে উপাধি বা পদবির সাথে সামাজিক মিল খুবই কম । বিভিন্ন বর্ণের মিলন দেখা যায় প্রায় সমস্ত পেশাতে ব্যতিক্রম শুধু দেশের মাটিতে যারা পৌরহিত্য করেন তাদের পেশাতে । যতদূর জানি বৌদ্ধ ধর্মেও কোনো বর্ণপ্রথা নেই ।
যদি পদবি না থাকত তাহলে আমাদের কি কি সুবিধা ও অসুবিধা হত একটু আলোচনা করে দেখা যাক । আমাদের স্বভাবতো সবসময় ভালোর থেকে আগে খারাপটা চিন্তা করে , তাই আমরা দেখি পদবি না থাকলে আমাদের কি কি অসুবধা হতে পারে । যদি একই নামের একের অধিক ব্যক্তি থেকে থাকে তাহলে তার চিহ্নিতকরণ কি করে হবে পদবি না থাকলে ? যদি এমনটা হত first name হত আমার নাম এবং second and last name হত আমার বাবা -মা র নাম বা অন্য কিছু । তাহলে মনে হয় চিহ্নিতকরণ আরো স্পষ্ট হত । আমার চিহ্নিতকরণ মানে আমার শরীরের আকৃতি এবং আমার দোষ ও গুনাবলী । পদবির দ্বারা কি বংশ পরিচয় খুব একটা প্রকাশ পায় ? আমার তো মনে হয় না । তাহলে আসি পদবি না থাকলে কি কি সুবিধা ।
• আমার নাম দেখে আমার জাত, বর্ণ ও ধর্ম বোঝা যাবে না । কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মের ধারণা করা যেতে পারে কিন্তু জাত বা বর্ণ একদমই নয় ।
• আমার ভাষা বলতে পারে আমি কোন প্রদেশে ছিলাম কিন্তু আমার নাম নয় ।
• জাতের নাম ব্যজাতি সব বন্ধ হবে ।
• দলিত বলে আর কেউ থাকবে না ।
• অর্থনৈতিকভাবে যারা দুর্বল তারা সরকার থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা পাবে । এছাড়া আর কেউ নয় ।
• মানুষের পরিচয় হবে তার কাজের মাধ্যমে তার পদবির জন্য নয় । ভাবতে অবাক লাগে একসময় কাজের মাধ্যমে এসেছিল পদবি আর এখন পদবির জন্য আসে কাজের সুবিধা ।
• কোনো কোনো মন্দিরে এখনো যে বিধি নিষেধ আছে তা উঠে যাবে । সবার জন্য মন্দির হবে উন্মোক্ত ।
• মানুষের সাথে মানুষের আত্বীয়তার পরিধি বাড়বে ।
• পদবি মানুষের গন্ডিটা ছোট করে দেয় , তা আরো বিশাল হবে ।
• উচ্চবর্ণ এবং নিম্নবর্ণ বলে কিছু থাকবে না ।
• মানুষের সাথে মানুষের পরিচয় হবে তার ব্যবহারে ,তার শিক্ষায় ,তার বিচার- বুদ্ধির মাধ্যমে সেখানে পদবি কোনো নির্ণায়ক ভুমিকা হতে পারবে না ।
• বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করার দরকার পরবে না ।
• বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সরকারি অফিসে আবেদন করতে হবে না ।
দেব দেবীদের যদি পদবি না থাকে তাহলে আমাদের কেন ? রামায়ন – মহাভারতে অত চরিত্র ,পদবি ছাড়া চিনতে কোনো অসুবিধাই হয় না । সামান্য কিছু চরিত্রের পরিচয় আছে জন্মস্থানের নামে বা পিতার নামে যেমন পাঞ্চালী বা দ্রৌপদী । এছাড়া আগের অজস্র বিখ্যাত মানুষ ছিলেন যাদের কোনো পদবি ছিল না । যেমন কালিদাস , হর্ষবর্ধন , কাত্যায়ন , বরাহমিহির , আর্যভট্ট, পতঞ্জলি প্রমুখ । সুতরাং পদবি এসেছে অনেক পরে । নানা কারণে । সেই বিস্তারিত আলোচনায় এই মুহুর্তে যাচ্ছি না । আর এখন তো কাজের দ্বারা পদবি নির্ধারণ করা হয় না । ধরা যাক যেসকল পদবিকে পূজা করার অধিকার দেওয়া আছে তাদের মধ্যে কেউ যদি এখন বিউটি পার্লার খোলে অর্থাৎ চুল কাটে, তাহলে । আবার দেখছি কয়েকটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যারা সেবক তাদের আলাদা কোনো পদবি নেই , কোনজায়গায় ‘নন্দ’ব্যবহার করা হয় আবার কোনজায়গায় ‘দাস’ ।
আমার বিশ্বাস একটা সময় নিশ্চয় আসবে যখন জাতপাত বা ধর্মের উর্ধে থাকবে আমাদের পরিচয় ।

নেশা লাগিল রে


করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে সারা দেশ এখন আতঙ্কিত । গুটকা , পানে যারা আসক্ত তারা পড়েছে খুব মুশকিলে । নিজেদের ইচ্ছা মতো আগে যেখানে সেখানে থুথু ফেলত । এখন লুকিয়ে ফেলতে হচ্ছে কারণ ধরলেই জরিমানা । মদের দোকানও বন্ধ ।বাকী রইলো সিগারেট , বিড়ি । চলছে অবাধে কারণ যারা সিগারেট, বিড়ি খান তারা যেখানে সেখানে থুথু ফেলেন না । তাহলে ভাইরাস ছড়ানোর ভয় নেই । শুধু ধোঁয়া তো সেটা একটু নিজেদের কাছে রাখলেই কোন অসুবিধা নেই । এখন করোনার আতঙ্কে মানুষ নিজের থেকেই দূরে দূরে থাকছে তাই সিগারেট , বিড়ি খাওয়া লোকদের নিয়ে সমাজের কোন সমস্যা নেই ।কিন্তু আমরা যারা ‘ একসাথে বাঁচবো, একসাথে মরবো ’ বলে ঠিক করেছি তাদের কি হবে ? এখনও দেখছি কলেজ পড়ুয়া বন্ধুরা আগের মতন একটা সিগারেট থেকে তিন- চার জন ভাগ করে সুখটান দিচ্ছে । এক শুভানুধ্যায়ী ওদের বোঝাতে যাওয়াতে উত্তর পেল – “ আমাদের পয়সা কম তাই সবসময় ভাগ করেই খেয়ে এসেছি । কি করবো তাই এখনও ভাগ করেই খাচ্ছি । আর সিগারেট ধরানোর আগে আমরা সবাই স্যানিটাইজার দিয়ে ভাল করে হাত জীবাণু মুক্ত করে নিয়েছি । আর তাছাড়া সিগারেটের গরমে করোনা টারোনা বাঁচতে পারবে না । ” হাসবে না কাঁদবে বুঝতে না পেরে ওই শুভানুধ্যায়ী কেটে পরাটাই ঠিক মনে করলো । আরেকদিন আরেকটা ঘটনা ঘটলো আরেকজনের সাথে । তিনজন লোককে পার্কের পাশে গাছের তলায় ছায়াতে বসে সিগারেট ভাগ করে খেতে দেখল সে । সুতরাং সে তাদের করোনা নিয়ে বেশ কিচ্ছুক্ষণ বোঝাল যাতে ওরা একটা সিগারেট ভাগ করে না খায় । জানতে পারলো ওরা তিনজন রঙের কাজ করে । কিন্তু এখন কোন কাজ নেই তাই হাতে পয়সাও নেই । অনেক বলে কয়ে পাড়ার দোকান থেকে বাকিতে একটা সিগারেট পেয়েছে ।তাই তিনজনে ভাগ করে খাচ্ছে । করোনা নিয়ে ওদের কোন মাথাব্যাথা নেই । কবে কাজ পাবে সেটা নিয়েই ওরা চিন্তিত । ওই শুভানুধ্যায়ী কেটে পরাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলো ।এই নেশা শরীরের ক্ষতি করছে জেনেও অনেকে নেশা করে জানি কিন্তু এই নেশা এতো সাহসী যে করোনা ভাইরাসকে ভয় করে না বা করোনা ভাইরাস যে কতটা ভয়ঙ্করভাবে জীবনে নেমে আসতে পারে তার কোন বোধ নেই ।শুনেছি পাগলেও নিজের ভাল বোঝে কিন্তু নেশা এমন একটা জিনিস সেটা অন্য কিছু বোঝে না শুধু অনুভব করে – নেশা লাগিল রে ।

নিবেদিত প্রাণ


ক্লাসে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা “The Excursion”-এ সমাধির মানে বোঝাতে প্রফেসর উইলিয়াম হাস্টিই ছাত্রদের দক্ষিনেশ্বরে রামকৃষ্ণ দেবের কাছে যেতে বললেন । ওখানে গেলেই নাকি সমাধির মানে সবচেয়ে ভালো বোঝা যাবে । General Assembly’s Institution বা এখনকার স্কটিশ চার্চ কলেজের কিছু ছাত্র, শিক্ষকের কথা মত দক্ষিনেশ্বরে গেল রামকৃষ্ণ দেবের সাথে দেখা করতে সমাধির প্রকৃত মানে বুঝতে । সম্ভ্রান্ত বংশ , স্মার্ট , মেধাবী ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিল যার গানের গলা ছিল সত্যিই আকর্ষনীয় । রামকৃষ্ণ দেব তো তার গান শুনে মোহিত । যুক্তিবাদী সেই ছেলেটা রামকৃষ্ণ দেবের সব কথা কিন্তু বিনা বাক্যে মেনে নিত না । নানা বিষয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক লেগেই থাকত , তবুও কেন জানিনা রামকৃষ্ণ দেব ওকেই বেশি ভালবাসত । সব সময় আসার জন্য ওকে বলতো । জহুরি জহর চেনে । তাই বোধহয় সেদিন শ্রী রামকৃষ্ণ দেব চিনেছিলেন নরেন্দ্রনাথকে ,পরবর্তিতে বিশ্ব যাকে চিনেছিল বিবেকানন্দ হিসাবে । ফলসরূপ ভারতবর্ষ পেল রামকৃষ্ণ মঠ আর সমগ্র পৃথিবী পেল রামকৃষ্ণ মিশন । স্বামীজির চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সুদূর আয়ারল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে ছুটে এলেন মিস মার্গারেট নোব্‌ল, ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে নারী শিক্ষার চেতনার প্রসারে । ভারতবাসী তাকে জানলো ভগিনী নিবেদিতা নামে । শুধু সাধারণ মানুষই নয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্রের মতো মানুষরাও তার গুণমুগ্ধ ছিলেন । ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান ছিল অসীম । ভাবতে অবাক লাগে যেখানে আমাদের দেশের অনেক মানুষই স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন নিজেদের স্বার্থে , সেখানে ইউরোপের আয়ারল্যান্ড থেকে এসেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে । তাই তিনি শ্রীঅরবিন্দের কাছে ছিলেন ‘শিখাময়ী’ আর কবিগুরুর কাছে ছিলেন ‘লোকমাতা’ । ‘ডন সোসাইটি’ ও ‘অনুশীলন সমিতি’র বিপ্লবীদের কাছে নিবেদিতা ছিল তাদের একান্ত আপনজন । আমাদের দুর্ভাগ্য় যে মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই ওনাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হয় ।যেমন স্বামীজি যান মাত্র ৩৯ বছরে ।
রাজনীতি
রাজনীতি হচ্ছে সরকার পরিচালনার নিমিত্তে সমাজের ভিতর থেকে উদ্ভুত বিজ্ঞান ভিত্তিক সংস্কৃতি, যার দ্বারা একটা নির্দিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
রাজনীতির ইংরেজি “Politics”শব্দটি গ্রীক শব্দ “Politiká: Politika,” থেকে উৎপত্তি। যার সরল অর্থ, নগর বিষয়ক নীতিমালা বা বিষয, যার দ্বারা মানব গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত হয় রাষ্ট্র বা রাজ্য। যা সমাজের মানুষের মাঝে আন্ত সম্পর্ক সৃষ্টি করে ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে।
রাষ্ট্রের নীতি কেই রাজনীতি বলা হয় ।।
রাজতন্ত্র বা রাষ্ট্র চালনার জন্যে কিছু নীতির প্রয়োজন রয়েছে, সেই নীতি গুলোই হল রাজনীতি।।
রাজনীতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যদ্বারা নাগরিক সরকারের রাজনীতিকেই বোঝানো হয়, তবে অন্যান্য অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেখান মানুষের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক বিদ্যমান, সেখানে রাজনীতি চর্চা করা হয়। রাজনীতি কতৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে। রাজনীতি হলো,এমন কিছু রাষ্ট্রের নীতি বা বিধি বিধান যে বিধান রাষ্ট্রের বা জনগনের কল্যাণে নিয়োজিত থাকে,যে নীতি প্রয়োগ করলে একটি দেশের সচেতনা মূলক কার্য সম্পাদন করা যায়,তাকে রাজনীতি বলে।


ধূপকাঠি


বেশ অনেকদিন পর দেখা হোল গৌরদার সাথে। তিন বছর হোল অবসর গ্রহণ করেছে ব্যাংক থেকে । বরাবরই গৌরদা ছিল সুস্বাস্থের অধিকারী ।কিন্তু একি চেহারা হয়েছে ! চামড়া আর হাড়ের ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে । গৌরদা কোনদিন কোন নেশায় আসক্ত ছিল বলে শুনিনি । ভদ্র , সৎ চরিত্র মানুষ হিসাবে সর্বত্র পরিচিত । হঠাৎ করে স্বাস্থের এতটা পতন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে । তিনমাস Nursing Home এ শারীরিক, মানসিক আর অর্থনৈতিক লড়াই চালিয়ে সবে বাড়ি ফিরেছে । শুনলাম lung এ infection হয়েছিল । ঔষধের সাথে চলছে inhaler আর আহারের ওপর এসেছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ । কোনদিনও সিগারেট স্পর্শ করেনি কিন্তু তবুও ধূমপান জনিত কারনেই এই অসুখ । খুব ধূপকাঠি জালানোর সখ । আর তার থেকেই এই অসুখ । জলের মত বেড়িয়ে গেল তিনলাখ টাকা ।

আমরাও মানুষ


অনেক বছর থেকে দেখে আসছি ট্রেনের কামরার মধ্যে দল বেঁধে টাকা চাইতে । আবার কখন দেখছি দল বেঁধে টাকা চাইতে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ীর যাত্রীদের থেকে । সর্বোপরি দল বেঁধে পৌঁছে যেতে দেখছি সেই বাড়িতে যে বাড়িতে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে । সর্বক্ষেত্রেই বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আদায় করে অর্থ । ইচ্ছায় নয় ,মানুষ নিজেদের সন্মান রক্ষার্থেই পূরণ করে তাদের দাবি । অসন্মানের চোখে তাকায় তাদের দিকে আর মনে মনে উচ্চারণ করে তীব্র ব্যাঙ্গ -বিদ্রুপ ।আজও এই বিংশ শতাব্দীতেও । এদের সংখ্যাতো বেশী নয় , খুবই নগণ্য । তাও কেন কোন সরকার এদের সবাইকে সন্মানীয় জীবিকার সাথে যুক্ত করতে পারছে না । ইচ্ছার অভাব না অন্য কিছু ? যদি পারে তাহলে হয়ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ট্রানজেন্ডার বলে দূরে সরিয়ে রাখবে না আর কখনও উচ্চারিত হবে না তাদের জন্য অভিশাপ বা গালি – হিজড়া ।


GST


জামশেদপুর থেকে আমার স্ত্রীর ছোটবেলার এক বান্ধবী ও তার স্বামী এসেছিল । তাই গতকাল বিকালে আমরা চারজনে গড়িয়াহাট গেছিলাম টুকিটাকি কিছু কেনাকাটার জন্য । কেনাকাটার পর্ব শেষ করে সাধারণ কিন্তু শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্টে কফি খেতে ঢুকলাম । মুখরোচক কিছু খাবারের সাথে ব্ল্যাক কফি সহযোগে আড্ডা খারাপ লাগছিল না ।বিল চাইতে নিয়ে এলো কারুকার্য খচিত ছোট্ট একটা টিপট যার মধ্যে রয়েছে মুখসুদ্দি আর তার পাশে প্রিন্টেড আমাদের খাবার বিল । সাধারণত সব রেস্টুরেন্টে দেখেছি একটা ফোল্ডারের মধ্যে খাবারের বিল দিতে । তাই একটু অবাক হলাম । ক্রেডিট কার্ড দিয়েই বিল মেটালাম । ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করতে জানতে পারলাম আগে ফোল্ডারের মধ্যেই খাবারের বিল দিত কিন্তু GST চালু হওয়ার পর যাতে কেউ টিপস না দেয় তাই এইরকম ব্যবস্থা । দেশে এই অভিনব ব্যবস্থা দেখে বেশ ভালো লাগছিল মনে হচ্ছিল ইউরোপের কোন রেস্টুরেন্টে বসে আছি । টিপস দেওয়ার রীতি উঠবে কি !

রাজনৈতিক যাত্রাপালা


ছোটবেলা থেকেই অনেক নাটক আর যাত্রা দেখেছি । আমার কাছে নাটকের থেকেও যাত্রার আকর্ষণ বেশি । কেমন চার ধার খোলা, তারমধ্যে চলে অভিনয় ।বাদ্যযন্ত্র নিয়ে স্টেজের পাশে নীচে বসে, সঙ্গত করাটা আমার দারুন লাগে । সবচেয়ে ভাল লাগে যাত্রা শুরু হওয়ার আগের বাদ্যযন্ত্রের সুর । ঐতিহাসিক , সামাজিক ও রাজনৈতিক সবরকম যাত্রা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে । দেখেছি নায়ক আর খলনায়কের মিথ্যা তলয়ারের লড়াই , শুনেছি সুন্দর বাচনভঙ্গিতে মনমাতানো ভাষণ । সবার সাথে আমিও প্রচুর হাততালি দিয়েছি যখন দেখেছি নায়ক , খলনায়ককে হারিয়ে দিয়েছে বা ভাল ভাল কথায় কেউ মন ভরিয়ে দিয়েছে । কিন্তু তারপরেই দেখেছি নায়ক আর খলনায়ককে সাজঘরে বসে হাসতে হাসতে একসাথে চা , বিড়ি বা সিগারেট পান করতে । ওদের মধ্যে যে কোন বিভেদ নেই তা বুঝতে কারই কোন অসুবিধা হয় না । তাই যাত্রা হওয়ার পর দর্শকদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ তৈরি হয় না । সবাই অভিনয়টাকে উপভোগ করে ।
কিন্তু সমাজের রঙ্গমঞ্চে প্রতিদিনের যে অভিনয় তা তো দিন দিন আমাদের ভাগ করছে । বিধানসভা , লোকসভা ও রাজ্যসভা দেখতে যাওয়ার সুযোগ হওয়াতে দেখেছি , অনেক নেতাকে বিরধীপক্ষের নেতাদের সাথে হেসে গল্প করতে অথচ কদিন আগে বিভিন্ন সভাতে সেই নেতা , অপর নেতাকে সোজা বাংলায় গালাগালি করতে শুনেছি । একদম যাত্রার মত । বাইরের রঙ্গমঞ্চে একে অপরের শত্রু আর অভিনয়ের বাইরে কোন বিরোধ নেই। অথচ আমারা এই সুন্দর অভিনয়ে এতই আত্মহারা হয়ে পরি যে ভাই ভাইকে বা বন্ধু বন্ধুকে হত্যা করতেও কার্পণ্য করি না। দলের জন্য বা নেতার জন্য নিজের চিন্তাধারা বা বিবেক বুদ্ধি সব সরিয়ে রাখি । সর্বত্র তৈরি করি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ । ধীরে ধীরে একই মানসিকতার লোকজন মিলে নতুন নতুন গোষ্ঠীতে সামিল হই ।
কেন জানিনা আমার মনে হয় , আমরা যদি ভোট দেওয়ার সময় , দল না দেখে শুধুমাত্র মানুষ দেখে ভোট দিতাম বা পছন্দের কেউ না থাকলে কাউকেই ভোট না দিতাম তাহলে হয়তো খারাপ লোকদের ভোটে দাঁড় করাতে সব দলই ভয় পেত । হয়তো এই সংসদীয় গনতন্ত্রের পরিবেশ এক সময়ে বেশ কিছুটা স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠতো । শিক্ষিত , সৎ নেতাদের সংস্পর্শে আমাদের দেশ হতো অনেক সমৃদ্ধ ।


ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার


টেলিভিশন ও খবরের কাগজে ধর্ম আর রাজনীতির যুগল বন্দী শুনতে শুনতে ভাবছিলাম – আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর আধুনিক ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থা কেমন । ইন্টারনেটে হাতড়াতে বসে গেলাম । দেখলাম পৃথিবীর প্রায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২২৮ দেশের মধ্যে এখনও ৫৯ টা দেশ NON-SECULAR বা বলতে পারি NON-SECULAR দেশের সংখ্যা এখনও পৃথিবীর সমস্ত দেশের ২৬% মতো । আমাদের সাতটা মহাদেশ(continent)এর মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা(Antarctica) তে কোন জনসংখ্যা নেই আর দক্ষিণ আমেরিকা (South America ) র ১৬ টা দেশের প্রায় ৪৩ কোটির উপর জনসংখ্যার মধ্যে কোন NON-SECULAR দেশ নেই । অস্ট্রেলিয়া বা ওশেনিয়া(Australia/Oceania ) মহাদেশের ২৩ টা দেশের মোট ৪ কোটির উপর জনসংখ্যার মধ্যে ৩ (১৩%) টে দেশ কেবলমাত্র NON-SECULAR ।আর উত্তর আমেরিকা ( North America ) র ৩৩ দেশের ৫৯ কোটি উপর জনসংখ্যাতে NON-SECULAR দেশের সংখ্যা মাত্র ৫ (১৫%) । ইউরোপ (Europe ) এর ৫৩ দেশের প্রায় ৭৪ কোটির উপর জনসংখ্যার মধ্যে NON-SECULAR দেশের সংখ্যা ১২ ( ২৩%) । আফ্রিকা (Africa ) এর ৫৬ দেশের প্রায় ১৩৪ কোটির উপর জনসংখ্যার মধ্যে NON-SECULAR দেশের সংখ্যা ১৫ ( ২৭%) । আর আমাদের মাহাদেশ এশিয়া (Asia) এর ৪৭ দেশের প্রায় ৪৬৪ কোটির উপর জনসংখ্যার মধ্যে NON-SECULAR দেশের সংখ্যা ২৪ ( ৫১ %)। তাহলে এটাই দেখা যাচ্ছে যে আমরা যে মহাদেশে বাস করি সেই মহাদেশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ । কি জানি আমাদের এই মহাদেশেই বোধহয় প্রগতিশীল লোকের সংখ্যা সবচেয়ে কম বা বলা যায় মৌলবাদীদের চাপে প্রগতিশীলদের আওয়াজ ধামাচাপা পরে যাচ্ছে । কেননা রাষ্ট্র কেন ধর্ম নিয়ে চিন্তা করবে । ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার । আমার মনে হয় সারা পৃথিবীতে যেসব দেশে সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বী লোকজন কোন যুক্তি তর্ক মানে না ধর্মকে শুধু আবেগ দিয়ে চিন্তা করে সেইসব দেশেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয় ।ধর্মতো ব্যাক্তিগত ব্যাপার । যার যার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে । রাষ্ট্র কেন কোন ধর্মের ব্যাপারে মাথা গলাবে ।রাষ্ট্রর উচিৎ কখনই কোনরকম ধর্মীয় হস্তক্ষেপ না করা , কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী না হওয়া এবং কোন ধর্মকে কোন প্রকার অতিরিক্ত সুবিধা না দেওয়া ।রাষ্ট্রে কোন ধর্মভিত্তিক আইন থাকা উচিৎ নয় । সকলের জন্য থাকবে সমান অধিকার বা সমান আইন । রাষ্ট্র সবসময় ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত সমাজ তৈরি করবে । রাষ্ট্র কক্ষন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পক্ষে কথা বলবে না এবং নির্দিষ্ট ধর্মের অনুকূলে কাজ করবে না ।তাহলেই তো আমরা পৃথিবীতে একটা সুন্দর ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত সমাজ পেতে পারি । আশা রাখি যেসব দেশ এখনও এই আধুনিক পরিবেশে NON-SECULAR দেশ হিসাবে আছে , সেইসব দেশের প্রগতিশীল মানুষজন সেইসব দেশকে ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত দেশ বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বানাতে সাহায্য করবে ।

কেয়ার টেকার

আমার ছোটবেলার এক বন্ধু এই দুদিন আগে জানাল ও চাকরী থেকে অবসর নেওয়ার পর পাড়াতেই একটা ছোট অফিস খুলেছে যার নাম দিয়েছে ‘কেয়ার টেকার’ । নামটা শুনে একটু অবাক হলাম। এ আবার কিরকম কাজ । তাই দেখতে চলে গেলাম । ছোট অফিস । দুটো টেবিল সাথে কিছু চেয়ার , দুটো মোবাইল ও একটা ল্যাপটপ । দেখলাম আমার বন্ধুর সাথে আরও একটা পাড়ার ছেলে বসে আছে । আমাকে দেখেই ওরা দুজনে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল । আমি আরাম করে বসলাম । জানতে চাইলাম ওরা কি কাজ করছে । ওদের কথা অনুযায়ী যাদের দেখাশুনা করার প্রয়োজন আছে এবং কাছে দেখাশুনা করার কেউ থাকে না তাদের সাথে ওরা সমস্ত রকম দেখাশুনা করার কন্ট্রাক্ট করে । সেটা হতে পারে তিনমাস / ছয়মাস বা এক বছরের । এক মাসের নোটিস দিয়ে কেউ কন্ট্রাক্ট শেষ করতে পারে আবার এক মাস আগে খবর দিয়ে কন্ট্রাক্ট বাড়াতেও পারে । এর জন্য উভয় পক্ষ একটা এগ্রিমেন্টে সাইন করে । বিভিন্ন ধরনের কন্ট্রাক্ট আছে । যার যেটা পছন্দ সে সেটা করতে পারে ।অনেকটা A.M.C র মতো । ওখানে যন্ত্রকে ভাল রাখার জন্য কন্ট্রাক্ট হয় আর এখানে মানুষকে ভাল রাখার জন্য কন্ট্রাক্ট হয় । ওরা দেখাল কিছু এগ্রিমেন্ট । দেখলাম কারও ছেলে তার বাব -মার জন্য কন্ট্রাক্ট করেছে । তারা কিছুদিনের জন্য বাইরে যাছে তাই তাদের বাবা -মাদের দেখাশুনা করার জন্য ওদের সাথে কন্ট্রাক্ট করেছে । কোন আত্বীয় স্বজনের উপর দায়িত্ব দেয়নি ।একজন সন্তান তার বাব মাকে যেমনভাবে দেখাশুনা করে ওরাও নাকি তেমনিভাবে দেখাশুনা করে । তার জন্য ওরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক নেয় । অনেক ছেলে মেয়েকেই বাধ্য হয়ে বাবা মাকে ছেড়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য দূরে যেতে হয় । ওদের এই প্রতিষ্ঠান যখন তার বাব মার সমস্ত দেখাশুনা করে তখন তারাও নিশ্চিন্তে দূরে গিয়ে ভালভাবে কাজ করতে পারে । অনেক পরিবার আছে নিঃসন্তান এবং নিজেরাও সমস্তকিছু দেখাশুনা করতে পারেনা অথচ কোন আত্বীয় স্বজনের উপরও নির্ভর করতে চায়না । এরকম ধরনের পরিবার ওদের সাথে কন্ট্রাক্ট করে । যেহেতু দেখাশুনার পরিবর্তে পারিশ্রমিক নেওয়া হয় তাই উভয় পক্ষের কোন বাধ্যতা বা দায় থাকে না ।বিদেশের অনেক দেশে বয়স্ক বা বয়স্কাদের দায়িত্ব নেয় সরকার কিন্তু আমাদের দেশে সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের তাই এরকম প্রতিষ্ঠান খুবই প্রয়োজন । ভাল লাগলো ওদের চিন্তাধারাকে ।

এছাড়া কেউ একাকীত্ব অনুভব করলে শুধু ওদেরকে একটা ফোন করতে হবে ।ওদের কাজ হল ওনার একাকীত্ব দূর করা বা দরকার হলে দেখাশুনা করার দায়িত্ব নেওয়া । প্রথমে ওনার একাকীত্ব কাটাতে বা ওনাকে আনন্দে রাখতে কি প্রয়োজন তা জানবার জন্য ওদের অফিস থেকে একজন পৌঁছে যাবে ওনার বাড়িতে এবং তার সাথে কথা বলে বুঝে নেবে কি করলে তাকে একাকীত্ব থেকে দূরে রাখা যাবে । তার মুল সমস্যাটা কি এবং তার উৎস কোথায় ? একেকজনের একাকীত্ব একেকরকম । সঙ্গিহীন লোকজনই বেশী একাকীত্ব অনুভব করে । আবার এরকমও দেখা যায় যারা অন্যদের বিশ্বাস কম করে তারা বেশিকরে একাকিত্বে ভোগে । তবে আমার মনে হয় সব মানুষেরই একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা অনুভুব করা একান্ত প্রয়োজন । কারণ নিঃসঙ্গতাই নিজেকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করে । নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ব অনেকসময় বিভিন্ন শিল্পের জন্ম দেয় , নতুন নতুন সৃষ্টি করতে সাহায্য করে । এককথায় বলা যায় নিজের ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলে । কেউ যদি এই ইচ্ছাকে জাগিয়ে না তুলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তখনই আমার বন্ধুর কাজ শুরু হয় । ওরা প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখে কোন বাড়িতে কে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে । তার সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে । প্রথমেই তাকে বোঝাতে চেষ্টা করে বাস্তববাদী হতে । ওরা বোঝায় যে আশেপাশের সব প্রিয়জনেরা সব সময় পাশে থাকবে এটা কখনই সম্ভব নয় । সবার জীবনেই প্রিয় মানুষজনের সাময়িক বা পাকাপাকিভাবে বিচ্ছেদ ঘটতে বাধ্য । তাই সবার উচিৎ মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্বকে আঁকড়ে না ধরে , নিজের পছন্দের কোন কাজ নিয়ে এগিয়ে চলা । মোট কথা নিজের সৃজনশীলতাকে ঝালিয়ে নেওয়া তা সেটা পশু- পাখি পালন , ফুল গাছ দেখাশুনা করা , বই পড়া , কবিতা বা গল্প লেখা যাই হোক না কেন । মোদ্দা কথা নিজেকে কোন না কোন কাজে ব্যস্ত রাখা । যারা ক্লাবে গিয়ে বা কোন সংগঠনের সাথে একটা বড় সময় ব্যহত করে তারা খুব একটা একাকীত্ব অনুভব করে না । কিন্তু যারা একা থাকে কিন্তু বাড়ির থেকে খুব একটা বেড়তে পারেনা বা লোকের সাথে মিশতে পারে না তারাই বেশী একাকীত্ব অনুভব করে। আমার বন্ধু জানতে পারলে দলবল নিয়ে ওনার বাড়িতে উপস্থিত হয় । প্রথমেই ওনাকে চেষ্টা করে অনলাইন ফ্রেন্ডলি হতে । যাতে ওনি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন তার ট্রেনিং দেওয়া হয় এবং উৎসাহিত করা হয় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সময় কাটাতে । যতক্ষণ না ওনি সড়গড় হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত চলে ট্রেনিং । তারপর তাকে শেখান হয় কি করে অনলাইনে সব কিছু কেনা যায় এবং ইলেকট্রিক বিল , ফোনের বিল , প্রোপার্টি ট্যাক্স ইত্যাদি কিভাবে পেমেন্ট করা যায় ঘরে বসে । যতদিন না ওনি পুরাপুরি শিখতে পারছেন ততদিন আমার বন্ধুর অফিসের কোন ছেলে প্রতিদিন যায় ওনার কাছে । এরপরেও যদি একাকীত্ব না কাটে তাহলে আমার বন্ধু ওনার সাথে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয় । অনেক সময় ওরা দুই বা অধিক একাকীত্ব অনুভবকারিদের এক অপরের সাথে মিলিয়ে দেয় । একটা নতুন ধরনের সামাজিক সেবার কাজ । আস্তে করে আমার বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম -এটা কি শুধু সামাজিক সেবা না এই কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিক নেওয়া হয় ? ওরা জানাল যারা গরীব তাদের কাছ থেকে ওরা কিছুই নেয় না কিন্তু যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল তাদের কাছ থেকে ওরা পারিশ্রমিক নেয় । আর সবাই খুশী মনেই পারিশ্রমিক দেয় কারণ ওরা সবসময় থাকে একাকীত্বের বন্ধু হিসাবে ।

যাদেরকে ওরা দেখাশুনা করে তাদের সবাইকে নিয়ে ওরা বেড়াতে যায় । কক্ষন কাছে একদিন বা দুদিনের জন্য বা কক্ষন দুরে বেশ কিছু দিনের জন্য । ওরা ওনাদের শরীর অনুযায়ী ব্যায়াম শেখায় কারণ মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যায়াম শরীর থেকে এন্ড্রোফিন নামক হরমন নিঃসৃত করে যা মনকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো রাখতে সাহায্য করে । এখন পর্যন্ত প্রতিটা ক্ষেত্রেই ওরা সাকসেস হয়েছে । ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগছিল । কিন্তু আমার ওদের কাছে একটাই প্রশ্ন ছিল যে খোঁজ পেয়ে ওরা যখন কারও বাড়িতে যায় তখন সবাই ওদের গ্রহণ করে কিনা ? যারা ওদের ব্যাপারে জানে এবং ওদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের বেলায় কোন অসুবিধা হয় না । কিন্তু যারা ওদের ব্যাপারে জানে না তাদেরকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কনভিন্স করানো হয় । খুব কম লোক এখন পর্যন্ত ওদের ফিরিয়ে দিয়েছে । কেননা ওরা সব রকম সাহায্য করতে এগিয়ে আসে । যাদের লোকবল নেই তাদেরকে ডাক্তার দেখানো , হসপিটালে নিয়ে যাওয়া , কারও মৃতদেহ শ্বশানে নিয়ে যাওয়া সব কিছুই ওরা করে । ওদের লিফলেট আছে যার মধ্যে বাংলা , ইংরাজি আর হিন্দিতে ওদের সমন্ধ্যে বিস্তারিত লেখা আছে । আছে যোগাযোগ করার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার । এছাড়াও আছে বিভিন্ন নামকরা লোকদের প্রশংসা পত্র । যখন ওরা খবর পায় তখনই পৌঁছে যায় ওদের লিফলেট সঠিক মানুষের কাছে । ছেলে বা মেয়ে উভয়ের জন্যই ওরা কাজ করে । ওদের এই কাজের সাথে বেশ কিছু ছেলে ও মেয়ে যুক্ত আছে । আমার তো খুব ভাল লাগছিল শুনে ।ওদের অফিসে ঢোকার সময় খেয়াল করিনি , বেড়নোর সময় দেখলাম ওদের অফিসের সামনে খুব বড় বড় করে লেখা আছে –
একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা হচ্ছে মানসিক সমস্যা। প্রথমদিকে নজর না দিলে আস্তে আস্তে এই সমস্যাটি বিশাল আকার ধারন করবে । তাই সবসময় মনে রাখতে হবে একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতাকে সমস্যা না ভেবে মানসিকভাবে একে দূর করতে হবে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করতে হবে ।

করোনা জয়ী এক মানুষের কথা


বয়স ৬৬ বা ৬৭ বছর , পেশা -ব্যবসা , রাজনীতির সাথে সরাসরিভাবে যুক্ত । বাড়ি দক্ষিণ কলিকাতা । নিজেদের বাড়ি , যৌথ পরিবার । ডাইবেটিস আছে , প্রত্যেকদিন ইনসুলিন নিতে হয় । হটাৎ করে খাওয়ার ইচ্ছাটা কমে গেল । শক্ত খাবার খেতে একদমই ইচ্ছা করছিল না । তার ফলে শরীর দুর্বল লাগতে লাগলো । ডাক্তার দেখাতে ওনি কিছু রুটিন টেস্ট করতে বললেন । কিন্তু টেস্টের রিপোর্টে কিছুই পাওয়া গেল না । শরীর বেশ দুর্বল হতে লাগলো ।ডাক্তার এবার কোভিড টেস্ট করতে বললেন । বেলভিউতে জানা শোনা ছিল তাই টেস্টের জন্য ওখানেই বলা হলো । ২/৬ তারিখ বেলভিউ লোক পাঠিয়ে বাড়ি থেকে লালারস সংগ্রহ করে নিয়ে গেল । তারজন্য চার্জ নিল ৪৫০০ টাকা । ৫/৬ তারিখ মেল করে ওরা জানিয়ে দিল রিপোর্ট পজিটিভ । এবার আসলো থানার থেকে ফোন আর আসলো স্বাস্থ্যভবন থেকে । জানাশোনা থাকায় সেদিনই ভর্তি হয়ে গেল বাঙ্গুর হসপিটালে । হসপিটাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে গেল। চলল চিকিৎসা । ঔষধের সাথে সাথে মাঝে মাঝেই চললো গরম জল খওয়া । এখানেও অন্য ঔষধের সাথে রইলো ভিটামিন ট্যাবলেট । কিন্তু একটা ছোট্ট সমস্যা দেখা দিল । বাঙ্গুর হসপিটালে বিকালে সবাইকে চা দিত কিন্তু সকাল বেলা চা দিত না । সকালে চা না পেলে অনেকেরই হয় পটি করার সমস্যা , আর যাদের একটু চায়ের নেশা আছে তাদেরও সকালবেলার চা চাই । সব সমস্যারই আছে সমাধান । ওনি একটা ইলেকট্রিক কেটলি আনালেন । ব্যাস হয়ে গেল সমস্যার সমাধান । ওনার ওয়ার্ডে ২৮ টা বেড ছিল । ওনি নিজেও চা খেতেন আর অনেককে খাওয়াতেন । গরম জল দিতে দেরী করলে ওনার কেটলি করতো সেই সমাধান । শুধু নিজের জন্য না , ওনি যার প্রয়োজন তার জন্যই করতেন । সবাই সাথে ভালই সময় কাটছিল । যেহেতু ওনার কোন উপসর্গ ছিল না , ১০ দিন বাদে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দিল । রিপোর্ট আসলো নেগেটিভ । সবচেয়ে যেটা ভাল খবর তা হলো বাড়ির আর কাউকেই এই ভাইরাস আক্রমণ করতে পারেনি বা আক্রমণ করে কাবু করতে পারেনি ।

করোনা জয়ী আরেক মানুষের কথা


বয়স ৩৮ , ব্যাঙ্ক কর্মী , স্বামী – স্ত্রী ভাড়া থাকেন দক্ষিণ কলকাতার এক আবাসনে । গত ২০ শে জুন শনিবার দেখা দিল সর্দিকাশি সাথে জ্বর ( ১০০ ডিগ্রি থেকে ১০১ ডিগ্রি ) । ঘরে ছিল ক্যালপল । খেয়ে নিলেন । কিছুক্ষণের জন্য জ্বর কমলো কিন্তু আবার আসলো । সঙ্গে মাথা ব্যাথা , গা হাত পা ব্যাথা , সর্দিকাশি এবং দুর্বলতা । এইভাবে চলল রবিবার অবধি । সোমবার সকালে অর্থাৎ ২১/৬ তারিখ পাড়ার ক্লিনিকের এক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলো ।ওনি পাঁচ দিনের ঔষধ দিলেন আর বললেন যদি উপসর্গ না কমে তাহলে ছয় দিনের মাথায় কোভিড টেস্ট করাতে ।যেহেতু জ্বর ১০২ ডিগ্রি থেকে কিছুতেই নামছিল না তাই বাধ্য হয়ে ওনারা ২৭/৬ তারিখ এলগিন রোডে সুরক্ষাতে যান কোভিড টেস্ট করাতে । আধঘণ্টা সময় লাগলো আর টেস্টের জন্য লাগলো ২২৫০ টাকা।পরেরদিন মেলে রিপোর্ট আসলো – পজিটিভ । কিন্তু একটা ভাল জ্বর কমে আসলো । অবশ্য মাথা ব্যাথা , গা হাত পা ব্যাথা , সর্দিকাশি এবং দুর্বলতা রয়ে গেল ।রিপোর্ট পাওয়ার পর ডাক্তার বাবুর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হল এবং রিপোর্টটা ওয়াটস অ্যাপে ডাক্তার বাবুকে পাঠিয়ে দেওয়া হল । ডাক্তারবাবু অ্যান্টিবায়োটিক , ক্রোসিন , ভিটামিন আর সর্দিকাশির জন্য ঔষধ দিলেন । যেহেতু শ্বাসকষ্টের কোন অসুবিধা ছিল না তাই ডাক্তারবাবু ১২/৭ অবধি বাড়িতেই থাকার জন্য লিখে দিলেন । ২৯/৬ তারিখ স্বাস্থ্য ভবন থেকে ফোন করে সব জানতে চাইলো – যেমন বাড়িতে কে কে আছে , কটা ঘর , আলাদা টয়লেট আছে কিনা , শরীরে কি কি অসুবিধা আছে এইসব । যেহেতু ওনারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থাকেন , আলাদা ঘর এবং আলাদা টয়লেটের সুবিধা আছে তাই স্বাস্থ্য ভবন , কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের মাধ্যমে ওনাদের মেসেজ করে অনুমতি দিলেন বাড়িতে থাকার । পরেরদিন অর্থাৎ ৩০/৬ তারিখ লোকাল মিউনিসিপালিটি থেকে বাড়িতে লোক আসলো খোঁজ নিতে আর তখনই সবাই জানতে পারলো । বাকি আবাসিকরা শুরু করলো ঝামেলা করতে যাতে ওনি ওখান থেকে চলে যান । ওনার কাছে বাড়িতে থাকার অফিশিয়াল অনুমতি থাকাতে ঝামেলাটা বেশি দূর গড়ালো না । পাড়ার ছেলেরা এসে কিছু বাজার করে দিয়ে গেল । ভদ্রলোক তো প্রথম থেকেই আলাদা ঘরেই থাকছিলেন , আলাদা টয়লেটও ব্যবহার করছিলেন এবং নিষ্পত্তিযোগ্য ( disposable ) থালা ,বাসনে খাওয়া দাওয়া করছিলেন ।কিন্তু একটা অসুবিধা হচ্ছিল যে ওনাদের বাড়ির ময়লাটা কর্পোরেশনের গাড়িতে ফেলার জন্য কেউ নিতে চাইছিল না । যদিও প্রতিদিন সবার বাড়ির থেকে ময়লা নিয়ে গিয়ে কর্পোরেশনের গাড়িতে ফেলার জন্য আবাসন থেকে লোক ঠিক করা ছিল । যাইহোক এক্সট্রা চার্জ নিয়ে কর্পোরেশন থেকে নিয়ে যেতে রাজি হলো ।কষ্ট করে কোনরকমে ১৪ দিন কাটল । তারপর ওনার আর কোন উপসর্গ ছিল না ।১৩/৭ তারিখ কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ও লোকাল থানার সাথে ফোনে যোগাযোগ করে সব জানানো হলো । দুই জায়গার থেকেই ওনাকে অনুমতি দেওয়া হোল বাইরে বেড়নোর । ১৪/৭ ওনি পিয়ারলেস হসপিটাল থেকে আবার টেস্ট করলেন নেগেটিভ আসলো । যদিও ICMR এর নির্দেশ মতো আর টেস্ট করার দরকার ছিল না । এর মাঝে সবচেয়ে যেটা ভাল খবর তা হলো ওনার স্ত্রী বরাবরই সুস্থ ছিলেন এবং এখনও আছেন । এবার আসি ওনার হোল কি করে ? ব্যাঙ্কে কাজ , বিভিন্ন লোক আসছে কাজে , বুঝতেও পারেননি কখন কার থেকে সংক্রমিত হলেন ।কাজের মাঝে সবসময় খেয়ালও থাকে না স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ।


করোনা আতঙ্ক


আনন্দেই কাটছিল দিনগুলো আমেরিকার সল্টলেকে । করোনা আতঙ্কের প্রভাব ওখানে তেমনভাবে অনুভব করিনি । রাস্তাঘাটে , মলে , দোকানে বেশীরভাগ কাউকে মাস্ক পড়তেও দেখিনি । কদাচিৎ রাস্তায় দেখেছি কাউকে মাস্ক পড়তে । যেটুকু আতঙ্ক হচ্ছিল তা খবর পড়ে । আগে থেকেই আমাদের দেশে ফেরার দিন ঠিক ছিল ৪ই মার্চ ।ছেলে বেশ কিছু মাস্ক আর স্যানিটাইজার কিনে এনে দিল ।সল্টলেক সিটি থেকে আমরা প্রথমে যাব লসএঞ্জেলেস , তারপর ওখান থেকে দোহা আর দোহার থেকে কোলকাতা । ছেলে বার বার করে বলে দিল মাস্ক বেশ কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর চেঞ্জ করবে আর মুখে , নাকে , চোখে , কানে হাত দেওয়ার আগে পজিটিভলি স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবে । এমনকি টয়লেটে যাওয়ার আগে এবং পরে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবে। চার তারিখ ভোর বেলা সল্টলেক সিটি এয়ারপোর্ট পৌছালাম । ভালই ভিড় ছিল । কিন্তু কাউকে মাস্ক পড়তে দেখলাম না । তাই আমরাও চাইলাম না ‘ অড ম্যান আউট ’ হতে । সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম লসএঞ্জেলেস ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট । ওখানেও কাউকে দেখলাম না মাস্ক ব্যবহার করতে । ডোমেস্টিক থেকে হেঁটে হেঁটে আসলাম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে । ১০ মিনিটের হাঁটা পথ ।পৃথিবীর অনেক জায়গার এয়ারপোর্টে ট্রলি নিতে কোন পয়সা লাগে না কিন্তু ওখানে অর্থাৎ আমেরিকার ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টে ছয় ডলার লাগলো ট্রলি নেওয়ার জন্য । ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সব এয়ারলাইন্সের কাউন্টার দোতলায় । জিনিসপত্র নিয়ে লিফটে করে দোতলায় পৌছালাম । বিশাল এরিয়া । এবার দেখলাম অনেককে মাস্ক পরে থাকতে । বিশেষ করে চীন দেশীয় মানুষজনকে । একটা খালি জায়গা দেখে বসলাম । একটু একটু ভয় হচ্ছিল । কাউকে বেশী ঢেকে বসে থাকতে দেখে মনে হচ্ছিল করোনা রুগী । ভয় হচ্ছিল কিন্তু মনে মনে দুজনে একটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত না ধুয়ে কিছুতেই মুখে , নাকে , চোখে , কানে দেবো না । এই রোগটা যে হাওয়ায় ওরে না সেটা আমরা পড়েছিলাম । তাই আর মাস্ক পড়লাম না । লসএঞ্জেলেস থেকে দোহা আসার সময় প্লেনে পাশে এক ইরানি মহিলা মাস্ক পরে বসেছিলেন । ভাল ভাবে লক্ষ করছিলাম ওনার সর্দি, কাশি আছে কিনা ? আমার স্ত্রী কায়দা করে একবার ওনার গায়ে টাচ করে দেখে নিল জ্বর আছে কিনা । এবার আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম । জানিনা ওনিও আমাদের লক্ষ করছিলেন কিনা ? দোহাতে আমাদের হাতে খুব কম সময় ছিল । তাই সিকিউরিটি চেক করে সোজা পৌঁছে গেলাম প্লেনে উঠবার জন্য । আমরা ছাড়া প্রায় সব্বাইই মাস্ক পরে ছিল । মাস্কাটে কাজ করে মেদিনীপুরের একটি ছেলে আমাদের পাশে বসেছিল । দেখে সুস্থই মনে হচ্ছিল । কলকাতায় নেমে সব ডিটেলস দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করতে হল তারপর হোল স্ক্রিনিং টেস্ট । ‘ ওকে ’ ফর্ম নিয়ে যেতে হোল ইমিগ্রেশনে । তারপর লাগেজ নিয়ে কাস্টম চেক সেরে বাড়ি । ৬ তারিখ ভোর হয়ে গেল বাড়ি পৌছাতে । এখানে এসে টিভি আর খবরের কাগজ পরে মনে হচ্ছে সবাই দারুণ আতঙ্কে আছে । ওদেশের মানুষজন যথেষ্ট সচেতন তবুও এই রোগ বাড়ছে আর আমাদের দেশে এখনো বেশীরভাগ মানুষ হাত না ধুয়েই সব করছে , এখনও রাস্তায় নির্দ্বিধায় থুথু ফেলছে । আমাদের দেশে এটা কি মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে তার ধারণাই নেই । মুখে সব সময় মাস্ক পড়ে থাকছে কিন্তু যেটা বেশী দরকার মুখে , নাকে , চোখে , কানে হাত দেওয়ার আগে পজিটিভলি স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া সেটা মানছে না । খুব দরকার না থাকলে বাড়ির বাইরে না যাওয়া । আমরা তো কাজের লোককেউ আসতে মানা করে দিয়েছি । সবার সহযোগিতা ছাড়া এই মহামারী আটকানো সম্ভব না ।

যাতে আর কারও জীবনে না ঘটে


অনেকদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে যে ঘটনা ঘটেছিল তার পুনরাবৃত্তি আর যাতে কারো সাথে না ঘটে তাই এ লেখনী ।
মথুরা বাস ডিপোতে আমার এক বন্ধু দূরপাল্লার বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল । বাস আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে তাই ও কিছুটা দূরে ছায়াতে ওর জিনিষ নিয়ে বসেছিল । আমার বন্ধুটি যথেষ্টই চটপটে বা স্মার্ট ছিল । ওর কাজের জন্য প্রায়ই ওকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। এর আগেও ও মথুরা এসেছে । কিছুক্ষণ বাদে একজন বয়স্ক লোক একটা ব্যাগ নিয়ে এসে ওর পাশে বসলো । কিছুটা সময় যাওয়ার পর ঐ লোকটি হিন্দিতে আমার বন্ধুকে বললো , “বেটা , আমার জিনিষগুলো একটু দেখবে ? আমি একটু ডিপোর অফিস থেকে আমার বাসের খোঁজ নিয়ে আসি।“ আমার বন্ধুটি হেসে হিন্দিতেই উত্তর দিল,”নিশ্চয় । আমার বাসের জন্য বেশ কিছুক্ষন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে । আপনি নিশ্চিন্তে যান”। লোকটি তার জিনিষ রেখে চলে গেল খোঁজ করতে । একটু বাদে ফিরে এসে জানালো তার বাসেরও দেরী আছে ।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর লোকটি আবার জিনিষ রেখে যেতে চাইলো । আপত্তি করার কোন কারণ না থাকায় আমার বন্ধুটি সন্মতি দিল ।কিছু সময় পরে লোকটি ফিরে আসলো । মনে হচ্ছিল খুব হাঁপাচ্ছে । বললো বাসওয়ালা ঠিক করে কথাই বলে না । আমার বন্ধুটির কাছে জল ছিল । ওনাকে জল এগিয়ে দিল । ওনি ধন্যবাদ জানিয়ে ঢক্ ঢক্ করে বেশ কিছুটা জল খেলেন । সময় কাটানোর জন্য মামুলি কিছু কথাবার্তা হলো দুজনের মধ্যে । এমনি করে আরও কিছুটা সময় পার হোল । আবার লোকটি যেতে চাইলো খোঁজ নেওয়ার জন্য । আমার বন্ধুটির খারাপ লাগছিল । ও বলল, “ তাওজি , আপনি বসুন । আপনাকে আর কষ্ট করার দরকার নেই । আমি যাচ্ছি । আপনি আমার জিনিষগুলো দেখুন । আপনি আমায় বলুন তো কি খোঁজ করতে হবে?” “ ঠিক হ্যায় বেটা । যাও । ভগবান তোমার ভাল করবে ।“
সব কিছু ভাল করে শুনে নিয়ে আমার বন্ধুটি খোঁজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ডিপোর অফিসে গেল । কয়েকজনের পিছনে লাইনে দাঁড়ালো । ভাল করে সব খোঁজ নিতে একটু সময় লাগলো । বয়স্ক মানুষটাকে আর কষ্ট করতে হবে না এই ভেবে ওর ভাল লাগছিল । তাড়াতাড়ি পা চালালো । আরে : লোকটি গেল কোথায় ? চারিদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো । কোথাও লোকটির দেখা নেই । হঠাৎ মনে পড়লো ওর নিজের জিনিষের কথা । নেই , কোথাও নেই । বাস ডিপোতে এদিক ওদিক যারা দাঁড়িয়ে ছিল সবার কাছে খোঁজ করলো । কেউ সদুত্তর দিতে পারলো না । বুঝতে পারলো বোকা বানিয়েছে । মনটা এই ভেবে খারাপ লাগলো যে অচেনা লোককে আর উপকার করতে মন বাঁধা দেবে ।

আমি শুধু আমার জন্য

আমাকে আমার মত থাকতে দাও , আমি কারো কথায় নিজেকে চেঞ্জ করবো না – না । । প্রতিদিন পাড়ায় পাড়ায় কর্পোরেশনের গাড়ি প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে ময়লা নিয়ে যায় । কিন্তু তবুও কিছু লোক ময়লা রাস্তায় বা পুকুরে ফেলবে । কিছুতেই রাস্তা বা পুকুর পরিস্কার রাখতে দেবে না । আমাদের বাড়ির পাশের একটা পার্ক খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হলো । ঘটা করে উদ্বোধনও হলো ।কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আমাকে আমার মত থাকতে দাও টাইপের মানুষের যন্ত্রনায় পার্কটি তার সোন্দর্য হারাতে বসলো । দোলনা ভাঙ্গলো , পার্কের মধ্যে খাবার খেয়ে খালি প্যাকেট ওখানেই ফেলতে লাগলো । ফলসরূপ সুন্দর সবুজ ঘাস তার রূপ হারালো আর বাচ্চারা হারালো তাদের আনন্দের কিছু উপকরণ । আর আমরা যারা ট্যাক্স দিই তাদের একটা বড় ট্যাক্সের অংশ নষ্ট হলো । রক্ষনাবেক্ষনের দায় যেন সরকারের আমাদের বিন্দুমাত্র নয় । নিজেদের বাড়ির বাইরের অংশেও তো আমাদের সবার ভাগ আছে । যা সরকারের তাইতো আমাদের । স্বাধীনতার এত দিন পরও কেন আমরা আমাদের দেশকে আমাদের নিজেদের বাড়ি হিসাবে মনে করতে পারছিনা আর দেশের মানুষকে ———— থাক ।


আমার প্রিয় আরমাপুর

আমার জন্ম গ্রহনের পর আজ অবধি পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছে ৬২ বার । এর মধ্যে বিভিন্ন প্রয়োজনে এবং চাকরির সুবাদে ভারতবর্ষের অনেক জায়গার দুর্গা পুজা দেখার ও সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছে আমার । এমনকি ইউরোপের প্রবাসী বাঙালিদের সান্নিধ্যেও দুর্গা পুজার আস্বাদ গ্রহণ করেছি। কিন্তু যখন খবর পেলাম আরমাপুরের পুজার এবার ৭৫ বছর , মনটা এক ছুটে পার হয়ে গেল অনেকগুলো বছর । এক এক করে মনে উঁকি মারতে লাগলো সান্ধ্য সন্মিলনি বিদ্যালয় , মিলন মন্দির, নেতাজি ক্লাব ,পবিত্রদার চায়ের দোকান আর ভেসে উঠতে লাগলো অসংখ্য সুন্দর ভাললাগা বিভিন্ন মুহূর্ত যা আজও আমাকে আনন্দ দেয় । তখন সবে কৈশোর পার হচ্ছি , প্রচুর এনার্জি , প্রচুর বন্ধু -বান্ধব। আরমাপুর এস্টেটকে তখন বাংলারই একটা অংশ বলে মনে হত ।তখন ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের অধীনে একমাত্র আরমাপুরেই ছিল বাঙলা স্কুল । সেই সময় এই সান্ধ্য সন্মিলনি বিদ্যালয় রীতিমত গমগম করত ছাত্র ছাত্রিদের উপস্থিতিতে ।আর সন্ধ্যা বেলা লাইবেরিতে বই ও কাগজ পরার সাথে সাথে চলত আড্ডা । পুজার দু – তিন মাস আগে থেকে চলত নাটকের রিহার্সাল । আরমাপুরে তখন তিন-চারটা নাটক ও যাত্রার দল ছিল। প্রতিদিন দুর্গাপূজা মণ্ডবে সন্ধ্যাবেলা নাটক ও যাত্রা দেখাই ছিল দর্শনার্থীদের কাছে প্রধান আকর্ষণ । দেখেছি পুজার সময় কানপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে ভিড় জমাতো আরমাপুর এস্টেটে পুজার ভোগ আর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আকর্ষণে । আমরা মানে আমদের নেতাজি ক্লাবের সদস্যরা পুজার সময় তৈরি করা নাটক নিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙলা একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে যেতাম আবার যেতাম ফুটবলের দল নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে। কারণ তখন আমাদের এই নেতাজি ক্লাব কানপুরের ‘এ’ ডিভিশন ফুটবল লীগে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ।
ছোটবেলা থেকে আরমাপুরে আমি বড় হইনি । ভাগ্য আমাকে কৈশোরে উপহার দিয়েছিল কটা বছর আরমাপুরে থাকার । এই কটা বছরে এখানকার অপরিচিত মানুষজন হয়ে উঠেছিল আমার একান্ত আপন । আমার সব সময়ের সাথী । মনে হচ্ছিল ছোটবেলা থেকেই এখানে বড় হয়েছি। বেশ কিছু ভাল বন্ধু পেয়েছিলাম । তাই জীবনটা তখনকার ‘ছোট নহর ’ ও ‘বড় নহরের ’ পরিষ্কার টলটলে জলের গতির সাথে দৌড়াচ্ছিল । চার দেওয়ালের মধ্যে কখনও ছিলাম না আবদ্ধ । কেউ যদি আমায় আমার জীবনী লেখতে বলে তাহলে অর্ধেক পাতা ভরে যাবে কানপুরের প্রতিটা মুহূর্তে যা আমার সাথে আমৃত্যু পর্যন্ত থাকবে। বলতে দ্বিধা নেই এই ৭৫ বছরের পূজা মণ্ডবে আমি শারীরিকভাবে না থাকলেও থাকবো মানসিকভাবে । প্রথাগতভাবে নয়, আন্তরিকভাবে কামনা করি এই ৭৫ বছরের পূজা সমগ্র আরমাপুরবাসীর কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকুক।

ভারতবর্ষে কানপুর খ্যাত শিল্পনগরি হিসাবে। এখানে ভারত সরকারের আনেকগুলি Ordnance Factory আছে। তারমধ্যে তিনটি অস্ত্র কারখানা কানপুরের কালপি রোডের দুই ধার দিয়ে সোজা চলে গেছে আরমাপুর । তিনটি অস্ত্র কারখানার কর্মচারীদের বাসস্থান এই আরমাপুর এস্টেটে । একসময় এই আরমাপুর এস্টেটে ছিল প্রচুর বাঙালি আর ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের অধীনে এখানে ছিল একটা বাংলা মিডিয়াম স্কুল । আর বাঙালি মানেই দুর্গাপূজা । এবছর আরমাপুর এস্টেটের দুর্গাপূজা ৭৫ বছরে পা রাখলো । পঞ্চমীর দিন রাত্রি ৯ ঘটিকায় উদ্বোধন হোল এবারের প্রতিমা । প্রতিদিন সকাল ১১ টা থেকে শুরু হচ্ছে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা যেমন আলপনা, উলু ধ্বনি ইত্যাদি । আর প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আছে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । আগে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা থাকতো নাটক ও যাত্রা । অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যেত স্থানীয় ছেলেমেয়েদের । কিন্তু সময় ও লোকজনের অভাবে এখন আর তা দেখা যায় না । এই আরমাপুরের দুর্গাপূজা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র আরমাপুর বাসীর । সবাই একসাথে আনন্দ করে। প্রতিদিন পূজার প্রসাদ আর ভোগের স্বাদ গ্রহণ করে অগনিত দর্শনার্থী । প্রবাসের এই পূজার আনন্দ কলকাতার পূজার আনন্দ থেকে একেবারেরই অন্যরকম । সারাদিন সবাই মণ্ডবেই আনন্দ করছে । নেই কোন ঠাকুর দেখার তারা। মণ্ডবকে কেন্দ্র করে বসে নানা ধরনের দোকান । পাওয়া যায় নানা ধরনের বাঙালি খাবার । চারটা দিনই বাড়ির মহিলাদেরও পুরোপুরি ছুটি ।

আন্দোলন

দেখতে দেখতে ৬৫ টা বছর অতিক্রম করে চলেছি । এই ছোট্ট জীবনে তিনটে আন্দোলন আমার মনে এখন পর্যন্ত দাগ কেটেছে । আমার মনে হয়েছে এই সব আন্দোলন যা শুধু দলীয় স্বার্থে আন্দোলন করার জন্য নয় বা যাত্রাপালার মতো নাটকীয় লোক দেখানো আন্দোলন করার জন্য নয়, এই সব আন্দোলন সারা দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার আন্দোলন ।আন্দোলনগুলি সঠিক না বেঠিক সে আলচনায় যাচ্ছি না । প্রথম যে আন্দোলন আমার মনে দাগ কেটেছিল তা ছিল আমার স্কুলে পড়ার সময় “ নকশাল আন্দোলন ”।
এই নকশাল আন্দোলন শুরু হয়েছিল উত্তর বঙ্গের নকশালবাড়ি তে এবং ধীরে ধীরে তা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন ছত্তিশগড় , উড়িষ্যা ,অন্ধ্রপ্রদেশ ,মহারাষ্ট্র ,ঝাড়খণ্ড , বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।এই আন্দলনের লক্ষ্য ছিল সশত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এমন এক সমাজ তৈরি করা যা শ্রেণীহীন, শোষণহীন, ব্যক্তি মালিকানাহীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবাদর্শ যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার স্থলে উৎপাদনের সকল মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। এই আন্দোলন ছিল মার্ক্সবাদ এবং লেনিনবাদে বিশ্বাসী ।
এর পর যে দ্বিতীয় আন্দোলন মনে দাগ কেটে ছিল তা হল “ ভারতে জরুরি অবস্থা ” বিরুদ্ধে জন আন্দোলন । এই জরুরি অবস্থা ভারতবর্ষের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে হরণ করেছিল। তাই বলা হয়, ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি প্রবর্তিত জরুরি অবস্থা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। আর দীর্ঘ একুশ মাস ধরে চলতে থাকা এই জরুরি অবস্থার সূচনা হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের ২৬-এ জুন সকালবেলায়। তবে এর প্রস্তুতি চলেছিল অনেক আগে থেকেই।
এরপর যে তৃতীয় আন্দোলনটি মনে দাগ কেটেছে সেটা এখনও চলছে আর সেটা হোল “ কৃষি আইনে বিরুধে আন্দোলন ”।
এই কৃষি বিলগুলি হল ‘অত্যাবশ্যক পণ্য আইন’ সংশোধন, ‘কৃষি পণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন’ এবং ‘কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত রাখতে কৃষকদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন চুক্তি’ বিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বা শাসক দলের দাবি, এই বিলগুলির জন্য কৃষকদের রোজগার বাড়বে এবং কৃষিক্ষেত্রের উন্নতি হবে। বিরোধীদলগুলির আপত্তি সত্বেও শুধু সংখ্যাধিক্যের কারণে এই বিলগুলি পাশ করাতে শাসক দলের কোন অসুবিধাই হয়নি । এই বিলগুলি সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজারের নিয়ন্ত্রণ থেকে কৃষকদের মুক্ত করবে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনাবেচা করতে পারবেন মান্ডির বাইরেই। কৃষকদের আশঙ্কা বাজার থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের হাত সরে গেলে ভারতের কৃষি বাজারে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। তারফলে ব্যবসায়ীরাই ধীরে ধীরে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে শুরু করবে। তখন কৃষকরা যোগ্য দাম চাইলেও তা পাবে না । বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য তারা যে এতদিন সরকারের বেঁধে দেওয়া ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ পেতেন, এই বিলগুলো পাস হওয়ার পর সেই নিশ্চয়তা আর থাকবে না।

আধার কার্ড


এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে যতটা জানা যাচ্ছে ৩০ জুলাই ২০১৬ অবধি ভারতবর্ষের লোকসংখ্যার প্রায় ৮৫% মানুষকে আধার কার্ড বিলি করা হয়েছে । আধার কার্ডের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে । মনে হচ্ছে আধার কার্ড ভবিষ্যতের একটা মুখ্য প্রমানপত্র হয়ে উঠবে । কার্গিল যুদ্ধের পরে ১৯৯৯ সালে মূলতঃ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের লোকজনদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রমানপত্র বিলি করার সুপারিশ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক K. Subrahmanyam । উনি আমাদের দেশের সমস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের লোকজনদের জন্যও এই প্রমানপত্র বিলি করার সুপারিশ করেন । এই সুপারিশ কার্যকর করা হবে কিনা তাই নিয়ে সেই সময় তখনকার মন্ত্রীদের নিয়ে একটা দল গঠন করা হয় । সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ২০০১ সালে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাব করে দেশের মধ্যে একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় পরিচয়পত্র চালু করা । ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নাগরিকত্ত (সংশোধন) বিল ২০০৩, লোকসভায় প্রবর্তন করা হয় এবং ধারা 14 ( ক) তে বলা হয় যে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সংস্থা ভারতের প্রত্যেক নাগরিকের কিছু তথ্য নথিভুক্ত করবে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র হিসাবে তাকে প্রদান করবে । পৃথিবীর উন্নতশীল দেশগুলি তার নাগরিকদের সবার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করে ।এখন তো শুনছি জন্মানোর সাথে সাথেই আধার কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে । ভালো পদক্ষেপ । পরিকল্পনা কমিশনের নোটিফিকেশন পর ২৮ জানুয়ারি ২০০৯ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে Unique Identification Authority of India (UIDAI) এর প্রতিষ্ঠা হয় । ইনফোসিস এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় UIDAI এর চেয়ারম্যান হিসাবে যা মন্ত্রিপরিষদ মন্ত্রীর সমতুল্য পদ । এপ্রিল ২০১০ সালে নিলেকানি দ্বারা তৈরী হয় লোগো এবং ব্র্যান্ড নাম দেওয়া হয় আধার । ২৬ নভেম্বর ২০১২ সালে একটি আধার – লিঙ্ক সরাসরি উপকৃত স্থানান্তর প্রকল্প (Aadhaar-linked direct benefit transfer scheme )চালু হয়। আধার একটি ১২ অঙ্কের পৃথক সংখ্যা যেটা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভারতেরই একটি স্বতন্ত্র সংস্থা কর্তৃক ইস্যুকৃত । এই সংখ্যা আমাদের দেশের যেকোনো জায়গায় পরিচয় ও ঠিকানার একটি প্রমাণ হিসেবে গন্য হবে ।আর এই সংখ্যা কখনই ০ বা ১ দিয়ে শুরু হবেনা । আমদের দেশের জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে এটি ১২ অঙ্কের করা হয়েছে । ৩ মার্চ ২০১৫ ভারতের নির্বাচন কমিশন এক প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটার কার্ডের সাথে আধার কার্ডের যোগাযোগের সূচনা করেন ত্রূটিমুক্ত ভোটার সনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে । ১১ মার্চ ২০১৬ , আধার অ্যাক্ট ২০১৬ ( আর্থিক ও অন্যান্য ভর্তুকি , বেনিফিট এবং পরিষেবার লক্ষ্যপূর্ণ ডেলিভারি ) লোকসভায় পাস হয় । ২৬ মার্চ , ২০১৬ , আধার ( আর্থিক ও অন্যান্য ভর্তুকির লক্ষ্যপূর্ণ অন ডেলিভারী , উপকারিতা ও সার্ভিস ) অ্যাক্ট , ২০১৬ ভারতের গেজেটে নথিভুক্ত হয় ।

ভারতে বসবাসকারী যে কোন ব্যক্তি , বয়স এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে, আধার কার্ডের জন্য বিনামূল্যে নাম নথিভুক্ত করতে পারবে ।

আধার কার্ড হলো আমাদের মৌলিক পরিচয়পত্র । আমরা যখন ব্যাংকে , গ্যাসের দোকানে , পাসপোর্ট অফিসে অর্থাৎ যেকোন জায়গায় আমাদের পরিচয়ের প্রমাণ দিতে বাধ্য় হই তখন এই আধার কার্ড আমাদের সাহায্য করে অন্য পরিচয় পত্র না থাকলেও ।

যাদের আধার কার্ড হয়নি তারা কিভাবে আধার কার্ডের জন্য আবেদন করবে :-
সারা দেশে ছড়িয়ে আছে অনেক আধার তালিকাভুক্তি কেন্দ্র যেখান থেকে আবেদন পত্র বিনা পয়সায় জোগার করা যাবে । এছাড়া কেউ যদি ইন্টারনেটের মাধ্যমে জোগার করতে চায় তাও পারবে । লিঙ্ক হলো :-https://appointments.uidai.gov.in/
• মনোযোগ সহকারে ফর্মটা ভালো করে পূরণ করে আধার তালিকাভুক্তি কেন্দ্রতে পাঠাতে হবে । ব্যক্তিগতভাবে আধার তালিকাভুক্তি কেন্দ্রতে জমা করা যাবে আবার ইন্টারনেটের মাধ্যমেও জমা করা যাবে ।
• ফর্ম পূরণ করার সময় যে ফোন নাম্বার দেওয়া হয়েছে সেটা মনে রাখা দরকার কারণ যদি ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন পরে ।
• ফর্ম পূরণ করার সময় অন লাইনেই সাক্ষাৎকারের তারিখ ও সময় পাওয়া যাবে এবং যে কোনো আধার তালিকাভুক্তি কেন্দ্রতেই নাম নথিভুক্ত করা যাবে, ফর্ম যেখান থেকে খুশি জোগার করা হোক না কেন ।

আধার তালিকাভুক্তি কেন্দ্রতে যা সাথে করে নিয়ে যেতে হবে :-

• ঠিকানা(address) এবং পরিচয়ের (identity) প্রমানপত্র সাথে আনতে হবে
• পরিচয় প্রমাণ করার জন্য ইউআইডিএআই এর ওয়েবসাইটের তালিকাবদ্ধ ১৮ টি অপশনের মধ্যে যে কোনো একটি প্রদান করতে হবে
• ঠিকানা প্রমাণ করার জন্য ইউআইডিএআই এর ওয়েবসাইটে দেওয়া ৩৩ টা অপশনের মধ্যে যে কোনো একটি প্রদান করতে হবে
• আধার রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্রের অফিসার ছবি , আঙুলের ছাপ এবং একটি রামধনু স্ক্যান নেবে
• যেহেতু এই স্ক্যান সবার জন্য অনন্য হয় , তাই এটা UIDAI এর জন্য বাধ্যতামূলক
• একবার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে দেওয়া বিবরণ সঠিক কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য আবার দেখতে দেওয়া হবে
• আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবার পর দুই থেকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে বাড়ির ঠিকানায় আধার সংখ্যা ডাকযোগে আসার জন্য

কিভাবে আধার কার্ড প্রিন্ট করতে হবে বা ডুপ্লিকেট আধার কার্ড ডাউনলোড করতে হবে বা কিভাবে অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন ট্র্যাকিং করতে হবে :-

• প্রথমে যেতে হবে ইউআইডিএআই ওয়েবসাইটে এবং ক্লিক করতে হবে Get E-Aadhar’
• উপরের দুটো অপশন( Enrolment Number/Aadhaar Number) থেকে আধার নাম্বার এর স্ক্রীনটা নির্বাচন করতে হবে । তারপর আধার কার্ড আবেদন পত্রে যে রকম নাম লেখা আছে সেইরকম এবং PIN CODE লেখতে হবে
• তারপর দিতে হবে ইমেইল বা ফোন নাম্বার আধার কার্ড আবেদন পত্রে যে রকম দেওয়া আছে
• ছবির উপরে লেখা নিরাপত্তা কোডটি(captcha) লিখে ক্লিক করলে এক কালীন পাসওয়ার্ড বা OTP পাওয়া যাবে
• OTP দিলেই পাওয়া যাবে আধার সংখ্যা বা কার্ড
• ক্লিক ভ্যালিডেট এবং ডাউনলোড প্রিন্ট অনলাইন
• ব্যাস প্রিন্ট করে নিলেই হলো

যদি ইন্টারনেট না থাকে বা কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে আধার কার্ড হারিয়ে গেলে কি করতে হবে :-

• টোল ফ্রি নাম্বারে অর্থাৎ 1947 এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে হবে
• টোল ফ্রি নাম্বারে যোগাযোগ করতে না পারলে লোকাল অফিসে যোগাযোগ করলেও হবে
• উপরের দুই জায়গায় যোগাযোগ করতে না পারলে , সমস্ত বিবরণ দিয়ে হেড অফিসে জানাতে হবে –
Unique Identification Authority of India
Planning Commission, Government of India (GoI)
3rd Floor, Tower II, Jeevan Bharati Building,
Connaught Circus, New Delhi – 110001
• কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসের সময় :
সোমবার থেকে শনিবার – সকাল ৭ টা থেকে রাত্রি ১১ টা
রবিবার – সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৫ টা

আধার কার্ড খুব সহজেই দেশের ব্যাঙ্কিং , মোবাইল ফোন, রেলওয়ে টিকিট এবং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবার সাথে সংযুক্ত করা যায় । এটা ব্যবহার খুবই সুবিধাজনক কারণ এটি সহজেই অনলাইনে যাচাই করা যেতে পারে এবং এর ফলে জাল আইডি নিদর্শনের ঝুঁকিও কমে যায় । আধার কার্ড সর্বত্রই ভালোভাবেই গৃহীত ।

অন্ত্যেষ্টি


অন্ত মানে শেষ আর ইষ্টি মানে যজ্ঞ তাহলে অন্ত্যেষ্টি মানে দাঁড়াল শেষ যজ্ঞ অর্থাৎ যখন মানুষের মৃতদেহ আগুনে আহুতি দেওয়া হয় । পচনশীল দেহখানা না রেখে তাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়াই হল অন্ত্যেষ্টি। পুরাকালে এখনকার মতো হাসপাতাল বা Nursing home ছিল না । মানুষের জন্ম আর মৃত্যু হত বাড়ির মধ্যে । তার ফলে বাড়ির পরিবেশের শুচিতা নষ্ট হত অর্থাৎ বলা যায় বাড়ির পরিবেশে অশুচি দেখা দিত ।তাই জন্মের সময় বাইরে থেকে বাড়ির ভিতরে এবং মৃত্যুর সময় বাড়ির ভিতর থেকে বাইরে যাতে জীবাণু যেতে না পারে তার জন্য জন্ম আর মৃত্যুর পর কিছুদিন অশৌচ পালনের বিধান আসলো । কিন্তু এখন তো প্রায় বেশীরভাগ জন্ম আর মৃত্যু ঘটে হাসপাতাল বা Nursing home এ ।তাই জীবাণু বাড়ির থেকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা নেইই বলা যায় । তবুও দেখা যায় বিশেষ করে মানুষের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মণ ১০ দিন, ক্ষত্রিয় ১২ দিন, বৈশ্য ১৫ দিন এবং শূদ্র ৩০ দিন ধরে অশৌচ পালন করে । তারপর এই অশৌচ পালনের পর আসে শ্রাদ্ধ । মৃত ব্যাক্তির এবং তিন পুরুষের আত্মার তৃপ্তির জন্য শ্রদ্ধার সাথে দান করার যে বিধান সেটা হোল শ্রাদ্ধের বিধান । কথিত আছে মহামুনি নিমির ছেলের মৃত্যুর পর তার ছেলের আত্মার শান্তির জন্য ওনি কিছু পূজনীয় ব্যাক্তিকে ভোজন করান ও কিছু দান করেন । এর থেকেই শোনা যায় উৎপত্তি হয় শ্রাদ্ধের । একটা জিনিস আমার কিছুতেই বোধগম্য হয় না বা বলা যায় আমার জানতে খুব ইচ্ছা হয় কেন এই বৈষম্য । কেন এই বিধান – ব্রাহ্মণ ১০ দিন, ক্ষত্রিয় ১২ দিন, বৈশ্য ১৫ দিন এবং শূদ্র ৩০ দিন অশৌচ পালন করার পর শ্রাদ্ধ করবে । বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন রকম বিধান হতে পারে কিন্তু একই ধর্মের মানুষের মধ্যে এত আলাদা আলাদা বিধান কেন ?সবাই তো এক রক্ত মাংসের মানুষ । তবে অশৌচের ব্যাপারে কেন এই আলাদা নিয়ম ? আর এই উন্নত সমাজব্যবস্থায় অশৌচ পালনের যুক্তি বা কি ? যেকোন মৃত্যুই তার প্রিয়জনদের কাছে দুঃখের । তাই সেই প্রিয়জনের মৃত্যুর পর কেন মানুষকে ভোজন করান হবে সেটাও মন থেকে কিছুতেই মানতে পারছি না ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s