ইউরোপ ভ্রমন বা Europe Tour

ইউরোপ ভ্রমন বা Europe Tour

সূচিপত্র

ক্রমিক সংখ্যাজায়গার নাম
1সান্তা ক্লসের গ্রাম -ল্যাপল্যান্ড
2নোবেল পুরস্কারের জন্মদাতার শহর – স্টকহোম
3ফুটবলের মক্কা –  বার্সেলোনা,স্পেন
4ফুটবলের মক্কা – মাদ্রিদ ,স্পেন
5লন্ডন নামচা
6ইউরোপের সিলিকন উপত্যকা – তালিন
7স্বপ্নের শহর –   ফিনল্যান্ড
8নুউক্সিও / NUUKSIO NATIONAL PARK, FINLAND
9হ্যানকো (Hanko), ফিনল্যান্ড
10হেলসিঙ্কি , ফিনল্যান্ড
11সৌমেনলিনা দ্বীপ’ , ফিনল্যান্ড
12YYTERI BEACH এবং TURKU CITY
13আবার তালিন
14পৃথিবীর উত্তরের শেষ প্রান্ত – নর্থ কেপ

সান্তা ক্লসের গ্রাম -ল্যাপল্যান্ড

পর্যটকদের কাছে ল্যাপল্যান্ডের আকর্ষণ অনেকদিনের । কারণ এখানে আছে সান্তা ক্লসের গ্রাম , প্রচুর রেইন ডিয়ার , অরোরা বোরিয়ালিস , আর্কটিক সার্কেল , মধ্যরাত্রে সূর্য দেখার সূখ , স্লেজ গাড়ি , ইগলু , এছাড়া আছে অপূর্ব প্রাকিতিক সৌন্দর্য আর আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ধংসলীলার ইতিহাস ।

আমরা যদি একটু ভালো করে পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে একদম উপর দিকে অর্থাৎ উত্তর মেরুর দিকে দেখবো  একটা গোল বৃত্ত আঁকা আছে । সেটাকেই বলে আর্কটিক সার্কেল । এই আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে যে সব জায়গাগুলো আছে সব জায়গারই আবহাওয়া ঠান্ডা । কিছু কিছু জায়গা আবার সবসময় বরফে ঢাকা থাকে । আটটি দেশের মধ্য দিয়ে এই আর্কটিক সার্কেল গেছে । দেশগুলো হোলো নরওয়ে ,সুইডেন , ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ড , রাশিয়া , ইউনাইটেড স্টেটস (আলাস্কা ),কানাডা , গ্রীনল্যান্ড ও  আইসল্যান্ড ।

ল্যাপল্যান্ড ফিনল্যান্ডের উত্তর দিকের একটি সীমান্ত প্রদেশ যার তিনদিকে আছে সুইডেন ,নরওয়ে আর রাশিয়া । আমরা তখন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে । হেলসিঙ্কি থেকে ট্রেনে ল্যাপল্যান্ড এক রাত্রির যাত্রা । নভেম্বর মাসের শেষ দিক , ভালই ঠান্ডা । ঐ সময় প্রচুর বরফ দেখা যায় আর  অরোরা বোরিয়ালিস দেখার খুব সুযোগ থাকে । ছেলের কাছে শুনেছি রাত্রের আকাশ জুড়ে দেখা যায় সবুজ আলোর ঝলকানি । সারা আকাশ জুড়ে অনেক্ষণ ধরে চলে সবুজ আলোর ঢেউ । ওর বেশ কটা ছবিতে অরোরা বোরিয়ালিস দেখার সুযোগ পেয়েছি । তাই নিজের চোখে দেখার সুযোগ ফেলতে পারলাম না ।  ল্যাপল্যান্ডের হাতছানি তীব্রভাবে অনুভব করতে লাগলাম ।

সান্তা ক্লসের গ্রাম

অগ্যতা ২৭,১১,২০১৫  বিকাল  সাড়ে পাঁচটা ,  তিনজনে রওনা হলাম হেলসিঙ্কি থেকে ট্রেনে করে ল্যাপল্যান্ড  । দোতলা ট্রেন , করিডরের  পাশদিয়ে পর পর অনেকগুলো ছোট ছোট কামরা । একটা কামরায় দুটো করে বার্থ ,উপরে আর নীচে । সুন্দর করে বিছানা পাতা । বেসিন, জামাকাপড় টাঙ্গানোর হ্যাঙ্গার , ছোটর মধ্যে সবই আছে । সকাল ৮টা নাগাদ ল্যাপল্যান্ড  পোঁছালাম । অবশ্য ওখানে অন্ধকার । আলো হয় সকাল ৯টার পর , থাকে ২ টা অবধি ।ওয়েটিং রুমে  পরিস্কার হয়ে পাশের একটা  রেস্তরাঁতে সকালের জলখাবার  খেতে গেলাম ।এখানকার ওয়েটিং রুম ঝকঝকে পরিস্কার । ও একটা কথা লিখতে ভুলে গেছিলাম। এখানে ট্রেনে কোন আলাদা আলাদা ক্লাস নেই । সবই এক ।

স্টেশন থেকে খুব সাবধানে  পা ফেলে চলতে হচ্ছে । কারন আগেরদিনের স্নো বরফ হয়ে গেছে । আমাদের সাথে অনেক বিদেশী পর্যটক ট্রেন থেকে নামলো ।  ঠান্ডাতো কি হয়েছে , জায়গাটা তো ল্যাপল্যান্ড  । ট্যাক্সি  নিয়ে পৌঁছালাম সান্তা ক্লসের গ্রামে ।  রাস্তার দুপাশ বরফে সাদা হয়ে আছে ।  মনে হলো বরফে ঢাকা এক বিদেশী আশ্রম । চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটা বাড়ী   । কোনটা সান্তার পোস্ট অফিস , কোনটা  বা অফিস  । পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সান্তার নামে চিঠি এখানে আসে । এছাড়া আছে অনেকগুলো রেস্তরাঁ । একটা ভাল হোটেল ও পেট্রল পাম্প দেখলাম ।    সবই সুন্দর করে সাজানো । আর্কটিক সার্কেলটা যেখান দিয়ে গেছে সেই জায়গাটা খুব সুন্দরভাবে বোঝান হয়েছে ।  চারিদিকে প্রচুর ক্রিসমাস ট্রি  জায়গাটার পরিবেশকে খুবই মনোরম করে তুলেছে । শুধু বড়দিনের সময় নয় , সব সময় এই জায়গা বড়দিনের সাজে সজ্জিত । কিছু দূরে একটা হাস্কি পার্ক (Husky park) দেখলাম । গিয়ে দেখি নেকড়ের মতো দেখতে কিছু কুকুর বরফের উপর দিয়ে স্লেজ গাড়ী টানছে।

স্লেজ গাড়ী

ছোটবেলার ভুগোল বইয়ের কথা মনে পরে যাচ্ছিল । বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে স্লেজ গাড়িতে চড়ছি । চারপাশে বেশ কটা ইগলু দেখতে পেলাম । অনেকটা বরফের টেন্ট ।

ইগলু

এরপর আরো অনেকের মতো সান্তার সাথে দেখা করতে চললাম । এখানে সান্তা ক্লসের সাথে প্রতেকদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা অবধি দেখা করা যায় । বিশাল লম্বা লাইন । আমরাও দাঁড়ালাম । দোতলার উপর একটা আলো আধাঁরি ঘরে বসে আছেন ওনার সেই পরিচিত লাল সাদা টুপি আর লম্বা গ্রাউন পরে । সৌম্য দর্শন বয়স্ক মানুষ আমাদের সাথে হাত মেলালেন । হেঁসে আমাদের সমন্ধে জানতে চাইলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি, কেমন লাগছে , কদিন থাকব এই সব আরকি । নিজেদের ক্যামেরাতে ছবি তোলা মানা । ওরাই ছবি তুললো , ভিডিও করলো । যারা নিতে চায় তারা কিনতে পারে । আমরাও সবার মতো স্মৃতি হিসাবে সান্তার সাথে আমাদের ছবি ও ভিডিও কিনে নিলাম । সারা গ্রাম ঘুরতে বেশ সময় লাগে । এখানে ২টার সময় অন্ধকার হয়ে যায় । এরপর আমরা টাক্সি নিয়ে ল্যাপল্যান্ডের রাজধানী রোভানিয়েমিতে আসলাম যেখানে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করা ছিল ।  ছিমছাম শহর । একটা দুই কামরার আসবাবপত্র সহ ফ্ল্যাট অন লাইনে ব্যবস্থা করা হয়েছিল । অনেকটা হোম স্টের মতো । ইচ্ছা করলে রান্না করেও খাওয়া যাবে । দুদিনের জন্য আমাদের বুক করা ছিল । চাবি নিয়ে নিজেরাই রাস্তা চিনে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম । জিনিসপত্র রেখে একটু আরাম করে বেড়িয়ে পরলাম রোভানিয়েমির রাস্তায় । শুনেছি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই রোভানিয়েমিতে জার্মান সৈন্যরা বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে জড়ো হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধ করার জন্য । যার নাম বার্বারোজা অপারেসন । এই যুদ্ধ আজ ভয়াবহ ইতিহাস । প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সাক্ষী এই ল্যাপল্যান্ড । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের কোনো বাড়িঘর খুঁজে পাওয়া মুশকিল । সারা রোভানিয়েমি আগুনের শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেছিল । যা কিছু এখন ল্যাপল্যান্ডে দেখছি সবই প্রায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের সময়কার । কিছুদূর হাঁটতেই অবাক কান্ড এখানেও একটা ভারতীয় রেস্তরাঁ । নাম রঙ্গমহল । এক নেপালী মহিলা চালান । সুন্দর রান্না । ভালই পরিচয় হলো । উনি নেপাল থেকে এসে এখানে রেস্তরাঁ খুলেছেন যেখানে ভারতীয় খাবার পাওয়া যায় । যেহেতু আমরাও কিছুটা নেপালী বলতে পারি তাই ভাল খাতির পেলাম । ল্যাপল্যান্ড-এ যখন ভারতীয় খাবার পাওয়া যাচ্ছে তখন আমরা নিশ্চিত যে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই ভারতীয় খাবার পাওয়া যাবে । আমার ছেলে বলছিল আজকাল ভারতীয় খাবারের আকর্ষন বিদেশে নাকি দিন দিন বাড়ছে । খাওয়া সেরে আবার ফিরলাম আমাদের হোম স্টে-তে । হোম স্টে-টা খুব ভালো ছিল । এককথায় বলা যায় খুবই আরামদায়ক । কিছুক্ষন হালকা বিশ্রাম নিয়ে ঠান্ডার ভালই প্রস্তুতি নিয়ে আবার চললাম সান্তার গ্রামে , যদি রাত্রের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস দেখতে পাই । শুনেছি বছরে প্রায় ২০০ রাত্রি অরোরা বোরিয়ালিস এখানে দেখা যায় । বাইরে দেখলাম ১ ডিগ্রী , হালকা বৃষ্টি হচ্ছে । ছাতা মাথায় দিয়ে তিনজনে পৌঁছে গেলাম । লোকজন নেই বললেই চলে । অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন আকাশ পরিস্কার হলো না, তখন বাধ্য হয়েই ঘরে ফিরতে হলো ।  রাত্রের খাবার বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তাই ঘরে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম । হঠাৎ জানলা দিয়ে বাইরে নজর যেতেই দেখি বরফ পড়ছে । অসাধারণ । কিছুক্ষন হয়ে বন্ধ হয়ে গেল । আমরাও শুয়ে পড়লাম । ভোরে উঠে দেখি চারিদিক সাদা । সারা রাত ধরে প্রচুর বরফ পরেছে । কাছেই একটা বড় হ্রদ আছে , গিয়ে দেখি জলের অনেকটা অংশই সাদা হয়ে আছে । বুঝতে পারলাম হ্রদের জলের অনেকটাই বরফ হয়ে গেছে । পাশেই একটা বড় পার্ক । এত বরফ পরেছে যে হাঁটতে পা ডুবে যাচ্ছে । মনটা ভরে গেল । তাপমাত্রা -৪ ডিগ্রী । কাছেই আর্কটিক সার্কেলের উপর একটা মিউজিয়াম আছে , সেটাই দেখতে গেলাম । বেশ কটি শ্বেত ভাল্লুক ও বল্গা হরিন ওখানে দেখলাম ।

শ্বেত ভাল্লুক

অরোরা বোরিয়ালিসের উপর একটা ডকুমেন্টারিও দেখলাম । দুধের স্বাদ ঘোলে মিটলো । চরকির মতো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম । প্রতিটি বাড়ীর মাথা সাদা হয়ে আছে । গাছের উপর বরফ । তাপমাত্রা পজিটিভ হলে নাকি বরফ গলা শুরু হবে । যাইহোক আমাদের রাত্রি ৯টায় ট্রেন । হালকা ডিনার সেরে চললাম ষ্টেশন । ট্রেন ছাড়লো ৯ টা ১৫ মিনিটে । তখন তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল -১ ডিগ্রী । ল্যাপল্যান্ডকে বিদায় জানিয়ে চললাম আমরা হেলসিঙ্কি ।

নোবেল পুরস্কারের জন্মদাতার শহর – স্টকহোম

তখন আমরা ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে । যেহেতু ছেলের শনি ও রবিবার ছুটি ,তাই আমরাও প্রতি শনিবার পাড়ি দিচ্ছিলাম অজানার উদ্দেশ্যে । ছেলেই প্রস্তাব দিল এই শনিবার চলো যাই সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম । মাত্র ৪৭৩ কিলোমিটার । আমাদের যেহেতু ফিনল্যান্ডের ভিসা ছিল তাই ইউ.কে ছাড়া সেনজেন এলাকার ২৬ টা দেশে যেতে কোনো বাঁধাই ছিল না কারণ এই ২৬ টা দেশের মধ্যে যে কোনো একটা দেশের ভিসা থাকলেই হলো । ফিনল্যান্ড ,সুইডেন , নরওয়ে , তালিন আর ল্যাপল্যান্ড কমসময়ে একসাথে ঘুরে আসার প্রোগ্রাম বানানো যায় ।পাশাপাশি সব দেশ ।কোনো একটা দেশের ভিসা নিয়ে রওনা হলেই হলো । স্টকহোম থেকে জলপথেও  যাওয়া যায় ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি ও  তুর্কু , এস্তোনিয়ার তালিন , রিগা , লাতভিয়া, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ  । কোনো অসুবিধা ছাড়াই ভালভাবে সব ঘোরা যাবে ।কারণ এদিককার লোকজন একদমই ঠকবাজ নয় আর সব ব্যাপারে ভাল পরামর্শ দেয় । আজকাল  বিভিন্ন টুর অপারেটরা নিয়ে যাচ্ছে বা সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছে । যেকোন দেশে বসে অন লাইনেও ব্যবস্থা করা যায় । শুধু চাই পাসপোর্ট । স্টকহোমের কথা হতে প্রথমেই মাথায় আসে নোবেল প্রাইজের জনক আলফ্রেড নোবেলের জন্মস্থান এই স্টকহোম । প্রতি বছর ১০ ই ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে এই স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হয় । বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত মানুষজনের পদধুলি পরে এই স্টকহোমের মাটিতে । ‘শান্তি’ পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ে থেকে আর বাকি সব বিষয়ের পুরস্কার দেওয়া হয় স্টকহোম  থেকে । ১৯০১ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রতি বছর চলছে এই অনুষ্ঠান । বাদ ছিল মাঝের দুটি বছর ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ । কারণ নরওয়ে ছিল সেইসময়ে জার্মানদের অধীনে । ১৪/১১/১৫ বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে রওনা হলাম বাল্টিক সি ধরে জাহাজে স্টকহোম , সুইডেনের রাজধানী । জাহাজতো নয় মনে হয় একটা বড় মল ।  ভিতরটা  পাঁচতারা হোটেল । যে জাহাজে তালিন গেছিলাম এটা তার থেকেও অনেক বড়। ফিনল্যান্ডের সকাল ৯টা মানে সুইডেনের সকাল ১০টায় জাহাজ  পৌঁছাল স্টকহোমের বন্দরে । জাহাজেই সকালের জল খাবার করে নিয়েছিলাম । সুইডিস বা ফিনিস খাওয়ারের খুব ভাল ধারণা না থাকায়  ‘বুফে ব্রেক ফাস্ট’ ই  আমরা পছন্দ করলাম। এক, সব খাবারের স্বাদ নেওয়া যাবে তারপর যেটা পছন্দ  পেটপুরে খাওয়া যাবে।  টাকাতে হিসাব করলেও দাম ন্যায্যই বলা যায় । আমাদের এখানকার ভালো হোটেলে এর থেকে বেশি  দাম ।

 কেউ না বললে ফিনল্যান্ড আর সুইডেন  একই রকম লাগে। আমাদের চোখে মানুষের রঙ এক । ভাষাও মনে হয় এক যেহেতু বুঝিনা । রাস্তাঘাট একইরকমের । আবহাওয়ার সামান্য তারতম্য । দুদেশের হরফ অনেকটাই ইংরেজির হরফ । ফিনল্যান্ডের মতো কোন রাস্তায় পুলিশ নেই , কিন্তু সবাই সব কিছু মেনে চলছে । দুদেশের কাকের রঙ এক । আমাদের দেশের মতই শুধু গলার কাছের রঙটা সাদা । জাহাজে আসতে আসতে অনেকগুলো ছোট ছোট দ্বীপ  দেখলাম । জাহাজ থেকে স্টকহোম শহরটাকে খুব সুন্দর লাগছিল যেমন লাগছিল হেলসিঙ্কিকে । ফিনল্যান্ড আর সুইডেন  দুজায়গাতেই দেখলাম ছেলে ও মেয়েরা বেশ লম্বা লম্বা ।স্টকহোম সুইডেনের পূর্ব উপকূলে ম্যালারেন হ্রদের (Mälaren) মোহনায় অবস্থিত। এছাড়া স্টকহোম শহরের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের জল অনেকটাই ভিতরে চলে গেছে । নৌকা  এবং স্টিমার চলছে তার উপর । ‘হপ অন হপ বোট’এ করেও এখানে দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা যায় । স্টকহোমকে অনেক সময় “স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ভেনিস” বলা হয়।এছাড়া আছে ‘হপ অন হপ’ বাস । যেটা ইউরোপের সব শহরেই দেখতে পারছি । এছাড়া এখানকার মেট্রো রেল বেশ সাজানো গোছানো । এখানে মেট্রো রেলের পরিষেবা শুরু হয় ১৯৫০ সাল থেকে । পর্যটকদের যাতে কোনরকম অসুবিধা না হয় তার জন্য সবরকম ব্যবস্থা আছে । আমরা গুগল ম্যাপ নিয়ে হেঁটেই ঘুরছি । একটু হেঁটে পৌছেগেলাম রাজবাড়িতে ।

রাজবাড়ি

বিশালাকার এই রাজবাড়ি ভাল করে দেখতে অনেকটা সময়ের দরকার । রাজারানীদের মুকুট ও অলঙ্কার আমাদের দেশের নবাবদের কথা মনে পরিয়ে দেয় । কত নামী দামী অলঙ্কার আমাদের দেশে ছিল । বিভিন্ন সময়ে বাইরে থেকে আসা  লুঠেরাদের দল  ঐ অলঙ্কার যদি লুট না করতো তাহলে আমরাও আমাদের জাদুঘরে সব দেখাতে পারতাম । লন্ডনের রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকতে না পারার আফসোস এই রাজবাড়ি পুষিয়ে দিল । উপরি পাওনা লন্ডনের রাজবাড়ির মত একদল সৈন্য যখন রীতিমত কুজকায়াজ করে আগের সৈন্যদের জায়গা নেয় সেটা দেখার । পর্যটকদের কাছে এটা খুবই আকর্ষনীয় । একটা জমকালো ব্যাপার । রাজবাড়ি অনেক দেখেছি কিন্তু এরকম জীবন্ত রাজবাড়ি আগে দেখিনি । তারপর একটু হেঁটে পৌছে গেলাম জাতীয় জাদুঘরে। ওখান থেকে বেড়িয়ে সোজা চললাম শহর দেখতে । ধীরে ধীরে শহর সেজে উঠছে কারন সামনের মাসেই বড়দিন, এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব । সুইডেনের জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়াম দেখার মত । মনে পরে যায় বিশ্বকাপের কথা । রাত জেগে কত সুইডেনের ফুটবল খেলা দেখেছি । পর্যটকদের কাছে দুটি জায়গার আকর্ষণ খুবই তীব্র । এক  স্টকহোম কনসার্ট হল, আরেকটি স্টকহোম সিটি হল । নোবেল পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান এই দুই জায়গাতে অনুষ্ঠিত হয় ।

বাচ্চারা বরফে স্কেটিং-এ খুব আনন্দ করছে এবং বড়রাও ওদের এই আনন্দকে খুব উপভোগ করছে । সব জায়গার মানুষের মন বোধহয় একইরকম , শুধু ভাষা আলাদা । সময় হয়ে আসছে । আমরা তিনজন আবার ঐ জাহাজেই মানে যেটাতে এসেছিলাম সেটাতেই ঐ কেবিনেই ফিরবো । তাই ঐ কেবিনে কিছু জিনিষ রেখে এসেছি হাল্কাভাবেই ঘুরে বেড়াবো বলে।সুইডেনের সাড়ে ৪ টা আমরা রওনা হলাম হেলসিঙ্কি । যতক্ষন স্টকহোম দেখা যাচ্ছিল ততক্ষন আমরা জাহজের ডেকে দাঁড়িয়ে । তারপর সহযাএিদের সাথে এগিয়ে চললাম ফিনল্যান্ড।

ফুটবলের মক্কা –  বার্সেলোনা,স্পেন

আমাদের যেহেতু সেনজেন এলাকার ২৬ টা দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ডের ভিসা ছিল তাই ইউ.কে ছাড়া বাকি ২৬ টা দেশে যেতে কোনো বাঁধাই ছিল না কারণ এই ২৬ টা দেশের মধ্যে যে কোনো একটা দেশের ভিসা থাকলেই হলো । আমাদের দেশের বেশ কিছু টুর অপারেটর স্পেন আর পর্তুগাল একসাথে ঘোরাতে নিয়ে যায় । স্পেনের পাশেই তো পর্তুগাল । সব ফুটবল পাগল দেশ ।  ১৯/১১/১৫ সকাল সাতটা নাগাদ রওনা হলাম হেলসিঙ্কি বিমানবন্দর থেকে নরওয়ে ।  হেলসিঙ্কির  তাপমাত্রা  ছিল তখন ৫ ডিগ্রী। দেড় ঘন্টা লাগলো নরওয়ে  পৌঁছাতে । তখনও প্লেন নরওয়ে  বিমানবন্দর  থেকে কিছুটা উপরে । জানলা দিয়ে যেদিকে তাকাই মনে হচ্ছিল সাদা চাঁদরে  ঢাকা একটি শহর । কদিন আগে এই ওসলো শহর হয়ে ফিনল্যান্ড গেছি কিন্তু আজ বরফের আবরণে ওসলোর এক আকর্ষণীয় রূপ   দেখলাম । তাপমাত্রা – ২ ডিগ্রী । এখান থেকে প্লেন  বদল করে বার্সেলোনা  যাবো প্রথমে । তারপর মাদ্রিদ । প্লেন বদল করে গেলে ভাড়াটা বেশ কিছুটা কম পরে  । আকাশপথে হেলসিঙ্কি থেকে মাদ্রিদের দূরত্ব প্রায় ২৯২৭ কিলিমিটার । আকাশপথে জার্মান ও ফ্রান্স পেড়িয়ে স্পেন । ডানদিকে থাকে সুইজারল্যান্ড । তাই আল্পস পর্বতমালা দেখার সৌভাগ্য ঘটে । আমরাও দেখেছি দুচোখ ভরে । মনে পরে যাচ্ছিল আকাশপথে বাগডোগরা থেকে দমদম যাওয়ার কথা । সূর্যের আলোয় তুষার শুভ্র শৃঙ্গরাশির রূপ শুধু দুচোখ ভরে উপলব্ধি করা যায় , ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন । দুপুরবেলার মধ্যে পৌছে গেলাম বার্সেলোনার  বিমানবন্দরে  । যেহেতু আমাদের বড় ছেলে সাথেই  রয়েছে তাই কোনো চাপ ছিল না । ও বার্সেলোনা   হোটেল না নিয়ে একটা হোম স্টে  ঠিক করেছে যেটা শহরের খুব ভাল জায়গায় । কাছাকাছি অনেকগুলো পর্যটকদের দেখার জায়গা । পিকাসোর আর্ট মিউসিয়ামের পাশেই । এক কামরার ফ্ল্যাট । সব রকমের সুবিধা আছে । মোবাইলে ‘গুগুল ম্যাপ’ যে কি কাজের , তা বেশ ভালই উপলব্ধি  করলাম । কাউকে জিগ্ঘেষ করার কোন দরকার নেই । হাতে মোবাইল নিয়ে যেখানে খুশী ঘুরে বেড়াও, শুধু মোবাইলে ‘নেট’ থাকতে হবে  । ঘরে জিনিষ রেখে একটা টাক্সি নিয়ে ছুটলাম  বার্সেলোনা ফুটবল স্টেডিয়াম । পৃথিবীর তাবড় তাবড় ফুটবলারের পদধূলী  মাখা মাঠ । যেকোন ফুটবল প্রেমীর কাছে  এই মাঠ স্বর্গ  । ফুটবলের জাদুঘর বললে ভাল হয় ।

বার্সেলোনা ফুটবল স্টেডিয়াম

সোনার ফুটবল, সোনার বুট, বড় বড় প্রতিযোগিতার এর কাপ , বিভিন্ন নামী প্লেয়ারদের ব্যবহৃত জারসি, বুট কি নেই । অমূল্য সব ছবি । আর মাঠ , মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি ,টিভিতে বার্সেলোনা আর রিয়েল মাদ্রিদের খেলা । যেন দেখতে পারছি মেসি গোল করার পর সারা স্টেডিয়াম জুড়ে চীৎকার । চোখের সামনে মনে হচ্ছে সব দেখতে পারছি । ঘুরে ঘুরে প্লেয়ারদের পোশাক ছাড়ার জায়গা , ধারা ভাষ্যকারদের বসার জায়গা , ক্লাব সভ্যদের বসার জায়গা , সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাতের জায়গা , মাঠের পাশে কোচ ও প্লেয়ারদের বসার জায়গা সব প্রানভড়ে দেখলাম । পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল ক্লাব বলে কথা ।পৃথিবীর ধনী ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই এফ সি বার্সেলোনা  । বেড়োতেই ইচ্ছা করছিল না । কিন্তু বাকী সব দেখতেতো হবে , তাই চললাম সমুদ্রের ধারে । ভূমধ্য  সাগর । শান্ত সমুদ্র । বেশ বড় সমুদ্রের সৈকত কিন্তু সর্বত্রই চারিধারে শুধু বালি নয়।  অনেকটা অংশই পাথর দিয়ে মোড়া । সৈকতের ধার ধরে অনেকে স্কেটিং করছে । কেউ কেউ আবার বালি দিয়ে বিভিন্ন মূর্তি বানাচ্ছে যেটা আমাদের দেশেও দেখা যায় ।সারা পৃথিবীর শিল্পীরা বোধহয় একই রকম হয় । রাত্রের খাওয়া দাওয়া সেরে হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ফিরলাম ।

যেহেতু বাড়ীর পাশে , তাই সকালে প্রথমেই গেলাম পিকাসোর আর্ট মিউসিয়ামে । পাবলো পিকাসোর আঁকা বহু মূল্যবান সব ছবি । মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি ।

সাগ্রাদা ফামিলিয়া অসমাপ্ত ক্যাথেড্রাল

তারপর গেলাম ‘সাগ্রাদা ফামিলিয়া অসমাপ্ত ক্যাথেড্রাল । বার্সেলোনায়  এই চার্চের স্থাপত্য একেবারেই আলাদা । ফেয়ারী টেলসের গল্পের মতো  বাড়ী মনে হয় ।  এরপর গেলাম একটা টিলার ওপর অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা পার্ক নাম ‘পার্ক গুএল’ দেখতে . পার্কের ওপর থেকে সারা শহর খুব সুন্দর দেখা যায় . বিখ্যাত স্থাপত্য শিল্পী ‘গাউদি’র পরিকল্পনার ফসল এই পার্ক |  ‘পার্ক গুএল’ দেখে সোজা চললাম ‘ মোন্ত্জুইক হিল’  । হঠাৎ একটা ঘটনা মনে পড়লো তাই না লিখে পারছি না । ‘পার্ক গুএল’  এ আমার বড় ছেলে  আমার ও আমার স্ত্রীর  ছবি তুলছিল। একজন বিদেশী বয়স্ক ভদ্রলোক হাসতে হাসতে এসে আমার দিকে তার ডান হাতটা  বাড়িয়ে দিল । আমিও কিছু না বুঝে আমার ডান হাতটা ভদ্রতার খাতিরে ওনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম । দুহাত দিয়ে আমার হাতটা ধরে খুব আন্তরিক ভাবে করমর্দন  করলো । মুখে কিছু বললো না । আমি বেশ উপলব্ধি করতে পারলাম । উনি বলতে চাচ্ছেন কি সুন্দর তোমার প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে তোমাদের সাথে ঘুরছে।  আমাদের দেশে এটার অভাব ।  সত্যিই তাই । ছোট বাচ্চাদের নিয়ে   বাবা মাকে ঘুরতে দেখেছি কিন্তু একটু বড় ছেলেমেয়েদের সাথে চোখে পড়েনি । ‘ মোন্ত্জুইক হিল’   হলো ছোট একটা পাহাড়ের উপর বিশাল দূর্গের মতো একটা বাড়ী যার উপর দাঁড়ালে পুরো শহরের চারিদিক , আর দিগন্ত জুড়ে সমুদ্র দেখা যায় । আলো-আঁধারের রূপ দেখার জন্য অনেক্ষণ ছিলাম । পাহাড়ের ওপর থেকে অনেকটা নীচে শহরের দিকে তাকিয়ে বসে আছি । খোলা জায়গা তাই ঠান্ডাও ভালই উপলব্ধি করছিলাম । একটু একটু করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শহরে আলো জ্বলতে লাগলো । তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত শহর জ্বলজ্বল করতে লাগলো । মনের ক্যামেরার ছবিগুলো যখনই সামনে আসে মনটা ভরে ওঠে  এক অনাবিল আনন্দে । সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পাহাড় ধরে ধরে নীচে নামতে শুরু করলাম । এসে পৌছালাম ‘ম্যাজিক ফাউন্টেন’ বা জাদুর ফোয়ারাতে ।এরকম নৃত্যের তালে তালে নানা রঙের ফোয়ারা আমরা আগেও দেখেছি । তবে পাহাড় থেকে সমতল অবধি অনেকটা জুড়ে এই ফোয়ারা । দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল । প্রচুর পর্যটকের সমাগম । এক হাতে কফির কাপ নিয়ে উপভোগ করতে বেশ ভালই লাগছিল ।

‘ম্যাজিক ফাউন্টেন’ বা জাদুর ফোয়ারা

পরের দিন প্রথমে গেলাম সমুদ্রের ধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল এক মাছের অকুয়ারিয়াম দেখতে । মাথার উপর দিয়েও মাছ চলাফেরা করছে । নানারকমের মাছ । ওখানে এই প্রথম ‘সি হর্স’ দেখলাম । মনে হচ্ছিল সমুদ্রের তলায় পৌছে গেছি । উপযুক্ত পোশাক সহ আলাদা  টিকিট নিয়ে সাঁতার কেটেও দেখা যায় । শহরের মধ্যে  ‘লা রাম্বলা’ ও ‘বার্রিও গোথিক’ দেখলাম । উত্তর কলিকাতাতে যেমন গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ী আর ছোট ছোট রাস্তা দেখা যায় তেমনি একটা জায়গা নাম ‘বার্রিও গোথিক’। পুরনো শহর । তবে রাস্তাগুলো পরিস্কার । ১.২ কিলোমিটার একটা রাস্তা যার নাম ‘লা রাম্বলা’, দেখলাম অনেক শিল্পী ওই রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে , বসে ছবি আঁকছে যেমন আমাদের দেশেও  দেখা যায় । পর্যটকদের কেনাকাটার জায়গা । বেশ কিছু দোকান দেখলাম ভারতীয়রা চালাচ্ছে । অনেকদিন পর হিন্দি কথা শুনে ভালো লাগলো । সবই স্যুভেনির দোকান । স্প্যানিসদের  সাথে আমাদের অনেক মিল খুঁজে পেলাম ।  মনে হলো এরাও আমাদের মতো  “ মানবো না বন্ধনে,মানবো না শৃঙ্খলে” তে বিশ্বাসী । শহরের মধ্যেই অনেক বাড়ির বারান্দা বা জানলাতে ভেজা জামাকাপড় শুকতে দেখলাম । অনেককেই বলতে শুনলাম ‘লা রাম্বলা’তে পকেটমার থেকে সাবধান । স্পেনের উপাদেয় খাবার পায়লা অর্থাৎ  খিচুড়ি খেলাম একটা স্প্যানিস রেস্তরাতে । আমিষ ও নিরামিষ দুরকমেরই পাওয়া যায় । ইউরোপের প্রায় সব দেশেই পর্যটকদের জন্য ‘হপ অন হপ’বাসের ব্যবস্থা আছে । যাতে করে  প্রতিটা আকর্ষনীয় স্থান দেখা যায় । বার্সেলোনার  সুন্দর স্মৃতি নিয়ে আমরা চললাম বিমানবন্দরে , মাদ্রিদের উদ্দ্যেশে ।

ফুটবলের মক্কা – মাদ্রিদ ,স্পেন

রাত্রে মাদ্রিদ পৌঁছে সোজা হোটেল । হোটেল থেকেই বিমানবন্দরে গাড়ী পাঠিয়েছিল । লন্ডন আর বার্লিনের পর ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম শহর এই মাদ্রিদ । সকাল সকাল পেট ভড়ে খেয়ে  চললাম ফুটবল স্টেডিয়াম দেখতে । বার্সেলোনার  ফুটবল স্টেডিয়াম আর  রিয়েল মাদ্রিদের স্টেডিয়াম একইরকম দেখতে লাগে  । প্রায় আশি হাজার লোক ধরে এই স্টেডিয়ামে  । সবই প্রায়  একইরকম । এই স্বাদ আজীবন মনে থাকবে । এখানে আলাপ হলো কলিকাতা থেকে ঘুরতে আসা এক বাঙালী ভদ্রলোকের সঙ্গে । জানলাম ওনি সাইয়ের কোচ ছিলেন । ফুটবলের আলোচনা আর চোখের সামনে রিয়েল মাদ্রিদের স্টেডিয়াম  , সে যে কি অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় ।

রিয়েল মাদ্রিদের স্টেডিয়াম

স্টেডিয়ামের এর সাথে এখানেও বার্সেলোনার মতো একটা ফুটবলের মিউজিয়াম আছে । সব দেখে প্রচুর ছবি তুলে বাইরে বেড়োলাম। এরপর যাবো রাজবাড়ী দেখতে । ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মতো এখানেও  ‘হপ অন হপ’ বাসে করে পুরো শহরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখা যায় । একদিনের একজনের ভাড়া ২১ ইউরো , দুদিন হলে মাত্র ২৫ ইউরো । সুইডেনের মতো বিশাল এই রাজবাড়ী । বিশাল বিশাল ঘর আর দেখার মতো সব আসবাবপত্র আর ঝারবাতির আলোয়  প্রাসাদের রূপ আমাদের দেখা সব রাজপ্রাসাদকে ছাপিয়ে গেছে ।  ইউরোপের স্থাপত্যের একটা আলাদা ধরন আছে । আমাদের রাজপ্রাসাদের সাথে এখানকার স্থাপত্যের মিল কমই পাওয়া যায় । রাজপ্রাসাদ থেকে বাইরে বেড়িয়ে এক জায়গায় পতাকা হাতে অনেক লোকের  ভিড় দেখলাম । ভাষা আলাদা কিন্তু বুঝতে পারছি কোন একটা রাজনৈতিক প্রচার চলছে । মাদ্রিতে কিছু মহিলা ও পুরুষদের মিছিল করে যেতেও দেখলাম । কোনো স্লোগান নেই , শুধু বিভিন্ন পোস্টার হাতে নিয়ে রাস্তার একদম ধার ধরে মিছিল এগোচ্ছে , রাস্তায় গাড়ি চলাচলের কোনো অসুবিধা না করে ।একটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগছিল এই ভেবে যে এখানকার লোকজন নিজেদের থেকে অন্যদের অসুবিধার কথা বেশী ভাবে ।ভাবি ,সবাই যদি এমনি করে ভাবতো তাহলে পৃথিবীর চেহারাটাই পাল্টে যেত ।

রাজবাড়ী

দুপুরবেলার খাবারের জন্য ঢুকলাম ‘দিল্লী’ নামে একটা ভারতীয় রেস্তরাঁতে । কিন্তু ভারতীয় চেহারার কাউকে পেলাম না । জানতে পারলাম অনেক বছর আগে এদের পূর্বপুরুষ এই রেস্তরাঁ খোলেন । দক্ষিণী খাবার ছাড়া সিঙ্গাড়া,পকেড়া থেকে শুরু করে সব ভারতীয় খাবারই পাওয়া যায় । কাটা চামচ দিয়ে কিছু বিদেশীদের সিঙ্গাড়া খেতে দেখলাম । মাদ্রিতে বেশ কটা ভারতীয় রেস্তরাঁ আছে ।   দুদিন ধরে ‘রয়েল থিয়েটার’, ‘প্লাজা মেয়র স্কোয়ার’, ‘গ্রান ভিয়া এভিনিউ’, ‘সান্তা আনা স্কোয়ার’,’জের্মো চার্চ’ আরো কত কি দেখলাম । মাদ্রীর তাপমাত্রা তখন ১০ থেকে ১১ র মধ্যেই ছিল । স্পেনের বার্সিলোনা আর মাদ্রিদ দুটো শহরই খুব জীবন্ত । রাস্তায় গাড়ী এবং মানুষের ভিড় আছে  । সব গাড়ীতেই হর্ন আছে কিন্তু কাউকেই তা ব্যবহার করতে দেখছিনা । একই জিনিষ অন্য দেশগুলিতেও দেখলাম ।  যেকোন দূষণের ব্যাপারে এরা খুব সচেতন । আমরা কেন হইনা ? কোন দেশেই জলের ফিল্টার নজরে পড়লো না । কলের জলই সবাই খাচ্ছে । আমরাও তাই খেলাম । আমরা প্রায় দেড় মাসের ওপর ইউরোপে ছিলাম,সব ধরনের খাবারও খাচ্ছিলাম কিন্তু একদিনের  জন্যও কারো পেটের কোনো অসুবিধা হয়নি ।অথচ এখানে আমাদের বাড়ির এক বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছু বিদেশী অথিতি এসেছিল । সব নিমন্ত্রিতদের সাথে একসঙ্গে খাবার খেলো । পরের দিন থেকে ওই বিদেশী অথিতিদের সবার পেট খারাপ । আমরা ঠিক আছি । তার মানে এটাই তো বলা যেতে পারে যে ওদের থেকে আমাদের রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেক বেশি  ।  সময় হয়েছে, রওনা হতে হবে ফিনল্যান্ড । মাদ্রিদ বিমানবন্দর ছেড়ে আমাদের নিয়ে উড়োজাহাজ আকাশে উঠলো । পিছনে পরে রইলো বেশ কিছু ভালো লাগার মুহূর্ত ।

লন্ডন নামচা

৩0.১0.২০১৫ সকাল  সাড়ে ৬টায় দমদম এয়ারপোর্ট  থেকে রওনা হয়ে  পৌঁছে গেলাম মুম্বাই । যেহেতু মুম্বাই থেকে লন্ডন যাব তাই এমিগ্রেসন মুম্বাইতেই হলো । ১টা২০ মিনিট নাগাদ সাড়ে ৯ ঘনটা টানা আকাশে ওড়ার পরে পৌঁছলাম  লন্ডনের সেই বিখ্যাত এয়ারপোর্টে  হেয়াথ্রও (Heathrow)  । ঘড়িতে বিকাল ৫টা ২0 । অবশই লন্ডনের ঘড়িতে। সব কিছু সেরে একটা ট্যাক্সি নিয়ে দুজনে চললাম হোটেল । লন্ডন শহরের মধ্যে দিয়ে ছুটে চললো  আমাদের ট্যাক্সি । দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম লন্ডন শহরকে। প্রথম বিদেশ সফর তাও আবার লন্ডন । একটু বেশীই শিহরন হচ্ছিল । বেশী সময় লাগলো না , তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেলাম হোটেলে । যেহেতু আগে থেকে বলা ছিল তাই চেক ইন করতে বেশী সময় লাগলো না।

টেমস নদী

সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়লাম লন্ডনের রাস্তায়।তাপমাএা ৮ডিগ্রি ।  হালকা কুয়াশা। রাস্তা পার হবো । কিন্তু কিছুটা দূর থেকে একটা গাড়ী আসছে দেখে   দাড়িয়ে পড়লাম । হঠাৎ দেখি গাড়ীটা আমাদের একটু আগে দাড়িয়ে গেল আর ইশারায় আমাদের রাস্তা পার হতে বললো । খুব ভাল লাগলো । কারন এসব দেখতে তো আমরা অভস্থ নই ।  আমাদের হোটেল থেকে একটু হেঁটে পৌছে গেলাম কুঈনওয়ে (Queenway) । রাস্তার দুপাশে সারি সারি ঝলমলে সব দোকান । কি নেই ? যেমনি আছে নানা দেশের খাবারের রেস্তরাঁ , তেমনি আছে নানা ধরনের জিনিষের দোকান । হঠাৎ বেবির অর্থাত্  আমার স্ত্রীর নজরে পড়ল একটা ভারতীয় রেস্তরাঁ । ডিনারের সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে,  তাই কাল বিলম্ব না করে সোজা ঢুকে পড়লাম ঐ রেস্তরাঁতে। আরে ! লন্ডনে বেঙ্গলি রেস্তরাঁ !  যদিও বাংলাদেশী, ভারতীয় নয় । বাঙ্গালি তো , মনটা আনন্দে ভরে গেল। খাওয়ার সাথে সাথে চললো অনেক গল্প । জানলাম , ওনাদের  লন্ডনে আসার কথা । রেস্তরাঁ খোলার ইতিহাস। শুভরাত্রি জানিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।

হালকা অন্ধকার থাকতেই বেড়িয়ে পড়লাম প্রাতঃভ্রমণে । কুয়াশা ভেজা ভোড় । তখনও রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা মাপেল (Maple)  পাতা পরিস্কার হয়নি । শীতের সকাল । দুজনে বেশ জোড়ে জোড়েই হাটছিলাম অপরিচিত গণ্ডির  মধ্যে । অচেনা জায়গা , অচেনা মানুষ কিন্তু যাদের সাথেই দেখা হচ্ছে সবাই হাসিহাসি মুখে বলছে ‘গুড মর্নিং’ । আমাদের ভোড় শুরু হলো এক ভাল লাগা সুন্দর উপলব্ধি নিয়ে । ফিরে এলাম হোটেলে । এই হোটেলে প্রাতরাশ কমপ্লিমেন্তারি , তাই দুজনে পেট ভর্তি করে খেয়ে নিলাম। পাউন্ডের  খরচা যত বাঁচানো যায়, আরকি। লন্ডন পাস আগে থেকে নেওয়া ছিল তাই চললাম ‘হপ অন হপ’ বাস ধরতে।নাহলে মেট্রো ধরেও ঘোরা যায় ।  কিছুটা যেতেই Bayswater road পেয়ে গেলাম। আর সাথে সাথেই বাস । লাল রঙের দোতলা বাস ।আমাদের দেশের দোতলা বাসের মত  । শুধু দোতলার উপরের অনেকটা অংশ চারিদিক থেকে  খোলা । যাতে বাইরে দেখতে কোন অসুবিধা না হয় । খোলা আকাশের নীচে শুধু বসার জায়গা । লন্ডন পাসের মজা হলো দুদিন যত বার খুশী বাসে  উঠবো টিকিট লাগবে না। যে দিকে খুশী সব দিকেই ঘোরা যাবে । যত দেখার জায়গা সব ঐ বাসে করেই দেখা যাবে। শুধুমাএ পর্যটকদের জন্যই এই ব্যবস্থা । উপরি পাওনা গাইড, যিনি বাসের ভিতর বসে সব বর্ণনা  করে যাচ্ছিলেন  । এক এক বাসে আলাদা আলাদা গাইড। ৪৮ ঘণ্টা এই পাসটা ব্যবহার করা যাবে। Madam Tussauds Museum থেকে শুরু হলো আমাদের লন্ডন পরিক্রমা। যাদুঘর  দেখতে ৪ ঘন্টার উপর লাগলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি ।সারা পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষের সব মোমের মূর্তি । কিন্তু কোন কম্যুনিস্ট নেতার মূর্তি দেখলাম না  । দেখলাম না  হিটলারের মূর্তিও ।  তারপর দুদিন  ধরে ঘুরলাম PARLIAMENT SQUARE, WEST MINISTER ABBEY, BIG BEN, THE HOUSES OF PARLIAMENT, ST JAMES PARK, BUCKINGHAM PALACE, TRAFAL SQUARE, LONDON EYE, TOWER OF LONDON এবং এক ঘনটা ধরে টেমস নদীর উপর ক্রুসে (Cruise ) ভ্রমণ । ও,  লেখতে ভুলে গেছিলাম যে লন্ডন পাসে  টেমস নদীর উপর ক্রুসে ঘুরতে কোন খরচ লাগে না । অনেক সময় নিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ালাম আর অনেক ছবি তুললাম। নদীর দুপাশ অনেকটা জায়গা বাঁধানো । পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করছিলো চারিধার । লন্ডন আই আর টাওয়ার অফ লন্ডনের কাছেও বেশ ভালই  ভিড় ছিল । প্রচুর ছবি তুললাম । বেবি আবার বেশ কিছু ভিডিও করলো। দুদিনের এই স্মৃতি সারা জীবন আমাদের মনে থাকবে। পরদিন ভোরে রওনা হবো নরওয়ে হয়ে ফিনল্যান্ড । তাই আগে থাকতেই UK র সাথে আমরা সেনজেন  ভিসাও করেছিলাম ।

ইউরোপের সিলিকন উপত্যকা – তালিন

ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৭ টা হবে । আমরা ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কির একটা কফি হাউসে বসে আছি তিনজন । আমি, আমার স্ত্রী ও আমার বড় ছেলে । নভেম্বর মাস , বাইরে ভালই ঠান্ডা । কফি খেতে খেতে ভালই আড্ডা চলছিল ।হঠাৎ আমার ছেলে বলে উঠলো – “শনিবার তালিন গেলে কেমন হয় । শনিবার রাত্রে রওনা হয়ে রবিবার ভোরবেলা তালিন পৌঁছে যাব , সারাদিন ঘুরবো তারপর আবার রাত্রে রওনা হয়ে সোমবার ভোরে হেলসিঙ্কি চলে আসবো ”। প্রস্তাবটা আমাদের মনে ধরলো । নতুন নতুন জায়গা দেখতে কার না ভালো লাগে । আর তালিনতো শুধু এস্তোনিয়ার রাজধানীই নয় , উনেস্কো (UNESCO ) ১৯৯৭ সালে এই তালিন শহরের নাম পৃথিবীর সাংস্কৃতিক হেরিটেজ সাইট হিসাবে নথিভুক্ত করেছে । শুনেছি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ফিনল্যান্ডের উপসাগরের ধারে এই তালিন শহরের উপর সবার নজর ছিল । ১৩ দশক থেকে ১৯১৮ সাল অবধি এই তালিন শহরের নাম ছিল রেভাল । এস্তোনিয়ার রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাবিষয়ক কেন্দ্র হলো এই তালিন । ভৌগোলিক অবস্থান হিসাবে এই শহরের গুরত্ব অপরিসীম । সমুদ্রপথে ৮০ কিলোমিটার দূরে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি , ৩৮০ কিলোমিটার দূরে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম এবং ৩১৯ কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ১৯৪০ সালে এস্তোনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয় । কিন্তু ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল অবধি জার্মানদের দখলে চলে যায় ।  তারপর আবার আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি তালিন বার বার উপলব্ধি করেছে । শুনেছে অসংখ্য বোমারু বিমানের কর্কশ আওয়াজ । দেখেছে বিভিন্ন দেশের সৈন্যদের আস্ফালন ।এখনো কিছু ক্ষত চিহ্ন আজও বয়ে চলেছে তালিন । প্রাকিতিক সোন্দর্য দ্বারা পরিপূর্ণ তালিন শহর আজও মধ্যযুগীয় ও আধুনিক সভ্যতার বাহক হিসাবে দাঁড়িয়ে । ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় তখন থেকে এস্তোনিয়া আলাদা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আসে ।

কফি হাউসে বসেই অন লাইনে তিনটে টিকিট কেটে ফেলা হলো । আমরা যাব ৭/১১/২০১৫ তারিখ ভাইকিং লাইনের জাহাজে , আর ফিরবো ৮/১১/২০১৫ তারিখ তালিন থেকে ।

রাত্রি ৮ টার মধ্যে ট্রামে করে পৌঁছে গেলাম হেলসিঙ্কির বন্দরে কারণ আমাদের জাহাজ ছাড়বে ঠিক রাত্রি সাড়ে ৯ টায় । তালিন যেতে তো মাত্র ৪ ঘন্টা , কিন্তু জাহাজ সারা রাত থাকবে সমুদ্রে । একদম কাক ভোরে তালিনের বন্দরে সকল যাত্রীদের নামাবে । বন্দরে পৌঁছে দেখলাম ভাইকিং লাইনের বিশাল অফিস । টিকিট কাউন্টারে যেতেই আমাদের কেবিনের বোর্ডিং পাস দিয়ে দিল । কেবিন ছাড়া ডেকে বসেও যাওয়া যায় । আমাদের যেহেতু ফিনল্যান্ডের ভিসা ছিল তাই ইউ.কে ছাড়া সেনজেন এলাকার ২৬ টা দেশে যেতে কোনো বাঁধাই ছিল না কারণ এই ২৬ টা দেশের মধ্যে যে কোনো একটা দেশের ভিসা থাকলেই হলো । সিকিউরিটি চেক শেষ করে সোজা পৌঁছে গেলাম জাহাজে ।

১০ তলা জাহাজ । এই প্রথম এত বড় জাহাজ দেখলাম । হোটেলের মত করিডরের দুপাশ দিয়ে  সারি সারি ঘর বা কেবিন ।  আমাদের কেবিনটা ছিল ৬তলাতে । তাই নীচ থেকে ওঠার সময় ভাবলাম “হিসি” করে উঠবো । “হিসি” মানে  ফিনল্যান্ডের  এর ভাষায়  লিফ্ট । মনে হচ্ছিল পাঁচ তারা হোটেল  ।  অনেকগুলো রেস্তরাঁ , ডিউটি ফ্রি সপ, পার্লার, ক্যাসিনো ,বার  কি নেই । এটাচ বাথ ওয়ালা কেবিন , আমার তো অবাকই লাগছিল কারণ  আগে জাহাজে চড়িনি তো । কেবিনে জিনিষ রেখে জাহাজ ঘুরতে বেড়ালাম । মনে হচ্ছিল পারায় বেড়াতে বেড়িয়েছি । ডেক থেকে রাতের হেলসিঙ্কি এককথায় দারূন । ডাঙা থেকে সমুদ্র একরকম ,  আর সমুদ্র থেকে ডাঙার স্বাদ অন্যরকম । রাএি ঠিক সাড়ে নটায় বাল্টিক সি এর উপর দিয়ে জাহাজে রওনা হলাম তালিনের উদ্দেশ্য ।  ধীরে ধীরে ডাঙা মিলিয়ে গেল । যেদিকে তাকাই  শুধু জল আর জল আর মাথার উপর বিশাল আকাশ । এত বড় আকাশ আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না ।

ভোড় হতেই তালিনের মাটিতে পা রাখলাম । যেহেতু আমাদের বড় ছেলে  তালিন আগেও এসেছে তাই ঐ আমাদের সব চিনিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো । তালিনের দুটো দিক -একটা মধ্যযুগীয়  ও  আরেকটা আধুনিক ।   আধুনিক সভ্যতার কনক্রিটের জঙ্গল প্রায় আমাদের সবজায়গাতে গ্রাস করে নিচ্ছে , তাই  আমরাও চললাম পুরানো শহরের দিকে । মনে হচ্ছিল স্বপ্নপুরী ।

ফেয়ারি টেলস’  এর বাড়ীঘরের মতো সব বাড়ী ,

‘ফেয়ারি টেলস’  এর বাড়ীঘরের মতো সব বাড়ী ,    অপূর্ব , মধ্যযুগীয় স্থাপত্য । কিছু কিছু রেস্তরাঁর সাজসজ্যা এমন ভাবে করা যেন মনে হচ্ছে ঐ সময়টাকে ধরে রেখেছে । হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল মাঝে মাঝে , আর ঠান্ডা ছিল ভালই । ‘মহারাজা’ নামে একটা ভারতীয় রেস্তরাঁও দেখতে পেলাম । নানা দেশীয় পর্যটকদের ভিড় । ভাবছিলাম সারা পৃথিবীর যদি একটাই ভাষা হতো তাহলে কি মজাটাই না হতো । দারূন দেখতে বেশ কয়েকটি চার্চ দেখলাম । তার মধ্যে অন্যতম সেন্ট মেরি ক্যাথেড্রাল বা ডোমে চার্চ  । একটা রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ দেখলাম যার নাম আলেক্সান্ডার নেভস্কি ক্যাথেড্রাল । অপূর্ব সব কারুকার্য । মন ভরে যায় । পায়ে হেঁটেই সব ঘুরছি । বৃষ্টি আর ঠান্ডা আবহাওয়া পর্যটকদের আনন্দের কোনো বাঁধাই সৃষ্টি করতে পারছে না ।

‘তূম্পিয়া কাসল

দেখলাম এস্তোনিয়ার পার্লিয়ামেন্ট যার মধ্যযুগীয় নাম ‘তূম্পিয়া কাসল’ । অনেক সুন্দর সুন্দর দোকান , ভূটিয়া মার্কেটের মতো একটা মার্কেটও দেখলাম । ফিনল্যান্ড থেকে এখানে জিনিষের দাম কিছুটা হলেও সস্তা । খাওয়া দাওয়া সেরে একটা ট্যাক্সি  নিয়ে ছুটলাম সমুদ্রের ধারে ৩১৪ মিটার উঁচু এক ওয়াচ টাওয়ার দেখতে। দুপাশে ঘন সবুজ গাছপালার মধ্য দিয়ে সুন্দর রাস্তা । মনে করিয়ে দেয় ডুয়ার্সের লাটাগুরির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা । এখানে সব গাড়ীই লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ । মস্কো অলিম্পিক এর সময় এই টাওয়ার তৈরী হয়ে ছিল । ইতালির আইফ্ফেল টাওয়ার থেকে ১২ মিটার উঁচু । টিকিট কেটে লিফটে করে এ সোজা উঠে গেলাম উপরে , পাইন গাছে ঘেরা পুরো তালিন শহর আমাদের চোখের সামনে । আর একদিকে দেখতে পারছি দিগন্ত জুড়ে নীল জলরাশি । মনের ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে রইলো এই দৃশ্য । ছেলের কাছেই শুনলাম এই তালিন শহর বেশ কিছু ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির জন্মস্থান । যার মধ্যে অন্যতম SKYPE

প্রচুর ছবি আর ভিডিও নিয়ে চললাম তালিনের বন্দরে যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভাইকিং লাইনের জাহাজ । সোজা চলে গেলাম ডেকে । দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম অপূর্ব সুন্দর এক শহরকে । মনের ক্যামেরায় হারিয়ে গেছিলাম । সম্বিত ফিরে পেলাম জাহাজ চলতে শুরু করাতে । ধীরে ধীরে তালিন ছোট হতে হতে দূর আকাশের মধ্যে মিলিয়ে গেল ।

স্বপ্নের শহর -ফিনল্যান্ড

২৬/০৭/২০১৬  সকাল ১১.৪০ মিনিটে দমদম এয়ারপোর্ট থেকে রওনা হয়ে দিল্লী পৌছালাম দুপুর ২.২০ মিনিটে । বাইরে বেরোনোর সময় জানতে পারলাম ট্যাক্সি আর অটো দুটোই স্ট্রাইক । ওলা আর উবেরের বিরুদ্ধে  । পরদিন সকাল সাড়ে দশটায় আমাদের প্লেন ছাড়বে দিল্লী থেকে । সোজা হেলসিঙ্কি । এবার ফিনল্যান্ডের ভিসার জন্য আর দিল্লী আসতে হয়নি , কোলকাতা থেকেই হয়ে গেছে । আর ফিনল্যান্ডের ভিসা থাকা মানে ইউ .কে ছাড়া ইউরোপের ২৬ টা দেশে যেতে কোনো অসুবিধা রইলো না । কোনো একটা দেশের ভিসা থাকলেই হলো । দুঘন্টার একটু আগেই পৌছে গেলাম এয়ারপোর্ট । বোর্ডিং পাস নিয়ে , লাগেজ জমা করে এগোলাম ইমিগ্রেশনের জন্য । তারপর সিকিউরিটি চেক সেরে অনেকটা হেঁটে ১০ নম্বর গেটের কাছে গিয়ে অপেক্ষায় রইলাম । ঠিক সাড়ে দশটায় রওনা হলাম দিল্লী থেকে হেলসিঙ্কি । পৌছালাম ওদের সময় অনুসারে ঠিক তিনটে পাঁচ মিনিটে অর্থাৎ আমাদের সময় অনুসারে বিকাল ৫ টা ৩৫ মিনিট । প্লেনে বসেই  শুনতে পেলাম আমাদের যাত্রাপথ হবে  ৫৬০০ কিলোমিটার । দিল্লি থেকে আফগানিস্থান ও মস্কোর আকাশপথ ধরে সোজা হেলসিঙ্কি । একসময় টিভিতে দেখতে পেলাম আমরা ৩৮০০০ ফিট ওপর দিয়ে যাচ্ছি । বাইরের তাপমাত্রা তখন  -৫২ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেড । আমাদের প্লেনের গতি ছিল ঘন্টায় ৮৭৮ কিলোমিটার । এক লাইনে ৮ জন করে বসার জায়গা । চারশোর  ওপরে যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয় । এয়ারপোর্টে ছেলে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য । গাড়ি নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখি ঝকঝকে আকাশ । যেদিকে তাকাই নীল  আর নীল । সূর্যের আলো দেখে মনে হচ্ছে দুপুর দুটো ।গতবার ২/১১/২০১৫ তারিখ লন্ডন থেকে ফিনল্যান্ড এসেছিলাম তখন শীতকাল ।দেখেছি বিকাল ৩ টার মধ্যেই সূর্যদেব ঘুমিয়ে পড়তেন  কিন্তু এখন শুনলাম ভোর ৪ টা থেকে রাত ১১ টা অবধি ওনি  জেগে থাকেন ।আর ১১ টা থেকে ৪ টাও পুরো অন্ধকার হয়না , গ্রহনের সময়কার মত আলো থাকে । গতবার শীতের সময় গাছের পাতা সব ঝরে গেছিল , গাছের রঙ  ছিল সাদা , প্রচুর বরফ পেয়েছিলাম ।এবার সবুজ রঙের আস্তরণে সারা শহর ঢাকা পরেছে । সত্যি সত্যিই নানা রঙের  ফুল বলছে- ধন্য আমি মাটির পরে । গতবার ঘাসের রঙ ছিল সাদা আর এবার ঘাস তার নিজের রঙ ফিরে পেয়েছে ।যেহেতু এখানে এখন সামার চলছে , সবাই যেন বাঁধন হারা পক্ষী । ঘরে থাকতে কারো মন চাইছে না ।রাস্তায় প্রচুর লোকজন দেখা যাচ্ছে । মনে হচ্ছে , কি আনন্দ আকাশে বাতাসে । সবাই প্রাণ ভরে উপভোগ করছে সময়টাকে । এখানকার সামার আমাদের বসন্ত ও শীত কাল ।কাছেই বাড়ি । তাই পৌছে গেলাম তাড়াতাড়ি  ।

গতবার ছিলাম হেলসিঙ্কি এবার আছি এসপো । হেলসিঙ্কির গায়ে লাগানো এই শহর । একটা দিন শুধু ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলাম শরীরটাকে  এখানকার মত মানিয়ে নেবার জন্য । বিকালে ১৫মিনিট হেঁটে পৌছে গেলাম সমুদ্রের ধারে ।এখানকার সৈকত খুব একটা বড় না । বাচ্চারা সমুদ্রের জলে লাফালাফি করছে কারণ ঢেউ নেই বললেই চলে । বালিতে রোদের মধ্যে অনেকেই শুয়ে আছে । এই সময়টা এখানকার সবাই যতটা পারে শরীরকে রোদের মধ্যে রাখে কারণ শীতকালে সূর্যের আলো খুব কম সময়ের জন্য থাকে এবং তেজও থাকে অনেকটা কম । সমুদ্রের ধারের রাস্তায় জগিং করতে দেখলাম অনেককেই ।এমনি করেই সময় বয়ে যাচ্ছিল । চমকে উঠলাম ঘড়ি দেখে । রাত দশটা বাজে অথচ বোঝার উপায় নেই সূর্যের আলো দেখে । মনে হচ্ছে পড়ন্ত বিকেল ।

গতবারের মত এবারেও ছেলে আমাদের জন্য পাস নিয়ে এলো যাতে আমরা ট্রেনে, বাসে,মেট্রোতে,ট্রামে অনায়াসে ঘুরতে পারি । আলাদা করে টিকিট কাটতে হবেনা । এক পাসেই সব । মনে পড়ে যাচ্ছিল গত ৭/১১/২০১৫ সকাল সকাল আমরা মেট্রো ধরে, তারপর ট্রামে করে গেছিলাম সমুদ্র সৈকতে । বাল্টিক সি বা সমুদ্র , খুবই শান্ত । স্টিমারে করে সোজা চলে গেছিলাম ‘সৌমেনলিনা দ্বীপ’ । মুম্বাইয়ের ‘গেট অফ ইন্ডিয়া’ থেকে ‘এলিফান্টা’ যাওয়ার মতো । স্টিমারে কুড়ি মিনিট মতো লাগে । ছোট্ট একটা দ্বীপ । ইউনেস্কোর হেরিটেজ লিস্টে এই জায়গাটার নাম আছে । ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অনেক নিদর্শন এখানে দেখা যায় । যুদ্ধের জন্য বানানো দূর্গ । ঐ সময়কার দুটো কামানও এখানে রাখা আছে ।

‘সৌমেনলিনা দ্বীপ’

চারিদিকে সমুদ্র । অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা । পিকনিক করার পক্ষে আদর্শ । গরমের সময় এখানকার লোকেরা পিকনিক করে ,আমাদের উল্টো । কারণ এখানকার গরমকালে অনেকক্ষণ সূর্য থাকে এবং ঠান্ডা বেশ কিছুটা কম । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ফিনল্যান্ড বা জার্মানির লড়াইয়ের ইতিহাসে এই জায়গা ও ল্যাপল্যান্ডের অনেক ঘটনা আছে । মস্কো মাত্র ১০২০ কি.মি দূর । যাইহোক ইতিহাসের আলোচনায় যাচ্ছিনা । এখানে একটা সুন্দর চার্চ আছে । বেশ কয়েকটা রেস্তরাঁ ও একটা ছোট জাদুঘর  আছে । যানবহনে ফিনল্যান্ডে আমাদের দেশের মতো অত শ্রেনী বা ক্লাস নেই । ট্রামে , ট্রেনে একটাই শ্রেনী । যাত্রী সংখ্যা আমাদের দেশের থেকে অবশ্যই অনেক কম । ট্রামে , বাসে , ট্রেনে জিনিষ তুলতে বা পেরাম্বুলেটারে একদম ছোট বাচ্চাকে নিয়ে উঠতে এখানে কোন কষ্টই হয়না, কারন সিড়িটা রাস্তার বা স্টেশনের প্লাটফর্মের সমান হয়ে যায় । বয়স্কদের উঠতেও কোন কষ্ট নেই ।  খোঁজ নিয়ে যেটুকু জানলাম তাতে এখানকার মানুষের মাসের মাহিনার তারতম্য আমাদের দেশের মতো নয় । কম আর বেশির মধ্যে পার্থক্য বেশিনা । শিক্ষা এবং স্বাস্থের জন্য এখানকার নাগরিকদের কোনো দাম দিতে হয় না । সব জায়গাতে হাসপাতাল ,স্কুল এবং খেলাধুলা করার ব্যবস্থা আছে । রাস্তাঘাটে কোথাও পুলিশ নেই অথচ সব কিছু নিয়ম ধরে চলছে । রাস্তায় কোন কুকুর নেই । রাস্তায় কেউ কিছু ফেলেনা সবাই পরিস্কার রাখে । থুথু নৈব নৈবচ । এখানে বাইরে  ঠান্ডা থাকলেও বাসে,ট্রেনে,ট্রামে,দোকানে, ঘরে সর্বত্র সাধারণ তাপমাত্রা মানে ২১ থেকে ২২ ডিগ্রী । দারুনভাবে এরা বজায় রাখে । আর খাওয়ার জল সর্বত্রই একইরকম । যেখান থেকে খুশী জল খাওয়া যায় । লন্ডনের হোটেলে তো বাথরূম থেকেই খাবার জল নিচ্ছিলাম । বাথরূম এত পরিস্কার যে কোন ঘেন্না হয়না । কোন দেশেই জলের জন্য আলাদা কোনো ফিল্টার দেখলাম না । রাস্তাঘাটে গাড়ী,ট্রাম,বাস,মানুষের ভিড় সবই দেখলাম কিন্তু কোন গাড়ীর হর্ন শুনতে পেলাম না । যেকোন দূষণের ব্যাপারে এরা খুবই সচেতন । সচেতনতা সাধারন মানুষের রক্তে মিশে গেছে বলে আমার মনে হয় ।

গতবার ১৯/১১/২০১৫ মানে যেদিন অনেক রাত্রে স্পেন থেকে ফিরলাম , সেদিনই রাত্রে হেলসিঙ্কিতে প্রচুর বরফ পড়েছিলো ।  চারিদিক ছিল সাদা । তাপমাত্রা ছিল  -৭ ডিগ্রী  । ছবি তোলার জন্য বাইরে বেড়িয়ে পড়েছিলাম । মন আনন্দে উড়তে লাগছিলো  । অনেক ছবি তুলেছিলাম । তার ঠিক দুদিন পরে আবার বরফ পরা দেখেছিলাম দুপুরবেলা । অনেকদিন আগে বরফ পড়তে দেখেছিলাম কেদারনাথে আর ঐদিন পেলাম  । পাজা তুলার মতো বরফ নাচতে নাচতে নীচে নেমে আসছিল  । সবকিছুকে সাদা আস্তরণে ঢেকে দিচ্ছিল  ।

বিভিন্ন রঙের গাড়ি যেগুলো পার্কিংয়ে দাড়িয়ে ছিল ,সবার রঙ ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেছিল ।এতো পাহাড় নয় , শহর ।মুহুর্তের মধ্যে রাস্তা থেকে বরফ পরিস্কার করার গাড়ি এসে গেছিল । কিছুক্ষণ পরেই আবার সব কিছু আগের মতন । নরওয়ে , সুইডেন ,তালিন , ল্যাপল্যান্ড , ডেনমার্ক সবকটা জায়গাই কাছাকাছি । একসাথেই  ঘুরে আসা যায় ।আজকাল অনেক টুর অপেরাটের এইসব জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে বা  ঘোরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে ।

ইউরোপ খুব ভাল লাগলো । প্রতিটা জায়গাই ভালবেসে ফেলেছি ।  এখানে প্রায় সবকটা বড় বড় মলেই ঘুরলাম ।  মলে কোথাও কোন সিকিউরিটির লোক চোখে পড়লো না । প্যাকেট বা ব্যাগ কোন কিছুই মলের বাইরে জমা রাখতে হয়না । মানুষের প্রতি বিশ্বাস  ,এটা খুব ভাল লাগছিল ।   এখানে সবাই স্বাবলম্বী । সব কিছু নিজেদেরকে করতে হয় । আমাদের দেশের মতো অত কাজের লোকের উপর নির্ভর করে এখানে চলা যাবেনা । বয়স্করা নিজেরাই নিজেদের জিনিষ বহন করে । তার জন্য ট্রলি ব্যাগ  আছে । যাদের হাঁটতে অসুবিধা তাদের জন্য ছোট্ট অথচ চালানো সহজ ব্যাটারী চালিত গাড়ীর ব্যবস্থা আছে । ছোট ঐ গাড়ী নিয়ে সর্বত্র যাওয়া যায় । ভারতীয় শাক সব না পাওয়া গেলেও সবজি  প্রায় সবই পাওয়া যায় । দেখতে কোন কোনটা একটু আলাদা । যেমন শশা প্রথমে আমরা কিনতে গিয়ে চিনতেই পারিনি । মাছ পাওয়া যায় অন্য ধরনের ।  মাংস সবই পাওয়া যায় । ফলও প্রায় সবই । মিষ্টির দোকান দেখিনি । শুধু জিলিপি পাওয়া যায় । ইরানীদের দোকানে । যদিও জানি  জিলিপির উদ্ভব ভারতবর্ষ নয় । বেশ কয়েকটি ভারতীয় দোকান এখানে আছে যেখানে ভারতীয় মশলা সব পাওয়া যায় । যত জায়গা ঘুরলাম সব জায়গাতে পুলিশ আর ট্যাক্সি র উচ্চারণ এক । বানান আলাদা হতে পারে ।  আরেকটা ব্যপার আমাদের নজরে এসেছে । এখানে জানলায় , বারান্দায় কাচ লাগানো কিন্তু কোন গ্রিল বা  লোহার শিক নেই । আমরা ভাবতেই পারিনা । অনেক আগে সিকিমে দেখেছিলাম ।  কিন্তু সেটাতো পাহাড় । চুরি , ছেনতাইয়ের কোন গল্প এখানে নেই ।  মিশে দেখলাম সব ব্যাপারে এনারা ভালই খবর রাখে । ব্যবহার সুন্দর । অহেতুক কৌতুহল নেই । কাউকে আঘাত করে মজা করে না । সোজাসুজি কথা বলতে পছন্দ করে । শুনলাম এখানে দুটো দূর্গাপূজা হয় । একটা ভারতীয়দের আর একটা বাংলাদেশীয়দের । গতবার পার্ভো ঘুরে এসেছি তাই এবার আর যাচ্ছিনা । পার্ভো , ফিনল্যান্ডের   দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর । এই শহর অতি প্রাচীন । ১৩০০ খৃষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন হয় । শহরের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের জল প্রবেশ করাতে জায়গাটা অনেকটা ভেনিসের মত লাগে । মধ্যযুগীয় এই শহর আবার অনেকটা তালিনের মতো দেখতে । তালিনের বাড়ীঘর ছিল পাথরের তৈরি আর এখানকার বাড়ীঘর কাঠের । এছাড়া দেখতে একইরকম ।

পার্ভো

পার্ভো ঘুরে আমরা নোকিয়ার অফিস মানে এখন যেটা মাইক্রোসফটের অফিস, দেখতে এস্পো  গেছিলাম । ‘নোকিয়ানভিরতা’ নদীর পাশে মাইক্রোসফটের বা নোকিয়ার বিশাল অফিস । জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর । গতবারই পার্লামেন্ট , স্টেডিয়াম , জাদুঘর সবই দেখা হয়ে গেছিল । তাই এবার বেছে বেছে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে । এখান থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে একটা দারুন পিকনিকের জায়গা আছে শুনলাম । জঙ্গল , লেক এবং ছোট পাহাড় , সবই আছে । জায়গাটার নাম নুউক্সিও  । ঘুরে আসলাম । দারুন লাগলো জায়গাটা । আরো অনেক প্রোগ্রাম হচ্ছে , লেখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে । ইউরোপের কয়েকটা দেশ দেখার পর ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যে প্রযুক্তিবিদ্যাতে আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই । কিন্তু প্রযোগ করে আমাদের দেশে কম সংখ্যক মানুষ । পরিকাঠামোতে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে । যদিও আমাদের পিছিয়ে থাকার কথা নয় । আমাদের দেশের বেশিরভাগ জায়গায় শহর আর গ্রামের মধ্যে সুযোগ সুবিধার পার্থক্য অনেক । এখানে সেটা নেই বললেই চলে । সমস্যার কথা বলতে গেলে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা চলে আসতে বাধ্য । তাই এখানে ইতি টানছি ।

নুউক্সিও / NUUKSIO NATIONAL PARK, FINLAND

রাত্রে গরম গরম আটার রুটি, আলু -ফুল কপির তরকারী ও হাতে বানানো নারু  খেতে খেতে হঠাৎ ছেলের কাছে ওর বন্ধুর ফোন আসলো । আগামীকাল পিকনিকে যাবো কিনা ? মালদা থেকে ওর শ্বশুর – শ্বাশুড়ি এসেছে । সবাই মিলে একসাথে যেতে চায় । আমরাতো সব ব্যাপারে হাত উঠিয়েই আছি । ঠিক হয়ে  গেল আমরা সকাল সকাল বেড়িয়ে পরবো কিছু খাবার নিয়ে । এখান থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে একটা দারুন পিকনিকের জায়গা আছে শুনলাম । জঙ্গল , লেক এবং ছোট পাহাড় , সবই আছে । জায়গাটার নাম নুউক্সিও (NUUKSIO) । ওখানে রান্না করতে দেবে না , নিয়ে গিয়ে খাওয়া যাবে ।ভোর ভোর উঠে কিছু খাবার বানিয়ে নিলেই হবে , তাই আপাতত চললাম বিছানায় । নুউক্সিওতে পৌছে দেখি ওরা চারজন পার্কিংয়েই দাঁড়িয়ে আছে । আমাদের একটু আগে ওরা পৌছেছে । আমরা তিনজন আর ওরা চারজন একসাথে জিনিষ পত্র নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম । এখানে পার্কিংএর জন্য  ও জঙ্গলে ঢোকার জন্য কোনো মূল্য দিতে হয় না । ভালই ভিড় । শনিবার সব ছুটি, তার উপরে এখানকার সামার । দলে বেঁধে সব বেড়িয়ে পরেছে আনন্দ উপভোগ করতে । অনেকের সাথে আমরাও জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগোলাম । একটু এগোতেই নজরে পরলো গাছের গায়ে লাল , নীল আর হ্লুধ রঙ করা তিনটে কাঠের টুকরো লাগানো আছে । যেহেতু মন সবসময় জানার মাঝে অজানাকে সন্ধান করে তাই জানতে চাইলাম ছেলের কাছে । ও বললো এই  জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ে অনেককটা ট্রেকিং রুট আছে । জঙ্গলে যাতে কেউ রাস্তা না হারিয়ে ফেলে তার জন্য এই ব্যবস্থা । লাল , নীল আর হ্লুধ রঙের আলাদা আলাদা কাঠের টুকরো জঙ্গলের মধ্যে বিভিন্ন গাছে লাগানো আছে । রাস্তা চেনানোর জন্য । তাইতো । বেশ কজনকে দেখলাম পিঠে স্যাক , টেন্ট আর স্লীপিং ম্যাট নিয়ে যেতে । জঙ্গলের মধ্যে  বিভিন্ন রঙের মাশরুম বা বেঙের ছাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । হঠাৎ নজরে পড়ল ছোট ছোট গাছে প্রচুর পাকা ব্লু বেরি । কোনদিন খাইনি তাই ঝাপিয়ে পরলাম ।অরণ্যের অধিকার । তাকিয়ে দেখি আমি শুধু একা নয় , ওদেশের লোকও আছে । কয়েকটা মুখে পুরে আবার হাটতে লাগলাম । একটা রাস্তা সোজা উপরে উঠে গেছে আর একটা ডান দিকে গিয়েছে বেঁকে । ডান দিকের রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম । ঝাউ আর ব্লু বেরি  গাছ ছাড়া আমাদের কাছে নাম না জানা গাছের সংখ্যাই বেশি । শুনলাম এটা নাকি ফিনল্যান্ডের জাতীয় উদ্যান । ৪৩ টা  ছোট বড় মিলিয়ে লেক আর জলাভূমি অনেকটা জায়গা দখল করে আছে । একদিক থেকে আরেকদিকে যাওয়ার জন্য জলের ওপরে কোথাও আছে ভাসমান সেতু , আবার এমনি সেতুও আছে । দূরে ছিপ নিয়ে একজনকে মাছ ধরতেও দেখলাম । লেকের জলে দেখলাম বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি যেটা আমরা দেখতে পাই আমাদের দেশে শীতকালে । ওদিকে আর না এগিয়ে আমরা কিছুটা ফিরে এসে যে রাস্তাটা ওপরের দিকে গেছে সেইদিকেই হাঁটতে লাগলাম । ছোট পাহাড় । পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকদিনের এবং আনন্দেরও । তর তর করে উঠতে লাগলাম । কিছুটা উঠতেই চোখ জুড়িয়ে গেল । পাইন গাছে ঘেরা সুন্দর একটা লেক । জলের উপর ভাসছে অসংখ্য পদ্মপাতা । লেকের পাশে তাঁবু খাটিয়ে একদল ছেলে মেয়ে আনন্দ করছে । কেউ কেউ আগুন জালিয়ে খাবার গরম করছে । আগুন জালানোর কাঠ এখানে বিনা পয়সায় পাওয়া যায় । জঙ্গলের মধ্যে বেশ কটা টয়লেট বানানো । সবার চেষ্টায় সবসময়ই পরিস্কার । আমরা বাড়ির থেকে অভ্যাস মত বিছানা চাদর এনেছি  তাই লেকের পাশে বিছিয়ে আড্ডা মারতে বসলাম । আর কাউকে বিছানার চাদর পেতে বসতে দেখিনি । শুনলাম এই লেকের জল শীতকালে বরফ হয়ে যায় । তখন সবাই এর উপর দিয়ে যাতায়াত করে । চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন দলে সবাই আনন্দ করছে । আমদের দেশের পিকনিকের মতোই । নেই শুধু বিভিন্ন মাইকের আওয়াজ । আমাদের দেশে দেখেছি বেশিরভাগ সময়ে অহেতুক শাসন ছোট বাচ্চাদের স্বাধীনভাবে আনন্দ করতে দেয় না । এখানে ছোট বাচ্চাদের অপরিসীম আনন্দ দেখতে খুব ভালো লাগছিল আর রাগ হচ্ছিল আমদের দেশের অতিরিক্ত শাসন প্রিয় বাবা-মার প্রতি । প্রাকিতিকভাবে বাচ্চাদের বড় হওয়া যে কতটা দরকার সেটা আমরা অনেকেই করতে দিই না । তোতা কাহিনী । নির্ভেজাল আড্ডা ,মনোরম পরিবেশ মাতিয়ে রাখলো আমাদের সারাদিন । সারাদিন সবাই নানারকম ভাবে আনন্দ করলো অথচ জায়গাটা একটুও নোংরা হলো না । এরাই কি শুধু দেশটাকে ভালবাসে !

হ্যানকো (Hanko), ফিনল্যান্ড

শনিবার হ্যানকো (Hanko) যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু বাদ সাধলো আবহাওয়া দপ্তর । আবহাওয়া দপ্তর জানালো শনিবার আকাশ থাকবে মেঘাচ্ছন্ন ও  বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা প্রবল ।   রবিবার আকাশ থাকবে ঝকঝকে ও   বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে । এখানে আবহাওয়া দপ্তরের খবর মোটামুটি মিলে যায় । তাই  ঠিক হলো রবিবার সকালে রওনা হয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে আসবো ।হেলসিঙ্কি থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে প্রাকিতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি বন্দর শহরের নাম হলো হ্যানকো । দুটো পরিবার সাথে কিছু খাবার আর জল নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম সকাল সকাল । এসপো পার হতেই শহর ছাড়িয়ে পারি দিলাম গ্রামের পথে । ঘন সবুজ অরণ্যের মধ্যে দিয়ে উঁচু-নিচু ঝকঝকে রাস্তা । আরো কিছুটা যাওয়ার পর দেখলাম দুপাশের বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে চলছে চাষাবাদ । যেহেতু এখানকার জমি সমান নয় ,উঁচু আর নিচু ক্ষেতগুলিও নিচ থেকে বেশ কিছুটা ওপরে উঠে আবার নিচে নেমে গিয়ে আবার উঠেছে ওপরে। মিরিকের রাস্তার চা বাগানের কথা মনে করিয়ে দেয় । এখানে রাস্তায় যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করানো যায় না তাই চলন্ত অবস্থায় ছবি নিতে বাধ্য় হয়েছি । অসাধারণ দৃশ্য । চেখ ফেরানো যায়না । প্রায় দুঘন্টার ওপর লাগলো হ্যানকো পৌঁছাতে । পৌঁছেই দেখি সামনে দিগন্ত জুড়ে নীল জলরাশি । শুনলাম ১৩০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে রয়েছে এই সমুদ্র সৈকত ।অসংখ্য মানুষ শুয়ে আছে বালির ওপর । এসপোতেও একই জিনিস দেখেছি । সারা শরীরে রোদ লাগাতে ব্যস্ত এখানকার মানুষজন । সমুদ্রের ঢেউ নেই তাই জলের মধ্যেই বাচ্চাদের জন্য নানা ধরনের খেলার ব্যবস্থা করা আছে । বাচ্চারা তিন চার ঘন্টার আগে কেউ জলের থেকে উঠছেনা । বেশ কজন ছেলে মেয়েদের দেখলাম রবারের নৌকাবিহারে  মত্ত । এখানকার লোকেরা এই সামারে পরিবার নিয়ে সারাদিন সমুদ্র সৈকতে আনন্দ করতে ব্যস্ত । আমাদের মতো পর্যটকের সংখ্যা এখানে খুবই কম । সমুদ্রের মধ্যে বেশ কটা দ্বীপও দেখা যাচ্ছে । হ্যানকো ফিনল্যান্ডের এক নামকরা বন্দর । নানাধরনের ছোট – বড় অনেক পালতোলা নৌকা দেখা যাচ্ছে বন্দর জুড়ে । মাঝে মাঝেই নৌকা নিয়ে সমুদ্র বিহারে নেমে পরছে এখানকার লোকজন । গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বেরোবার মতো আরকি। সারাদিন ধরে সারা শহর ঘুরে বেড়ালাম । সাজানো গোছানো সুন্দর একটা চার্চ দেখলাম । সমুদ্রের ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে গোলাপী রঙের জল মিনার । হ্যানকো থেকে বেড়িয়ে এগিয়ে চললাম আরেকটা গ্রামের দিকে । দুপাশে জবের ক্ষেত ।  গ্রামের বাড়িগুলো কি সুন্দর , ছোট ছোট বাংলোর মতো । কাঠের বাড়ি , মাথায় টিনের চাল । মাঝে মাঝে মনে হয় আগে থেকে পরিকল্পনা করে একটা দেশ তৈরী করা হয়েছে । সবকিছু জায়গা মত । গ্রাম ছাড়িয়ে আবার পড়লাম জঙ্গলের মধ্যে । দুপাশে ঘন জঙ্গল । হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি ছোট ছোট কটা বল্গা হরিনের বাচ্চা রাস্তা পার হচ্ছে । এ এক বিরল  অভিজ্ঞতা । বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা তখনও আকাশে রয়েছে সূর্যের আলো । আর সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সবার চেখে মুখে ।অকৃত্রিম এক আনন্দ ।

হেলসিঙ্কি , ফিনল্যান্ড

বাড়ির সামনে চারটে বড় বড় বাজার আছে যেখানে সব পাওয়া যায় । তিনটে বাজার মলের মধ্যে ও আরেকটা এশিয়ান বাজার , কাছেই একটা বাড়ির নিচের তলায় । হঠাতই এশিয়ান বাজারে একটা ভালো ইলিশ মাছ পাওয়া গেল । কালো জিরাও এশিয়ান বাজারেই পাওয়া গেল । গোটা সর্ষে আমরা দেশ থেকে নিয়ে এসেছি কিন্তু তেল ? অনেক রকমের তেল আছে কিন্তু সর্ষের তেল পাচ্ছিনা । কাছাকাছি সব দোকান দেখা হলো । কোথাও নেই । ইলিশ মাছ সর্ষের তেল ছাড়া ভাবতেই পারছি না । ছেলে বললো ওর অফিসের সামনে একটা ভারতীয় বাজার আছে । কাল ওখানে খোঁজ করবে । মনে পড়ল গতবার ওখান থেকেই সর্ষের তেল এনেছিলাম । অবশেষে পাওয়া গেল সর্ষের তেল । ফিনিসে ইলিশ খাওয়ার স্বাদ পূর্ণ হলো ।

ফিনল্যান্ডের  ওপর দিয়ে উড়োজাহাজে আসার সময় জানলা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখছিলাম নীল জল আর সবুজ বন । পরে বুঝলাম নীল জল হলো বাল্টিক সি সহ অসংখ্য লেক এবং সবুজ বন হলো সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগুনতি গাছ পালা । আমাদের দেশে শীতের পর আসে বসন্ত কাল আর এখানে বসন্তের পরে শীত । সারা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ম্যাপেল গাছ । সারা পৃথিবীতে প্রায় ১২৫ রকমের ম্যাপেল গাছ আছে । বাড়ির সামনে যতগুলো ম্যাপেল গাছ দেখছি পাতার রঙ এখন ঘন সবুজ । শীতকালে সব পাতা ঝরে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে নানা রঙে । বোঝা যাবে বসন্ত জাগ্রত দ্বারে । লন্ডনেও গতবার এমনি শোভা দেখেছিলাম ।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমানুসারে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা এক নম্বরে । স্কুলের বাইরে এখানে টিউসনের কোনো দরকার নেই । আর আমাদের দেশে টিউসন ছাড়া চলবে না। ছেলেমেয়েদের বইয়ের ব্যাগ নিয়ে টিউসন যেতে এখানে দেখা যায় না। অনেক চেষ্ঠা করেও পান আর গুটকা খেতে এখানে কাউকে দেখিনি । রাস্তা – ঘাটে , স্টেশনে , সমুদ্র সৈকতে কোথাও দেখতে পাইনি পান আর গুটকার দাগ ।সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র আমাদের দেশবাসী । গতবার ভিসার জন্য দিল্লী যেতে হয়েছিল । এখন কলকাতাতে অফিস হওয়াতে আর দিল্লী যাওয়ার প্রয়োজন নেই ।তিন মাসের বেশি ভিসার দরকার হলে শুধু দিল্লী যেতে হবে ।

কাল বিকালে এসপো থেকে ১৩২  নম্বর বাস ধরে চললাম হেলসিঙ্কি । যেহেতু এখানে বাঁদিকে গাড়ির স্টিয়ারিং তাই বাস ধরার জন্য আমাদের দেশের উল্টোদিকে দাঁড়াতে হয় । সামনের গেট দিয়ে এক এক করে সবাই উঠে ড্রাইভারের কাছ থেকে টিকিট কেটে ভিতরে যাচ্ছে । আর যাদের বাস কার্ড আছে তারা গেটের সামনেই একটা ছোট মেসিন আছে তার সামনে কার্ডটাকে ধরতে হচ্ছে । বাসগুলো আমদের দেশের এসি বাসের মতো । শুধু দরজা আর ড্রাইভারের বসার জায়গা উল্টোদিকে ।

সৌমেনলিনা দ্বীপ’ , ফিনল্যান্ড

আমার ছোট ভাইয়ের বড় মেয়ে থাকে জার্মানি । আমাদের কাছে ফিনল্যান্ডে কয়েকদিনের জন্য় বেড়াতে এসেছে । তাই আবার ঠিক হলো সৌমেনলিনা দ্বীপ’ যাওয়ার । ১৭ ই অগাস্ট  বিকালে আমরা সবাই মিলে   স্টিমারে করে সোজা চলে গেলাম ‘সৌমেনলিনা দ্বীপ’ । মুম্বাইয়ের ‘গেট অফ ইন্ডিয়া’ থেকে ‘এলিফান্টা’ যাওয়ার মতো । স্টিমারে কুড়ি মিনিট মতো লাগে । ছোট্ট একটা দ্বীপ । অসাধারণ জায়গা ।চারিদিকে সমুদ্র তার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটা জায়গা যেখানে ৩০০০ হাজার বছর আগেও মানুষ ছিল তার নিদর্শন পাওয়া যায় । ইউনেস্কোর হেরিটেজ লিস্টে এই জায়গাটার নাম আছে ।আমাদের দেশে পাথরে বানানো বিভিন্ন দুর্গের মত এখানে চারিদিক ঘেরা একটা দুর্গ আছে ।চারদিকে  রাখা অনেকগুলি আগেকার কামান জলের দিকে মুখ করে রাখা যাতে জলপথে কেউ আক্রমন করলে দুর্গকে বাঁচাবে এইসব কামান । ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অনেক নিদর্শন এখানে দেখা যায় । যুদ্ধের জন্য বানানো দূর্গ । প্রচুর বাঙ্কার । উপর থেকে দেখলে বোঝাই যাবে না । সৈন্যদের থাকার জায়গা । গতবার এসেছিলাম শীতের সময় । সমুদ্রের জলের রং ছিল নীল কিন্তু চারিদিক ছিল সাদা চাদরে ঢাকা । হালকা বরফের আস্তরণে ঢাকা ছিল সবকিছু । আর এখন চারিদিক সবুজে সবুজ । নানা রঙের ফুল এই ছোট্ট দ্বীপটাকে রাঙিয়ে দিয়েছে । পাখির কলরবে মুখরিত সবদিক । অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা । পিকনিক করার পক্ষে আদর্শ । গরমের সময় এখানকার লোকেরা পিকনিক করে , আমাদের উল্টো কারণ এখানকার গরমকালে অনেকক্ষণ সূর্য থাকে এবং ঠান্ডা বেশ কিছুটা কম । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ফিনল্যান্ড বা জার্মানির লড়াইয়ের ইতিহাসে এই জায়গার অনেক ঘটনা আছে । মস্কো মাত্র ১০২০ কি.মি দূর । যাইহোক ইতিহাসের আলোচনায় যাচ্ছিনা । এখানে একটা সুন্দর চার্চ আছে । বেশ কয়েকটা রেস্তরাঁ ও একটা ছোট জাদুঘর  আছে । তিন – চার  ঘন্টা কাটানো কোনো ব্যাপারই নয় । নানা দেশীয় পর্যটকদের ভির এখানে  ।

আবার স্টিমারে করে ফিরলাম হেলসিংকি । রাত্রে এখানকার সবচেয়ে বড় একটা ভারতীয় রেস্তরাতে খাওয়ার ইচ্ছা । নাম ইন্ডিয়া হাউস । আটটা নাগাদ ডিনারের জন্য ঢুকলাম । সুন্দর সাজানো গোছানো , একসাথে প্রায় ১০০ উপরে লোক বসতে পারে । অপরিচিত গন্ডির মধ্যে পরিচিত মানে দেশীয় কিছু মানুষদের দেখে বেশ ভালো লাগছিল । আরো ভালো লাগলো হিন্দি কথা শুনে । মনে হচ্ছিল দেশেই আছি । বিদেশে আসলে দেশীয় সব ভাষা যেন আরো মিষ্টি লাগে । দেশ নিয়ে অনেক ব্যাপারে আমরা নিজেদের মধ্যে সমলোচনা করি ঠিকই কিন্তু বিদেশে আসলে দেশপ্রেম ভালই উপলব্ধি করা যায় । খাওয়াটা বেশ ভালই হলো । এখানে টিপস দেওয়ার চল নেই এমনকি ভারতীয় রেস্তরাতেও । টা টা ও শুভরাত্রি জানিয়ে বেরিয়ে আসলাম ইন্ডিয়া হাউস থেকে ।

YYTERI BEACH এবং TURKU CITY

আগে থেকেই ঠিক ছিল তাই শনিবার সকাল সকাল তৈরী হয়ে নিলাম সবাই । কিছু খাবার খেয়ে আর কিছু নিয়ে পারি দিলাম পরী যেখানে  YYTERI BEACH আছে। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূর । এখানে  কোল্ড ড্রিঙ্কস ও বিয়ারের থেকে জলের দাম কিনতে গেলে বেশি তাই জলের বোতল সাথে রাখা ভালো । যেখান থেকে খুশি ভরে নেওয়া যাবে ।আমরাও তাই সাথে জল নিয়ে নিলাম । শহর ছাড়িয়ে আঁকা বাঁকা , উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে ।কখনো দুপাশে পাচ্ছি অরণ্য আবার কখনো শস্য়ক্ষেত । গান গাইতে গাইতে আর চারিদিকের শোভা দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম YYTERI BEACH । প্রায় ৬ কিলোমিটার জুড়ে সাদা বালুর সৈকত । সমুদ্রের গর্জন বেশ দূর থেকেই শোনা যাচ্ছিল । হাওয়া চলছিল খুব জোরে । নীল জলের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল । মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌচ্ছে গেছে ।প্রচুর পর্যটক । বিভিন্ন adventurous sports এর আয়োজন ছিল । নীল আকাশ তার সাথে টুকরো টুকরো মেঘের আনাগোনা , সামনে বিশাল নীল জলরাশি , সাদা বালুর চর , সমুদ্রের গর্জন আমাদের সবার মন দিয়েছিল মাতিয়ে । সমুদ্রের পাশে  অনেক সুন্দর সুন্দর থাকার জায়গা আছে কিন্তু যেহেতু আমাদের ইচ্ছা এখানকার ছোট একটা গ্রামে থাকার তাই সদলবলে চললাম গ্রামের দেশে । আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাই গ্রামের বাড়ির মালকিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন  । আমরা পৌছাতেই আমাদের সব বুঝিয়ে আমদের হাতে বাড়ির চাবি দিয়ে ওনি অন্য বাড়ি চলে গেলেন । অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা ঘর নিয়ে একটা বাড়ি । বাড়ি সংলগ্ন জমির পর বিশাল ক্ষেত । দুরে দেখা যাচ্ছে কিছু বাড়ি আমদের দেশের গ্রামের মত  । কিন্তু ঘরে আছে ইন্টারনেট , ট্যাপ ওয়াটার , ইলেকট্রিসিটি  , মডুলার কিচেন , সুন্দর খাট , টিভি, রেফ্রিজারেটর  সবই যা শহরের বাড়িতে দেখা যায় । এখানে কোথাও খোলা নালা দেখা যায় না । তখনও আকাশে বেশ আলো , আমরা বেড়িয়ে  পরলাম গ্রামের উদ্দশ্যে । দুপাশে ক্ষেত তার মধ্যে দিয়ে ছোট রাস্তা । সবাই সবার মত করে ছবি তুলছি । এমন সময় এক ভদ্রলোক সাইকেল করে আমাদের কাছে এসে জানতে চাইলেন আমরা কে এবং এখানে কেন এসেছি । প্রথমেই আমাদের মাথায় আসলো বোধহয় IB হবে । বললাম আমরা পর্যটক, গ্রাম দেখতে এসেছি । কি দেখে জানিনা ওনি জানতে চাইলেন আমরা ভারতবর্ষ থেকে এসেছি কিনা । আমরাও অবাক । একটা জিনিস ভালো লাগলো যে ইউরোপের শেষ প্রান্তে এত দুরে একটা গ্রামে আমাদের দেশের নাম জানে । মনে মনে একটু গর্বিত হলাম । আমরা শুনলাম ওনি মোবাইলে কাউকে বলছেন যে আমরা ভারতবর্ষ থেকে এসেছি । আমরাও ধরে নিয়েছি নির্ঘাত IB র লোক । আমাদের সাথে সাথেই ওনি ঘুরছেন আর আমাদের সব বলে দিচ্ছেন । ক্ষেতের থেকে ফসল তুলে আমাদের খেতে দিচ্ছেন । খুবই আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে । আমাদের মত কোনো পর্যটকদের ওনি এর আগে গ্রাম বেড়াতে দেখেননি । অনেকটা ঘুরে আমরা যখন ফিরে আসছি তখন দেখি আমাদের জন্য রাস্তায় দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন । পরিচয় করিয়ে দিলেন ওই ভদ্রলোক ওনার  স্ত্রী ও মেয়ের সাথে । মেয়ে Agriculture নিয়ে বাইরে পড়াশুনা করে এবং ভারতবর্ষ সমন্ধ্যে অনেক কিছু জানে । ভবিষ্যতে ওর  কৃষক হওয়ার ইচ্ছা । অনেক গল্প হলো । শুনলাম জার্মান আর সোভিয়েতের যুদ্ধের কাহানী । ভদ্রলোকের বাবা ওই যুদ্ধের একজন শহিদ । একটা শহিদ বেদী আমাদের দেখালেন । ওনাদের সাথে বেশ কটা  ছবি রইলো আমাদের স্মৃতি হিসাবে । বুঝলাম ওনি ঐ গ্রামেরই লোক, IB র নয় । এই প্রথম কোনো বিদেশীকে এগিয়ে এসে আলাপ করতে দেখলাম । এর আগে অনেকের সাথে হাসি বিনিময় হয়েছে বা একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি যেগুলোর মধ্যে ছিল লৌকিকতা , ছিলনা এই অকৃত্রিম সরলতা । রাত্রে কিচেন ছেড়ে কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানো হলো । চারপাশে গোল হয়ে বসলাম আমরা । মনে হচ্ছিল camp fire । আদিম মানুষের মত ঝলসানো খাবার খেতে খেতে বাঁধন হারা হয়ে গেলাম । ওরা গান ধলো –রাত্রি এসে যেথায় মেশে  দিনের পারাবারে ……… ।

পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে রওনা হলাম Turku যে শহরটা ছিল ফিনল্যান্ডের আগের রাজধানী । শহরের মধ্যে দিয়ে Aura নদী বয়ে গেছে  লন্ডনের টেমস নদীর মত । তবে Aura নদী লন্ডনের টেমস নদীর থেকে চওড়ায় অনেকটা  কম । মধ্যযুগীয় স্থাপতের কিছু নিদর্শন এখানে দেখা যায় । তারমধ্যে TURKU CASTLE এবং TURKU CATHEDRAL অন্যতম ।

আবার তালিন

গত শনিবার ২১/০৮/২০১৬ আবার হেলসিঙ্কি থেকে দ্বিতীয়বারের জন্য রওনা হলাম তালিন , ফিরলাম রবিবার রাত্রে । এবারও সেই বিশাল দশ তোলা জাহাজ । মনে হচ্ছিল একটা চলমান বড় পাঁচ তারা হোটেল । কেউ কেবিন ভাড়া নিয়ে যাচ্ছে  , কেউবা  ডেকে বসে আড্ডা দিতে দিতে যাচ্ছে , আবার কেউ কেউ  বিভিন্ন রেস্তরাতে বসে সময় কাটাচ্ছে , কেউবা ক্যাসিনোতে । চারিদিকে অনেক টিভি লাগানো । কয়েকজনদের দেখলাম ভিড় করে খেলা দেখছে । অলিম্পিকে জার্মানি আর ব্রাজিলের  । বার রয়েছে বেশ কটা । কোনটাতে হচ্ছে গান আর কোনটাতে নাচ । কিন্তু সবকিছুই  হচ্ছে সুশৃঙ্খলভাবে । জাহাজে সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই  হাজার লোক ধরে ।অবাক লাগলো যখন দেখি একটা রেস্তরাতে খাবার ওজন করে বিক্রি হচ্ছে । পর পর  প্রচুর আমিষ ও নিরামিষ খাবার রাখা আছে , পছন্দ মত খাবার প্লেটে নিয়ে যেতে হবে ক্যাশ কাউন্টারে । প্লেটটা খাবার সমেত ওজন করার যন্ত্রে রাখতে হবে । দাম ১০০ গ্রাম ২০ সেন্ট , যেকোনো কোল্ড ড্রিঙ্কস ১ ইউরো  । আমরা ছিলাম সর্বঘটে কাঠালী কলার মত । সব আনন্দ কিনে নিচ্ছিলাম । পরিচ্ছন্নতা এদের মজ্জাগত ।তাই সর্বত্রই ঝকঝকে ও  তকতকে । যেখানে খুশি কাটানো যেতে পারে । আর পাবলিক টয়লেট আমাদেরকে লজ্জা দেয় ।

প্রথমবার গেছিলাম নভেম্বরের শেষের দিকে অর্থাৎ এখানকার শীতকালে আর এবার এখানকার গরমকালে । । শীতের দাপটে গতবার পর্যটকের সংখ্যা ছিল কম  , কিন্তু এবার তালিন যেন সেজে উঠেছে । মনে হচ্ছে বিশ্বের নানা জায়গা থেকে পর্যটক জমা হয়েছে এই তালিনের টাউন হল স্কোয়ারে । রবিবার তালিনের তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড । ভোরবেলা তালিনের মাটিতে পা রাখলাম । তালিন হলো এস্তোনিয়ার রাজধানী । ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ।যদিও এখানকার ৬০ ভাগ লোক রাশিয়ান ভাষাতেই কথা বলে । জার্মান আর সোভিয়েতের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়কার অনেক ইতিহাস বহনকারী এই তালিন । এবারও আমরা আধুনিক তালিনের দিকে না গিয়ে মধ্যযুগীয় তালিন দেখতেই পছন্দ করলাম । বিশ্বের অধিকাংশ পর্যটকদের সাথে আমাদের পছন্দের মিল খুঁজে পেলাম । ১০০০ বছরের পুরানো  শহর , বাড়ীঘর গল্পে দেখা  ‘ফেয়ারি টেলস’  এর মতো । মনে হচ্ছিল গল্পে দেখা রাজকন্যা থাকে, ওই সাত সাগর আর তের নদীর পারে । কিছু কিছু রেস্তরাঁর সাজসজ্যা, আসবাবপত্র  ঐ সময়টাকে ধরে রেখেছে । পার্লামেন্ট , বেশ কটা অপূর্ব  সুন্দর চার্চ ,ক্যাথিড্রাল দেখলাম । সবই মধ্যযুগীয় স্থাপত্য । পর্যটকদের আনন্দ দেওয়া এবং সংস্কৃতির প্রচারের জন্য অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল । আবার দুপুরে গতবারের মত  ‘মহারাজা’ নামে একটা ভারতীয় রেস্তরাঁতে খেলাম ।পরিচয় হলো এক বাংলা দেশীয় যুবকের সাথে যে এখানে মাস্টার ডিগ্রী করছে এবং অবসর সময়ে এই হোটেল কাজ করছে  । এইরকম ছেলে মেয়ে সারা ইউরোপে অনেক ছড়িয়ে আছে । প্রতিটা প্রগতিশীল দেশের মত যে কোনো কাজের সন্মান আমরা কবে দেবো  ?

পৃথিবীর উত্তরের শেষ প্রান্ত – নর্থ কেপ

কোনদিন কল্পনায়ও ভাবিনি যে সুমেরু বৃত্ত  ছাড়িয়ে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌছে যাব একদিন, যেখানে উত্তর মেরু ও আমার মধ্যে থাকবে না কোনো স্থলভূমি । সামনে শুধু কয়েক কিলোমিটার জুড়ে থাকবে নীলাভ সমুদ্র । তারপরেই আছে উত্তর মেরু বা নর্থ পোল । সত্যিই নরওয়ের উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে পোঁছে ,ভাবছিলাম স্বপ্ন দেখছি না তো । সকাল ৭ টা ৩৫ মিনিটে হেলসিঙ্কির বিমানবন্দর থেকে রওনা হলাম ল্যাপল্যান্ড । এক ঘন্টা ২০ মিনিটের মধ্যেই  পোঁছে গেলাম ল্যাপল্যান্ডের রাজধানী রোভানিয়েমির বিমানবন্দরে । আগে থেকেই  ঠিক করা ছিল ওখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে সব জায়গা ঘুরে আবার রোভানিয়েমিতে ফিরে আসবো সোমবার । এখানে গাড়ি ভাড়া করলে  নিজেদেরই চালাতে হয় । আমাদের দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল আমাদের কাছে , ওতেই কাজ হলো ।গত নভেম্বর মাসে ল্যাপল্যান্ড ঘুরে গেছি । তখন সান্তা ক্লসের গ্রামে গিয়ে ওনার সাথে দেখাও করেছিলাম । সেবার ছিল শীত কাল ।চারিদিক ছিল বরফের আস্তরণে ঢাকা ।কিন্তু এবার চারিদিক সবুজে সবুজ । সবেমাত্র হালকা হলুদ রঙ ধরেছে কিছু পাতায় । সান্তার সাথে দেখা করে আমরা এগিয়ে চললাম উত্তর দিকে । রোভানিয়েমি থেকে ৩২৬ কিলোমিটার দুরে ইনারি নামে একটা  জায়গায় এক বড় লেকের ধারে আমাদের রাত্রে থাকার কথা । রোভানিয়েমি শহর ছাড়িয়ে দুপাশে সারি সারি পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলছিল আমাদের গাড়ি । সুমেরু বৃত্ত বা আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি ভেবে শিহরিত হচ্ছিলাম । মাঝে মাঝেই ডান এবং বাম দিকে পাচ্ছিলাম  বড় বড় লেক । অপূর্ব সুন্দর সে দৃশ্য । সাদা , বাদামী রঙের বেশ  কিছু বল্গা হরিণদের খেলা করতে দেখলাম । এই অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বল্গা হরিণদের বাস । লেক ইনারি ল্যাপল্যান্ডের সবচেয়ে বড় লেক । লম্বায় ৮০ কিলোমিটার আর চওড়ায় ৫০ কিলোমিটার । ফিনল্যান্ডের মধ্যে তৃতীয় । লেকের ধার ধরে সারি দিয়ে বেশ কটা কটেজ । হোম স্টে বলা যায় । ঘরের মধ্যেই  রান্না করার ব্যবস্থা ও টয়লেট ছিল । ঘরের  ভিতরের তাপমাত্রা সবসময়ের জন্য ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড করা ছিল   বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন । ওখানকার যাদের পকেটটা একটু বেশি ভারী তারা বেড়িয়ে পরছিল কারাভান বা চলন্ত বাড়ি নিয়ে । কি সুন্দর সব ব্যবস্থা আর যেখানে খুশী থেকে যাও । যেহেতু এখানে  ক্রাইম নেই বললেই চলে সুতরাং এখানে নিরাপদে নিশ্চিন্তে যখন খুশী যেখানে যাওয়া ও থাকা যায় ।

পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় ফিনিস জল খাবার খেয়ে রওনা দিলাম  রাস্সেনেস নামে এক জায়গার উদ্দেশ্যে যেটা নরওয়ের মধ্যে পরে নর্থ ক্যাপ থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার আগে ।কারণ দুটো । এক সারা রাত ধরে দেখব অরোরা বরিয়ালিস -সারা আকাশ জুড়ে সবুজ আলোর ঢেউ আর আরেকটা কারণ পরদিন সকাল সকাল পোঁছে যাব নর্থ ক্যাপ, থাকতে পারব অনেক্ষণ । পৃথিবীর প্রায় মাথার উপর দিয়ে ছুটে চলেছি উত্তর মেরুর কাছাকাছি পৌছানোর জন্য । প্রকৃতি নিজেই নানা রঙে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে । এক একটা গাছের পাতার এক এক রকম রঙ । অনেকটা আমাদের রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়ার মত । মাঝে মাঝেই দুধারে পাচ্ছিলাম লেক ।স্বচ্ছ নীল জল ।প্রানভরে নিচ্ছিলাম নিঃশ্বাস দূষণমুক্ত আকাশে । হিংস্র জন্তু না থাকায় সব বলগা হরিন খেলে বেড়াচ্ছিল ইচ্ছামতো । আর কিছু দিন পরেই  বরফে ঢেকে যাবে সব কিছু । অত উপরে নির্জন জায়গা তবুও দেখলাম একটা ঝকঝকে হেলথ সেন্টার । এত সুবিধার জন্যই বোধহয় সারা বিশ্ব থেকে পর্যটক এখানে নিশ্চিন্তে আনন্দ করে ঘুরে যেতে পারে । অনেকটা চলে এসেছিলাম একটু পরেই ঢুকবো নরওয়েতে । তিনতলা সমান উঁচু ঢেউয়ের মতো রাস্তা । মনে হচ্ছিল নাগরদোলায় চড়েছি । এমনিভাবে দোলায় দুলতে দুলতে এগিয়ে চলছিলাম । রাস্তায় পড়ল একটা ছোট নদী তার উপরে ছোট একটা ব্রিজ । ছেলে বললো এটাই ফিনল্যান্ড আর নরওয়ের বর্ডার । কেউ আমাদের গাড়ি দাঁড় করালো না , কিছু জিজ্ঞাসাও করলো না , এ কেমন বর্ডার ! ফিনল্যান্ড ছাড়িয়ে ঢুকে পড়লাম নরওয়েতে  । চোখের সামনে ভেষে  উঠলো ধুসর আর স্লেট রঙের পাহাড় । রাস্তায় পড়ল নরওয়ের ছোট একটা শহর । ATM থেকে কিছু নরওয়ে কোনার তোলা হলো রাস্তার জন্য । বেশ কিছুটা যাওয়ার পর বাঁদিকে পেলাম পাহাড় আর ডান দিকে জল । মনে হচ্ছিল সেভক দিয়ে সিকিমের দিকে এগোচ্ছি । ছেলের কাছে শুনলাম এটা সমুদ্রের জল । ম্যাপ দেখলেও বোঝা যাচ্ছিল । গাড়ির মধ্যে জিপিএস আছে তাই কারো সাহায্য ছাড়াই আমরা এগিয়ে চলেছি আমাদের  গন্তব্যে । একবারের জন্যেও কাউকে কিছু জিগ্যেস করতে হয়নি । পৌঁচ্ছে গেলাম রাস্সেনেস । অপূর্ব সুন্দর এক জায়গা । ডানদিকে দিগন্ত ব্যাপ্তি সমুদ্র , তার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মাঝারি মাপের পাহাড় ।বামদিক রাস্তা থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেছে । মাঝে কটা বাড়ি । তার মধ্যেই একটাতে আমাদের থাকার জায়গা । হোম স্টে । সুন্দর ব্যবস্থা । ইলেকট্রিসিটি , ওয়াই ফাই সবই আছে । এরকম একটা নির্জন জায়গায় যা ব্যবস্থা দেখছিলাম মনে  হচ্ছিল পর্যটকদের কাছে তা স্বর্গ । জলের সমস্যা কোথাও নেই । যেকোনো কলের জলই খাওয়া যায় । রাস্তা থেকে কিছু কাঁচা খাবার কিনে নেওয়া হয়েছিল তাই রাত্রে রান্না করেই খাওয়া হলো । কারণ এই নির্জন জায়গায় খাবার কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট ছিলনা । চারিদিক অন্ধকার হতেই বারান্দার আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো । ঘরের পর্দাগুলো ভালো করে টেনে দেওয়া হলো যাতে বাইরে আলো না আসতে পারে । সবাই বেরিয়ে এলাম বাইরে অরোরা বরিয়ালিস দেখার জন্য  । আমরা ছাড়া ওখানে আর কোনো পর্যটকদের দেখতে পেলাম না । আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছি । মেঘ রয়েছে আকাশে । আমাদের হোম স্টেটা যার তত্ত্ববাধনে ওনি আমাদের আশাহত হতে দিচ্ছিলেন না । মাথার উপর চারিদিক উম্মুক্ত আকাশে সবুজ আলোর ঢেউ দেখার জন্য সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক এসে ভিড় করে এই  উত্তর আর দক্ষিণ মেরুতে । উত্তরে যার নাম অরোরা বরিয়ালিস এবং দক্ষিনে অরোরা অস্ট্রালিস । অনেকে একে আবার পোলার লাইটও  বলে । বিজ্ঞানের বিশ্লষনে আর যাচ্ছি না । নানা রকম গল্প গুজব করে ভালই কাটছিল সময় আর চলছিল টুকটাক খাওয়া দাওয়া । বাইরে ঠান্ডা তাই মাঝে মাঝে ঢুকে পরছিলাম ঘরে । শুধু লক্ষ্য আকাশের দিকে । স্ত্রীর আওয়াজে সবাই বেরিয়ে এলাম বাইরে । দেখি আকাশ ভরা সবুজ আলোর ঢেউ । মুহুর্তের মধ্যে আমাদের হাতের ক্যামেরাগুলি ঝলসে উঠলো । মনের ক্যামেরা আর যন্ত্র ক্যামেরায় ধরা পরলো অরোরা বরিয়ালিস যার আকর্ষনে ছুটে আসা । আনন্দের ঢেউ খেলে গেল সারা শরীরে । কিছুক্ষণ পরে আবার কোথা থেকে মেঘ এসে সারা আকাশ ঢেকে ফেললো ।আমরাও ঘরে প্রবেশ করলাম । ভুলে গেছিলাম বাইরের  ঠান্ডার কথা ।

সকাল হলো । বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েকটা বলগা হরিন আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল  । সামনে দিগন্ত ব্যাপী সমুদ্র । শুনলাম তিমি আছে এই সমুদ্রে । অনেকসময় ডাঙা থেকে লেজ দেখা যায়  । আমরাও সবাই তাকিয়ে রইলাম সমুদ্রের দিকে যদি তিমির দর্শন পাই । তোমার দেখা নাইরে তোমার দেখা নাই , তাই জলখাবার খেয়ে রওনা হলাম পাহাড়ের চূড়ায় নর্থ ক্যাপে । আবার আমাদের  রথ ছুটে চললো বাঁদিকে শ্লেট রঙের পাহাড় আর ডানদিকে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে । মাঝে মাঝেই বাঁদিকে পাচ্ছিলাম  উপত্যকা । রাস্তায় পড়ল চারটে টানেল । একটা টানেল সমুদ্রের তলা দিয়ে গেছে । যাওয়ার সময় রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম ।টানেলের ঢোকার মুখে দেখলাম লেখা আছে ২১২ মিটার গভীর আর  ৬৮৭০ মিটার লম্বা । প্রত্যেক কিলোমিটার অন্তর একটা করে টেলিফোন বুথ । নিরাপত্তার সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া আছে । টানেল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠছিলাম । হঠাৎ মেঘ এসে মেঘালয় বানিয়ে দিল । খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল । একটু পরিস্কার হচ্ছিল  আবার একটু মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছিল ।এমনি করেই ধীরে ধীরে উপরে উঠে পৌচ্ছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে । পাহাড়ের উপর অনেকটা সমতল জায়গা  ,ওয়াকার টেবিলের ছবির মতো । সামনের দিকটা কেউ যেন সমানভাবে কেটে দিয়েছে ।আর তার নিচের দিকে আছড়ে পড়ছিল ঢেউ । ভাবলে শিহরিত হচ্ছিলাম যে পৃথিবীর উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি ।আমরা আর উত্তর মেরুর মধ্যে কোনো মানুষ নেই , নেই কোনো স্থলভূমি,  আছে শুধু কয়েক কিলোমিটার জল । পাহাড়ের উপরেই আছে পাঁচ তলা সমান উঁচু একটা বাড়ি । ভিতরে জাদুঘর , খাবারের তিনটি রেস্তুরেন্ট , সপিং মল ও একটা পেক্ষাগৃহ যেখানে ১৫ মিনিট অন্তর দেখানো হয় নর্থ ক্যাপের উপর একটা ডকুমেন্টারী । কোথা দিয়ে দুই – তিন ঘন্টা সময় চলে গেল বোঝাই গেলনা । এরপর ফেরার পালা । ফিরব আর্কটিক সার্কেল ধরে সুইডেন হয়ে ল্যাপল্যান্ড । তারপর ল্যাপল্যান্ডের রোভানিয়েমির বিমানবন্দর হয়ে হেলসিঙ্কি । রাত্রে থাকবো সুইডেন আর ফিনল্যান্ডের বর্ডারে । নরওয়ের বিভিন্ন গ্রামের মধ্য দিয়ে চলেছিলাম  । কখনো বাঁদিকে পাহাড় আর ডান  দিকে নদী, কখনো বা দুপাশে শস্য ক্ষেত , মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ছিলাম শহরের মধ্যে ।ছবির মতো সুন্দর লাগছিল নরওয়ে । সন্ধ্যে পার হয়ে রাত নেমেছিল , সাথে চলছিল বৃষ্টি ।এরই মধ্যে ভাগ্যক্রমে আবার রাস্তা থেকে দেখতে পেলাম অরোরাকে । বুঝলাম আমরা এখনও আর্কটিক সার্কেলের মধ্যেই আছি । রাত প্রায় একটা নাগাদ পৌচ্ছালাম আমাদের নির্ধারিত হোম স্টেতে । কোনো লোক নেই শুধু আমাদের জন্য চাবি রাখা ছিল একটা খোলা বাক্সের মধ্যে । চাবি নিয়ে ঘরে ঢুকলাম । সুন্দর ব্যবস্থা । সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুম আসতে সময়ই লাগলো না ।

পরদিন ঘুম ভাঙতে একটু দেরীই হলো । দরজা খুলে বারান্দায় বেড়তেই দেখি সামনে একটা সুন্দর নদী তরতর করে বয়ে চলেছে যার আওয়াজ কাল রাত্রে থেকেই পাচ্ছিলাম । শুনলাম নদীর ওপারটা সুইডেন । বেশি চওড়া না একটা নদী ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে আলাদা করছে । অনেকটা শিলিগুড়ির কাছে ফানসিদেওয়াতে মহানন্দা নদী যেটা বাংলাদেশ ও ভারতকে আলাদা করেছে  । নদীর উপর ছোট একটা ব্রিজ ,একপারে লেখা ফিনল্যান্ড আরেকপারে লেখা সুইডেন ।কোথাও নেই কারও মিলিটারী । অনায়াসে যাতায়াত করা যায় । আমাদের কেউ কোথাও কিছু জিগ্যেস করলনা । ভাবতে ভাল লাগছে প্রতিবেশী দেশের সাথে নেই কোন ঝগড়া , মিলেমিশে এক হয়ে গেছে কিন্তু প্রত্যেকেরই  আছে আলাদা সত্তা । পাশের বাড়ির মত । রোভানিয়েমি থেকে প্লেন ধরবো সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ১০ মিনিটে আর গাড়িটা দিতে হবে জমা তাই হাতে অনেক সময় । বেড়িয়ে পরলাম সুইডেন অভিমুখে । চলো সুইডেনের গ্রামে চলো । এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম । একই চেহারা , একই তাপমাত্রা , একই পরিবেশ তবুও দুটো আলাদা দেশ । ঠিক করলাম দুপুরে সুইডিশ খাবার খাব । ইন্টারনেট দেখে খাবারের দোকান সনাক্ত করা গেল । এখানে সর্বত্র নেট কানেকশন পাওয়া যায় । কাউকে কিছু জিগ্যেস করতেই লাগে না । খেতে বসেছি দেখছিলাম  এক ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন আর মিটিমিটি হাসছেন । আমার স্ত্রী ওনার দিকে হেসে শুভেছা জানালো আর তাতেই ভদ্রমহিলা ওঠে আমাদের কাছে চলে আসলেন । জানলাম ওনি সুইডিশ , ইন্ডিয়া গেছেন ঘুরতে , ওনার ইন্ডিয়ান বন্ধুও আছে । অনেক গল্প হল ,অবশেষে আসতেই হলো ওনাকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে । কেননা আমাদের গন্তব্য  হেলসিঙ্কি ।গাড়ি ছুটে চললো রোভানিয়েমির দিকে ।

অরোরা বরিয়ালিস

2 thoughts on “ইউরোপ ভ্রমন বা Europe Tour

  1. সুপ্রিয় -সুপ্রিয়,
    খুব সুন্দর ঝরঝরে লেখা তোমার। তোমার লেখায় ভর করে আমরাও কল্পনায় ভ্রমণের স্বাদ
    পেয়েছি -এ বড় কম কথা নয়!
    সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তুমি সুন্দরভাবে সব তথ‍্য লিপিবদ্ধ করছো! প্রতিটা
    সেকেন্ডকে কাজে লাগাতে গেলে যে ধৈর্য‍্য ও একাগ্রতা দরকার তা তোমার আছে।
    বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব‍্যস্ত রাখার চেয়ে বড় গুণ আর নেই!
    শুভেচ্ছাসহ-
    প্রভাত

    Liked by 1 person

    1. খুব ভাল লাগলো তোমার মন্তব্য । আমি আপ্লিত তোমার অনুপ্রেরণায় । এইরকম উৎসাহ সবসময় আশা করি ।

      Like

Leave a Reply to supriyoroy Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s